২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ২০:১৩
ম্যাচের শুরু থেকে প্রায় খাঁ খাঁ করছিল গ্যালারি। প্রচণ্ড গরমে রোদের তীব্রতা সয়ে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার টানে যে কজন দর্শক মাঠে ছিলেন, তারা দারুণ প্রতিদানও পেলেন। উপভোগ করলেন নাজমুল হোসেন শান্তর লড়িয়ে সেঞ্চুরি। বিকেল থেকে দর্শক বাড়তে থাকল কিছু। তার পরও শেষ পর্যন্ত সংখ্যাটা হবে বড়জোর হাজার তিনেক। তারা নিজেদের ভাগ্যবান ভাবতেই পারেন। মুস্তাফিজুর রহমানের ৫ উইকেট দেখার পাশাপাশি স্বাক্ষী হলেন তারা দারুণ এক জয়ের।
নিউ জিল্যান্ডের এই খর্বশক্তির দলের বিপক্ষে সিরিজ জয় প্রত্যাশিতই ছিল। তবে সেই জয় ধরা দিল একটু অপ্রত্যাশিতভাবে। প্রথম ম্যাচে হারার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে সিরিজ জিতে নিল মেহেদী হাসান মিরাজের দল। শেষ ম্যাচে কিউইদেরকে হারাল তারা ৫৫ রানে।
এই নিয়ে টানা তিনটি ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। আগের দুই সিরিজে জয় ছিল পাকিস্তান ও নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লা. লে. মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ৫০ ওভারে তোলে ২৬৫ রান।
প্রথম তিন ব্যাটারকে দ্রুত হারানোর পর চাপ সামলে ১১৯ বলে ১০৫ রানের ইনিংস খেলেন শান্ত। ৯ চার ও ২ ছক্কার ইনিংসটি তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরি।
১৯ ওয়ানডের ফিফটি খরা কাটিয়ে লিটন কুমার দাস করেন ৭৬ রান। শান্তর সঙ্গে তার জুটি ১৬০ রানের, চতুর্থ উইকেটে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে যা বাংলাদেশের রেকর্ড। রান তাড়ায় কিউইরা গুটিয়ে যায় ২১০ রানে।
সিরিজে প্রথমবার খেলতে নামা মুস্তাফিজ শিকার করেন ৪৩ রানে ৫ উইকেট। সেই ২০১৯ বিশ্বকাপের পর ওয়ানডেতে আবার এই স্বাদ পেলেন তিনি।
চট্টগ্রামে দুটি আন্তর্জাতিক ভেন্যু মিলিয়ে এই প্রথম এখানে ওয়ানডেতে ৫ উইকেট নিতে পারলেন কোনো পেসার।
ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ৫ উইকেট নিলেন তিনি এই নিয়ে ষষ্ঠবার। বাঁহাতি পেসারদের মধ্যে স্পর্শ করলেন ওয়াসিম আকরাম ও ট্রেন্ট বোল্টকে, সামনে আছে কেবল মিচেল স্টার্ক।
বাংলাদেশের জয়ের ব্যবধান বড় হতে পারত আরও। কিন্তু শেষ দিকে ৭ ছক্কায় ৭২ বলে ৭৫ রানের ইনিংস খেলেন ডিন ফক্সক্রফট। শেষ জুটিতে বেন লিস্টারকে নিয়ে যোগ করেন তিনি ৫০ রান।
সকালে সিরিজে তৃতীয়বার টস ভাগ্য পক্ষে পায় নিউ জিল্যান্ড। ঘাসের ছোঁয়া থাকা উইকেটে বোলিংয়ে নামা দলকে দারুণ শুরু এনে দেন উইল ও’রোক।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা দুর্দান্ত করার পর চোটের কারণে দীর্ঘ ৯ মাস মাঠের বাইরে ছিলেন ও’রোক। দলে ফিরেছেন তিনি এই সিরিজ দিয়েই। আগের দুই ম্যাচে কিছুটা জড়তা ছিল তার বোলিংয়ে। কিন্তু এ দিন যেন গতি ও বাউন্স মিলিয়ে সেরা ছন্দে ফেরেন।
মূলত তার বাউন্স সামলাতেই হিমশিম খায় বাংলাদেশের টপ অর্ডার। লাফিয়ে ওঠা বলে ব্যাট পেতে দিয়ে বল স্টাম্পে টেনে আনেন তানজিদ হাসান (১) ও সৌম্য সরকার (১৮)। সাইফ হাসান বিদায় নেন আরও আগেই। ম্যাচের দ্বিতীয় বলেই অফ স্টাম্প ঘেঁষা দুর্দান্ত ডেলিভারিতে উইকেট হারান তিনি শূন্যতে।
ও’রোকের তিন ছোবলে কাঁপতে থাকা বাংলাদেশ নির্ভরতার ছায়া পায় শান্ত ও লিটনের ব্যাটে। ১৩ ইনিংস পর আগের ম্যাচটিতে ফিফটি করেছিলেন শান্ত। সেই আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করেই দলকে ভরসা জোগান তিনি। ফিফটির সঙ্গে দীর্ঘ বিচ্ছেদের ইতি টানার জন্য লিটনও বেছে নেন এই ম্যাচকে।
দুজনের জুটিতে বিপদ কাটিয়ে ক্রমে শক্ত ভিত গড়ে তোলে দল। ৭০ বলে ফিফটি করেন শান্ত। লিটনের ফিফটি আসে ৭১ বলে।
ফিফটির পর দুজনের ব্যাটেই দেখা যায় দ্রুত রান তোলার তাড়া। বাউন্ডারি আসতে থাকে নিয়মিত। দ্বিতীয় স্পেলে ফেরা ও’রোককে চার মারার পর লং অফ দিয়ে যে ছক্কাটি মারেন লিটন, সেটি সম্ভবত গোটা ম্যাচের সেরা শট।
পরের ওভারেই থেমে যায় জুটি। জেডেন লেনক্সকে জায়গা বানিয়ে খেলার চেষ্টায় বোল্ড হয়ে যান লিটন।
লেনক্সের পরের ওভারেই সিঙ্গল নিয়ে শান্ত শতরানে পা রাখেন ১১৪ বলে।
বাংলাদেশের দৃষ্টি তখন ২৮০-২৯০ রানে। কিন্তু লেনক্সের পরের ওভারে ছক্কার চেষ্টায় সীমানায় ধরা পড়েন শান্ত। পরের সময়টায় প্রত্যাশিত ঝড় দেখা যায়নি বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে।
অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ১৮ বলে ২২ করে আউট হয়ে যান। তাওহিদ হৃদয় শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থাকলেও সময়ের দাবি ততটা মেটাতে পারেননি। বিশেষ করে, লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে ব্যাটিংয়ের সময় স্ট্রাইক হাতছাড়া করেন তিনি বারবার।
রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ না থাকায় সাত নম্বরের পরে সেই অর্থে কোনো ব্যাটিং জানা কেউ ছিল না দলে। হৃদয় ২৯ বল খেলে ৩৩ রানে অপরাজিত থাকেন। শেষ ৭ ওভারে রান আসে মাত্র ৪৪।
ব্যাটিংয়ের শেষটা ভালো না হলেও বোলিংয়ের শুরুটা ভালোভাবেই করতে পারে বাংলাদেশ। সিরিজে প্রথমবার খেলতে নামা মুস্তাফিজুর রহমান নিজের দ্বিতীয় ওভারে ফিরিয়ে দেন হেনরি নিকোলসকে।
দ্বিতীয় উইকেটে নিক কেলি ও উইল ইয়াং চেষ্টা করেন জুটি গড়ে তোলার। সেটিও দীর্ঘায়িত হয়নি। দ্বিতীয় স্পেলে প্রান্ত বদলে ফিরে ইয়াংকে (১৯) ফিরিয়ে ৪৬ রানের জুটি ভাঙেন নাহিদ রানা। অধিনায়ক মিরাজ বেশিক্ষণ টিকতে দেননি প্রতিপক্ষ অধিনায়ক টম ল্যাথামকে (৫)।
আগের ম্যাচে ৮৩ রানের ইনিংস খেলা নিক কেলি আবার প্রতিরোধ গড়ে ফিফটি করেন। কিন্তু মুস্তাফিজের দারুণ এক স্লোয়ারে পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে শেষ হয় তার লড়াই (৫৯)।
নিউ জিল্যান্ডের আশার সমাপ্তি সেখানেই বলা চলে। মুহাম্মাদ আব্বাস কিছুক্ষণ লড়াই করে স্টাম্পে টেনে আনেন শরিফুল ইসলামের বল। নাহিদ রানার ১৪৮.৬ কিলোমিটার গতির ইয়র্কারে ছত্রখান হয় জশ ক্লার্কসনের স্টাম্প। শর্ট মিড উইকেটে মিরাজের দুর্দান্ত ডাইভিং ক্যাচ দ্রুতই থামায় ন্যাথান স্মিথকে।
সব হারিয়ে শেষ দিকে জ্বলে ওঠেন ফক্সক্রফট। তিনটি করে ছক্কা মারেন তিনি মুস্তাফিজ ও তানভিরকে। শেষ জুটিতে আসে ৩১ বলে ৫০ রান, সেখানে লিস্টারের অবদান স্রেফ ২ রান।
শেষ পর্যন্ত ফক্সক্রফটকে বিদায় করেই ম্যাচ শেষ করেন মিরাজ। ১১ বছর পর পিছিয়ে পড়েও সিরিজ জিতল বাংলোদেশ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৬৫/৮ (সাইফ ০, তানজিদ ১, সৌম্য ১৮, শান্ত ১০৫, লিটন ৭৬, হৃদয় ৩৩*, মিরাজ ২২, শরিফুল ১, তানভির ০, মুস্তাফিজ ৩*; ও’রোক ৭-১-৩২-৩, স্মিথ ৯-০-৫০-০, লিস্টার ১০-০-৬২-২, আব্বাস ৫-০-১৬-০, ক্লার্কসন ৩-০-১৯-০, লেনক্স ১০-০-৫০-২, ফক্সক্রফট ৬-০-৩৫-১)।
নিউ জিল্যান্ড: ৪৪.৫ ওভারে ২১০ (নিকোলস ৪, কেলি ৫৯, ইয়াং ১৯, ল্যাথাম ৫, আব্বাস ২৫, ফক্সক্রফট ৭৫, ক্লার্কসন ৬, স্মিথ ২, লেনক্স ২, ও’রোক ১, লিস্টার ২*; শরিফুল ৭-০-১৯-১, মুস্তাফিজ ৯-২-৪৩-৫, নাহিদ ১০-১-৩৭-২, তানভির ১০-০-৭০-০, মিরাজ ৮.৫-০-৩৫-২)।
আপনার মন্তব্য