সিলেটটুডে ডেস্ক

১৯ মার্চ, ২০২২ ১১:৪৬

সাহাবুদ্দীন আহমদ: বর্ণাঢ্য যে জীবন

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ; বাংলাদেশের বিচারিক ও গণতান্ত্রিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে সারাটা জীবন সাধারণভাবে কাটিয়ে গেলেন সদ্য প্রয়াত এ ব্যক্তিত্ব। শেষ কয়েকটি বছর ছিলেন একেবারেই নিভৃতে।

নব্বইয়ের উত্তাল গণ-আন্দোলনে স্বৈরাচারের পতনের পর তিনি ছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। তার হাত ধরেই এসেছিল যুগান্তকারী কিছু রায়।

১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার প্রেমই গ্রামে জন্ম সাহাবুদ্দীন আহমদের। তার বাবার নাম তালুকদার রিসাত আহমদ। সাহাবুদ্দীন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক ও ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে লাহোরে ও পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনপ্রশাসন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।

তিনি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে গোপালগঞ্জ ও নাটোরের মহকুমা কর্মকর্তা, সহকারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগে বদলি করার পর ঢাকা ও বরিশালের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পান সাহাবুদ্দীন আহমদ। ১৯৭২ সালে হাই কোর্টের বেঞ্চে বিচারক হিসেবে পদোন্নতি পান। তিনি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে। তখন বাংলাদেশের সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী সম্পর্কিত মামলায় তার দেওয়া রায় ‘যুগান্তকারী’ হিসেবে বিচারালয়ে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। এতে বাংলাদেশের সংবিধানের পরিশোধনের পথ উন্মুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।

১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তবে তৎকালীন সরকার তার সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

১৯৭৮ সালের আগস্ট থেকে ১৯৮২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৯১ সালে তার অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।

সাহাবুদ্দীন আহমদের চাহিদা অনুসারে দেশের সংবিধানের এগারোতম সংশোধনীটি আনা হয়। এর ফলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পরও তিনি ১৯৯১ সালের ১০ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে সুপ্রিম কোর্টে ফিরে যান এবং ১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেন ১৯৯৬ সালে। ওই বছর ৯ অক্টোবর তিনি আওয়ামী সরকারে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর এ পদ থেকে অবসর নেন।

২০১৩ সাল থেকে ছোট ছেলে সোহেল আহমদের সঙ্গে বসবাস করছিলেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। তার সহধর্মিণী আনোয়ারা আহমদ ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বড় মেয়ে অধ্যাপক ড. সিতারা পারভিন ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। ওই দুর্ঘটনায় দ্বিতীয় মেয়ে শাহানা স্মিথের স্বামী গুরুতর আহত হয়ে পরের বছর মারা যান। শাহানা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছেন। ছোট মেয়ে সামিয়া পারভীন একজন স্থপতি। তিনি বাস করেন যুক্তরাজ্যে। বড় ছেলে শিবলী আহমদ একজন পরিবেশ প্রকৌশলী।

সাহাবুদ্দীন আহমদ শনিবার (১৯ মার্চ) সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত