নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ২৩:২০

হাওরে তিন হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি

ঢল আর ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় হাওরাঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে জানিয়েছেন হওর নিয়ে কাজ করা সেচ্ছ্বাসেবী সংগঠনের নেতারা। টাকার অংকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান আরও অনেক কম। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমান আরও বাড়তে পারে।

কৃষি অধিদপ্তরের হিসেবে সিলেট বিভাগের চার জেলায় পানিতে তলিয়েছে ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান। আর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর হিসেবে এ পরিমাণ ৪০ হাজার হেক্টর।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ২০ হাজার হেক্টর ফসল পানিতে নিম্িজত হয়েছে। হাওরে এখণ পর্যন্ত ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫১২ হেক্টর, উঁচু এলাকার ৫২ হাজার ৪৫৫ হেক্টর জরি বোরো ধান কাটা হয়েছে। সব মিলিয়ে গড় ধান কাটার পরিমান ৪৭ শতাংশ।
এসব তথ্য জানিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান এখনো চুঢ়ান্ত হয়নি। পানি বাড়লে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। আবার পানি দ্রুত কমে গেলে নিমজ্জিত জমির সব ধানও নষ্ট হবে না। ফলে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসেব পেতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এমন পরিসংখ্যানের সাথে দ্বিমত পোষণ করে হাওর নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হাওর ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, আমরা স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে তথ্য নিয়ে জেনেছি, এ পর্যন্ত ৪০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বনা, শিলাবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা সব মিলিয়ে এই পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। টাার অংকে যা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বলে জানান তিনি।

এছাড়া নিজেদের হিসেবে এ পর্যন্ত ৩৫ থেকে ৩৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলে জানান কাসমির।

কাসমির রেজা বলেন, কৃষি অফিস সবসময়ই কাটার পরিমান বাড়িয়ে ও ক্ষতির পরিমান কমিয়ে দেখায়। নিজেদের স্বাথেই তারা এমনটি করে। কিনউ প্রকৃত চিত্র আরও খারাপ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবের সাথে একমত নন সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের কৃষক পরিন্দ্র বিশ্বাসও। তিনি বলেন, কৃষি অফিস তো কেবল তলিয়ে যাওয়া জমির হিসেব করছে, কিন্তু যে ধান কেটে আনা হয়েছে তাও তো অনেকগুলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রোধের অভাবে শুকানো যাচ্ছে না। এই ক্ষতির হিসেব কে করবে।
শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের আনন্দপুর গ্রামের কৃষক রথীন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, পাঁচ কেয়ার জমির মধ্যে দেড় কেয়ার ধান কেটেছি অনেক কষ্ট করে। সাড়ে তিন কেয়ার জমির পাকা ধান পানির নিচে। কিন্তু কেটে আনা ধানও শুকাতে পারছি না। এখন আমার ধানে ‘গ্যাঁড়া’ (চারা) গজাচ্ছে। এগুলো আর কোনো কাজে আসবে না।

এ প্রসঙ্গে ড. মো. মোশাররফ হোসেনবলেন, এতো ধান একসাথে শুকানোর কোন কৃত্রিম ব্যবস্থা আমাদের নেই। প্রকৃতির উপরই তাই নির্ভর করতে হয়। কিছু ধান মিল মালিকরা কিনে নিলে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা কমতো। কিন্তু এখন পর্যন্ত মিল মালিকরা ধান কেনা শুরু করেনি।

এ বছর সিলেট বিভাগের চার জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মেলভীবাজারে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ লাখ ৬০ হাজার ৪৫১ মেট্রিক টন চাল।

শ্রমিক সঙ্কট
বৃহস্পতিবার সুনামগরঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর করচার হাওর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টি থামায় ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন কৃষক ও কৃষাণিরা। বাড়ির ছোট শিশুরাও বড়দের সাহায্য করছে এ কাজে।

ধান শুকানোর কাজে থাকা কৃষাণি হোসনা বেগম বলেন, এই কদিন বৃষ্টির কারণে কেটে আনা ধানেও পচন ধরেছে। আজ বৃষ্টি থামলেও এগুলোর শুকানোর জন্য শ্রমিক পােিচ্ছ না। তাই বাড়ির সবাই মিলে কাজে লেগেছি।

এই হাওরের কৃষক মঞ্জুর আহমদের ৭ কিয়ার জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে এখন ২ কিয়ার পানির উপরে আছে। কিন্তু শ্রমিক সঙ্কটের কারণে এই ধানও কাটতে পারছেন না।

মঞ্জুর বলেন, দৈনিক ৭০০/৮০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিকরা ধান াটার কাজ করে। কিন্তু আমি ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বলেছি। তবু কোন শ্রমিক পাচ্ছি না। হাওরের পানি যেভাবে বাড়ছে আরও দুইদিন অপেক্ষা করলেও এখনও পানির উপরে থাকা ২ কিয়ার জমিও তলিয়ে যাবে।

তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওররর কৃষক রমেন বিশ্বাস বলেন, অর্ধেক ধান দিয়েও শ্রমিক পাচ্ছি না। পানির কারণে জমিতে হারভেস্টার মেশিনও নামছে না। ফলে বউ বাচ্চা নিয়ে যতটুকু পারছি ধান কেটে আনছি।

জানা যায়, হাওরাঞ্চলে কৃষক সাধারণত টাকার বিনিময়ে বা ধানের বিনিময়ে ধান কাটার কাজ করেন। সময় ও ক্ষেত্র বিশেষে কাটা ধানের ছয় বা সাত ভাগের এক ভাগ ধান শ্রমিককে দিতে হয়। তবে দুর্যোগ মূহূর্তে শ্রমিককে উৎপাদিত ধানের অর্ধেক অংশ দিয়েও ধান কাটানো হয়। যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘নয়নভাগা’ বলে। তবে স্থানীয় কৃষকরা লছেন, এবার নয়নভাগা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না।

শ্রমিক সঙ্কটের বিষয়টি নিশ্চিত করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, গত কয়েকবছরে হাওর অঞ্চলের ধান কাটা শ্রমিক থেকে যন্ত্র নির্ভর হয়ে পড়েছিলো। হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা হতো। আমাদের যথেষ্ট সংখ্যক হারভেস্টার রয়েছে। ডিজেলেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এবার আগেভাগে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ঝামেলা তৈরি হয়েছে। পানির কারণে হারভেস্টার মেশিন হাওরে নামতে পারছে না। আবার একসাথে সব ধান কেটে আার মতো এতো শ্রমিকও নেই। আগে অন্যান্য জেলা থেকে শ্রমিক আনানো হতো। কিন্তু যন্ত্র নির্ভরতার কারণে এবার তাও করা হয়নি।

বৃষ্টি থামলেও বাড়ছে পানি

টানা বৃষ্টির পর বৃহস্পতিবার সিলেট অঞ্চলে তেমন বৃষ্টি হয়নি। বুধবার রাত থেকেই বন্ধ হয়েছে বৃষ্টিপাত। তবে বৃষ্টি থামলেও বাড়ছে হাওরের পানি। ফলে নতুন করে আরও জমি তলিয়ে যাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, বৃষ্টি থামলেও উজান থেকে ঢল নামা অব্যাহত আছে। ফলে এই অঞ্চলের হাওর ও নদীর পানি বাড়ছে।

শান্তিগঞ্জ উপজেলার শনির হাওরের কৃষক কয়েস আহমদ বলেন, আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। সব ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি থামলেও হাওরে পানি বাড়ছেই। আমার জমিতে প্রায় গলা সমান পানি। এই অবস্থায় ধান কাটা সম্ভব নয়। আবার পানি কমার অপেক্ষা করলে সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে।

সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, গত দুই দিনে বৃষ্টি অনেকটা কমেছে। তবে আরও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরামে বৃষ্টির কারণেই মূলত উজানে ঢল নামছে।

তিনি বলেন, ঢল অব্যাহত থাকায় সুরমা ছাড়াও কুশিয়ারা, নলজুর, পাটলাই, জাদুকাটা, খাসিয়ামারা, বৌলাইসহ জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এসব নদীর পানি হাওরে ঢুকে জমির ধান তলিয়ে দিচ্ছে।

সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাওরে ৯ হাজার ৫৭ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৭ হেক্টর। এর আগে জলাবদ্ধতায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টর ক্ষতির কথা জানানো হয়েছিল।

কৃষি বিভাগের হিসেব মতে, এখনো হাওরের প্রায় অর্ধেক ধান জমিতে রয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারুক আহাম্মেদ বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান কাটায় সমস্যা হচ্ছে। তিনি কৃষকদের পরামর্শ দেন, কাটা ধান খলায় না রেখে বাড়ি বা উঁচু স্থানে রাখতে হবে। শুকানোর আগে ধান বস্তাবন্দী না করে মেঝে, ভবনের ছাদ বা উঁচু সড়কে ছড়িয়ে রাখতে হবে, যাতে বাতাস লাগে। প্রয়োজনে বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহার করেও ধান শুকানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এতে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত