০২ জুন, ২০১৬ ১৫:০৬
অর্থনীতির অসুখটা আরো গভীর হচ্ছে। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শেয়ারবাজার, আবাসন খাতের দুর্বলতা ও ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাবে রোগের লক্ষণটা আরো স্পষ্ট হচ্ছে। তবে সরকারের ‘প্যাশন ফর গ্রোথ’-এর অন্তরালে অর্থনীতিতে বিপদের এসব উপসর্গ চাপা পড়ছে। এর মধ্যেই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করবেন আজ। অর্থমন্ত্রীর এ বাজেটে কি শুধুই থাকছে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে আত্মতুষ্টির ফানুস, নাকি সমস্যা সমাধানে নতুন কোনো উদ্দীপনা— সেদিকেই দৃষ্টি সবার।
ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ অনেক মন্থর হয়ে পড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। একই সঙ্গে জিডিপিতেও ব্যক্তিখাতের অবদান কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে এখন মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অথচ আগের অর্থবছরগুলোয় মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৯ শতাংশের কম হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের অবদান ছিল ২২ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটে কী ধরনের উদ্যোগ থাকছে, উদ্যোক্তাদের দৃষ্টি এখন সেদিকে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি হোসেন খালেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার কমে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ। এদিকটিতে সরকারের নজর দেয়া উচিত। বিনিয়োগে গতি আনতে যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আছে, বিশেষ করে বিদ্যুত্ অবকাঠামোর মতো প্রকল্পগুলো দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখতে চাই বাজেটে।
সুশাসনের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় সাম্প্রতিক সময়ে নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। বাজেট থেকে বড় অঙ্কের পুনঃঅর্থায়ন করা হচ্ছে ব্যাংকগুলোয়। এর মধ্যেই গত ফেব্রুয়ারিতে চুরি গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আর্থিক খাতের অনিয়ম রোধে একটি কমিশন গঠন করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাপক প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতে হবে। না হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে না।
সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের শেয়ারবাজারও। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে প্রতিদিন ২-৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এখন তা প্রায় দশ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। বাজার চাঙ্গা থাকলে এখন পাঁচ-সাতশ কোটি টাকার লেনদেন হয়। অস্বাভাবিক কমে গেছে বহু কোম্পানির শেয়ারের দর। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ক্রয়মূল্য ফেরত পাচ্ছেন না ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।
১০ মাসের হিসাবের ভিত্তিত ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করেছে সরকার। প্রবৃদ্ধির এ উচ্চহার সত্ত্বেও সৃষ্টি হচ্ছে না গুণগত কর্মসংস্থান। যদিও জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের একটি যোগসূত্র রয়েছে। প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়ে। কিন্তু চলতি অর্থবছর প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হলেও কর্মসংস্থান সে অনুপাতে হয়নি। বিবিএসের লেবার ফোর্স সার্ভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দেশে মোট ছয় লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্থাত্ এক বছরে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র তিন লাখ। অন্যদিকে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান না বেড়ে উল্টো প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ হারে কমেছে।
সম্প্রতি এক সেমিনারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তার প্রতিফলন নেই। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশে প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে ধরনের উৎপাদনশীলতা দেখা যায়, আমাদের দেশে তা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে না। আবার ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগেও এক ধরনের বন্ধ্যত্ব দেখা দিয়েছে।
এমন বাস্তবতায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে এনবিআর থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। আর এনবিআর-বহির্ভূত খাত থেকে আসবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হচ্ছে ৯৭ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। এটি দেশের মোট জিডিপির ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
বড় অঙ্কের এ বাজেট বাস্তবায়নে বরাবরের মতোই রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন নিশ্চিত করা। চলতি অর্থবছর রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা অর্জন হয়নি। শেষ পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। একই সঙ্গে বাজেটে খরচের অঙ্ক ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি থেকে কমিয়ে ২ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তবে এটিও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বাজেটের আকার ও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য বড় হওয়ায় কোনো সমস্যা নেই, মূল সমস্যা বাস্তবায়নে। মূলত জিডিপির ৫ শতাংশের মতো ঘাটতি ধরে বাজেট প্রাক্কলন করা হয়। আর অর্থের সিংহভাগই আদায়ের দায়িত্ব পড়ে এনবিআরের ওপর। এক্ষেত্রে এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব আহরণের ওপর গুরুত্বারোপ করলে এনবিআরের ওপর চাপ কমত, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী তারা রাজস্ব আহরণ করতে সক্ষম হতো।
এবার এনবিআর থেকে রাজস্ব আহরণের কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। গত দুই অর্থবছরে সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণকারী খাত হিসেবে আয়করকে গণ্য করা হলেও এবার সে স্থান দখল করছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট। আগামী অর্থবছরে ভ্যাট থেকে রাজস্বের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। আয়কর থেকে ৭৩ হাজার ৩০০ কোটি ও আমদানি পর্যায়ে শুল্ক থেকে আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এ রাজস্ব আহরণে কর ও শুল্ক কাঠামোয় আনা হচ্ছে ব্যাপক পরিবর্তন।
বিভিন্ন কৌশলে শুল্ক ফাঁকি রোধে ১৯৬৯ সালের শুল্ক আইনের কিছু ধারায় পরিবর্তন আসছে। একই সঙ্গে পরিবর্তন আসছে শুল্কস্তরেও। বর্তমানে শুল্কস্তর রয়েছে ছয়টি। এগুলো হচ্ছে শূন্য, ১, ২, ৫, ১০ ও ২৫ শতাংশ। আগামী বাজেটেও ছয়টি শুল্কস্তর রাখা হচ্ছে। তবে বাতিল হচ্ছে ২ শতাংশের স্তরটি। ২ শতাংশ শুল্কহার ছিল কম্পিউটার পণ্যে। এর পরিবর্তে ১৫ শতাংশের একটি স্তর যোগ করা হচ্ছে। ফলে আগামী বাজেটে আমদানি শুল্কের স্তর হবে শূন্য, ১, ৫, ১০, ১৫ ও ২৫ শতাংশ।
পরিবর্তন আসছে কর আহরণের পদ্ধতিতেও। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির করপোরেট করহার ৩৫ শতাংশ। এ করের ক্ষেত্রে দুটি স্তর করা হতে পারে। যারা উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, তাদের জন্য এ কর সাড়ে ৩২ শতাংশ ও উৎপাদক ব্যতীত অন্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা ৩৫ শতাংশই বহাল থাকতে পারে। এছাড়া দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত তৈরি পোশাক রফতানিতে উেস কর বর্তমানে দশমিক ৬ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
জানা গেছে, আগামী বাজেটে বাড়ানো হচ্ছে বেশকিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক। একই সঙ্গে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন আইন কার্যকর হলে বেশকিছু পণ্যের ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক উঠে যাবে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় এটি অন্তরায় হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ এ প্রসঙ্গে বলেন, এমনিতেই বিনিয়োগ নেই। এমন অবস্থায় দেশীয় শিল্প অরক্ষিত হলে বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটানো দুরূহ হবে। বিনিয়োগে গতি আনতে সরকারের যেসব প্রকল্প আছে, সেগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই। সরকারের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার যে মহাপরিকল্পনা, তা কবে নাগাদ পূর্ণতা পাবে, তার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা বাজেটে প্রত্যাশা করছি। করপোরেট ট্যাক্স কমানোর দাবি আছে আমাদের। এটি দেশী-বিদেশী দুই ধরনের বিনিয়োগকেই আরো বেগবান করবে। সবশেষে দেশের সাড়ে তিন কোটি মধ্যম আয়ের মানুষকে রাজস্বের আওতায় আনতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। এর প্রতিফলন বাজেটে দেখতে চাই।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাত থেকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয়া হবে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রাক্কলন করা হচ্ছে ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর বাইরে বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। আর জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশে বেঁধে রাখার লক্ষ্য থাকছে বাজেটে, চলতি অর্থবছরও যা ৬ শতাংশ।
সূত্র : বণিক বার্তা
আপনার মন্তব্য