২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:৩০
প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘সরকারবিরোধী’ পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে অন্তত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে পূর্ববর্তী সরকারের দমনমূলক নীতিরই ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটি অবিলম্বে বিতর্কিত সাইবার আইন সংস্কার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
এইচআরডব্লিউয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়লাভের পর বিএনপি সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান গ্রেফতারের ঘটনাগুলো সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। গত ১৭ এপ্রিল কার্টুনিস্ট এ এম হাসান নাসিমকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সংসদ সদস্যের একটি মন্তব্য নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন পোস্ট করেছেন। ২০২৫ সালের সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশের আওতায় তার বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মামলা দেওয়া হয়। তবে গত মঙ্গলবার তিনি জামিন পেয়েছেন।
এর আগে ৫ এপ্রিল ভোলায় সওদা সুমি নামে এক জামায়াত সমর্থককে ‘সরকারবিরোধী’ মন্তব্যের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ তাকে পরোয়ানা ছাড়াই ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আটক করে। দুই দিন পর আদালত থেকে তিনি জামিন পান। গত ৩১ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আজিজুল হক নামে আরেক ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃত করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ তার বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করেছে। এ ছাড়া ২ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে শাওন মাহমুদ নামে এক যুবককে যুবদল কর্মীরা ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ফেসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রীকে ‘অপমান’ করার অভিযোগে তাকেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “বাংলাদেশিরা জীবন দিয়ে মানবাধিকার এবং স্বাধীনতার দাবি জানিয়েছিল। এখন নতুন সরকারের উচিত সেই সংস্কারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানো। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণে মানুষকে গ্রেপ্তার করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিল। যেমন—মানহানির অভিযোগে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার প্রতিনিধি মামলা করতে পারবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক মামলাগুলোতে দেখা গেছে, সরকারি দলের কর্মীরাই ঢালাওভাবে মামলা করছেন, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, পুলিশ প্রশাসন আগের মতোই রাজনৈতিক প্রভাবে কাজ করছে। তারা শুধু আনুগত্যের জায়গা পরিবর্তন করেছে, কিন্তু পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির (আইসিসিপিআর) ১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি স্পষ্ট করেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা বা রাজনৈতিক বক্তব্য কোনোভাবেই অপরাধ হতে পারে না।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে তার সমর্থকদের এবং পুলিশকে এই শক্তিশালী বার্তা দিতে হবে যে, বাংলাদেশে সবাই নিজের মত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীন। পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার বন্ধে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিলের মাধ্যমে একে মানবাধিকারবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।”
মানবাধিকার সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যদি এখনই আইন ও পুলিশের সংস্কার না করা হয়, তবে বাংলাদেশে মুক্ত চিন্তার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জনদাবি মেনে গঠিত এই সরকারকে এখনই দমনমূলক পথ পরিহার করে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
আপনার মন্তব্য