সিলেটটুডে ডেস্ক

২০ ডিসেম্বর, ২০২১ ২৩:৩১

শহীদজায়া মুশতারী শফীর মৃত্যু

মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনের অন্যতম নেতা শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফী আর নেই। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (২০ ডিসেম্বর) বিকালে তার মৃত্যু হয়। মুশতারী শফীর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি সাত ছেলে-মেয়ে রেখে গেছেন।

তার স্বামী ডা. মোহাম্মদ শফীকে একাত্তরে বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

তাকে অসুস্থ অবস্থায় গত ২ ডিসেম্বর ঢাকার বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে ঢাকার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৪ ডিসেম্বর সিএমএইচে ভর্তি করে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল তাকে।

১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া মুশতারী শফী ছিলেন চট্টগ্রামসহ সারাদেশের প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন। চট্টগ্রামের প্রায় সব নাগরিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন সক্রিয়। ১৯৬৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে নারীদের জন্য মাসিক ‘বান্ধবী’ সাময়িকীর প্রকাশনা শুরু করেন এবং ‘বান্ধবী সংঘ’র প্রতিষ্ঠা করেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রাম মহানগরীর এনায়েত বাজারে মুশতারী শফীর বাড়িতেই কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল। শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদের সঙ্গে বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন ডা. মোহাম্মদ শফী ও তার স্ত্রী মুশতারী। একাত্তরের শুরুর সময় থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, সেবা ও অর্থায়নসহ নানা কাজে যুক্ত ছিলেন তারা।

মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র বাসায় রাখায় ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল ডা. মোহাম্মদ শফী এবং মুশতারীর ভাই এহসানুল হক আনসারীকে স্থানীয় রাজাকাররা ধরে নিয়ে যার। পরে তাদের হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এরপর ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দ সৈনিক হিসেবে কাজ করেন মুশতারী শফী। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি দেশে ফেরেন।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য ২০১৬ সালে মুশতারী শফীকে ফেলোশিপ দেয় বাংলা একাডেমি। ২০২০ সালে তিনি বেগম রোকেয়া পদক পান।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গত শতকের ৯০ এর দশকে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করলে তাতে সক্রিয় হন মুশতারী শফী। জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পরও আন্দোলন এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন তিনি। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে প্রায় এক দশক আগে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনেও অনুপ্রেরণাদানকারী হিসেবে ছিলেন মুশতারী শফী। মুশতারী শফী মহিলা পরিষদে যুক্ত ছিলেন এবং সর্বশেষ উদীচী চট্টগ্রামের সভাপতি ছিলেন।

মুশতারী শফী লেখালেখিতেও ছিলেন সমান সক্রিয়। ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’, ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’, ‘চিঠি জাহানারা ইমামকে’, ‘একুশের গল্প’, ‘দুটি নারী ও একটি যুদ্ধ’, একদিন এবং অনেকগুলো দিন’, ‘আমি সুদূরের পিয়াসি’সহ বেশ কিছু কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা তিনি।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
কাত্তরের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, নারী নেত্রী ও সাহিত্যিক শহীদজায়া মুশতারী শফীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সোমবার (২০ ডিসেম্বর) আলাদা শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মরহুমার রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শোকবার্তায় তারা দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও নাগরিক আন্দোলনে মুশতারী শফির অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত