সিলেটটুডে ডেস্ক

১৭ জানুয়ারি, ২০১৭ ১৮:৫৬

‘অপরাধ করিনি, এলাকায় যাব, যা হবার হবে’

প্রায় আড়াই মাস কারাভোগের পর মঙ্গলবার মুক্তি পেয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনায় আটক রসরাজ দাস (২৭)।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের সুপার মো. নুরুন্নবী জানান, জামিনের কাগজপত্র জেলা কারাগারে পৌঁছানোর পর মঙ্গলবার বেলা ১২টা ২৫ মিনিটে কারাগার থেকে রসরাজকে মুক্তি দেওয়া হয়।

ফেইসবুকে ‘অবমাননাকর’ পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় ২৯ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো।

কারাগারের ভেতরে বিশেষ সেলে বন্দি রাখা হয়েছিলো রসরাজ দাসকে। অন্য আসামিরা কারাগারের ভেতরে এদিক সেদিক হাঁটাচলা করতে পারলেও ২৪ ঘণ্টা ধরেই একটি কক্ষে বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে তাকে।

মুক্তি পাওয়ার পর এ প্রসঙ্গে রসরাজ দাস বলেন, ‘আমাকে গ্রেফতারের পর দেখতে পেলাম আমাদের এলাকার অনেকেই জেলখানায় বন্দি। জেলখানার ভেতরে তারা ঘুরে ফিরে বেড়ায়। আর আমাকে আলাদা একটি সেলের মধ্যে বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল। কারো সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হতো না। ২৪ ঘণ্টা একটি সেলের মধ্যে রাখা হতো।’

আলাদা রাখার ব্যাপারে রসরাজ জেল সুপারের কাছে জানতে চাইলে তিনি রসরাজকে জানান, ‘নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাকে আলাদা সেলে রাখা হয়েছে।’

রসরাজ সেই দিনকার ঘটনার বর্ণণা দিয়ে বলেন, ‘ফেসবুকে কী হয়েছে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। তখন তিনি বিলে মাছ ধরছিলেন। হঠাৎ করে একদল লোক এসে তাকে মারধর শুরু করে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে আহত  অবস্থায় পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হয়।’

রসরাজ জানান, ‘ফেসবুকে ছবি দেখার জন্য চাচাতো ভাইকে বলেছিলেন একটি আইডি খুলে দিতে। এর বেশি তিনি কিছু জানতেন না।’

কারাগার থেকে বের হয়ে রসরাজ বললেন, ‘এখন বাড়ি ফিরে মা-বাবার কাছে যাব। সেখানে আগের পেশা মাছ ধরার কাজে থাকব। মা-বাবাকে রোজগার করে খাওয়াতে পারলেই খুশি হবো।’

মুক্তি পাওয়ার পর নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করে রসরাজ বলেন, ‘অপরাধ করিনি। এলাকায় যাব। কপালে যা হবার হবে।’  

জেল গেইটে রসরাজের মামা ইন্দ্রজিত দাস জানান, ‘ভাগ্নেকে নিয়ে তার গ্রামে যাবো। এলাকার মুরব্বিদের কাছে তাকে তুলে দেবো। এর বেশি কিবা (কিইবা) করার আছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা ও দায়রা জজ মো. ইসমাইল হোসেন সোমবার রসরাজকে জামিন দেন। পুলিশ এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করা পর্যন্ত জামিনে থাকবেন তিনি ।

নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে রাসরাজ (৩০) কারামুক্ত হয়ে স্বজনদের সঙ্গে বাড়ির পথে রওনা হন।

গত বছরের ২৯ অক্টোবর ফেইসবুকে ধর্মীয় অবমাননার ছবি পোস্ট করার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই অভিযোগে পরদিন ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে ১৫টি মন্দিরসহ হিন্দুদের শতাধিক ঘরে ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

হামলার ঘটনায় স্থানীয় বারোয়ারি মন্দিরের পুরোহিতসহ দুই ব্যক্তি দুটি মামলা করেন। প্রত্যেকটি মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ১০০০ থেকে ১২০০ জনকে আসামি করা হয়।

রসরাজকে আদালতে হাজির করে ৩ নভেম্বর পুলিশ সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এরপর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত গত ৮ নভেম্বর রসরাজের জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।  

ওই হামলার ঘটনায় নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আঁখির সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অনুসন্ধানে। ঘটনার দুই মাস পর ঢাকা থেকে আঁখিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে আঁখির ব্যক্তিগত সহকারী উত্তম কুমার দাস (২৫) ও ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মনোরঞ্জন দেবনাথকেও (৪০) আটক করে পুলিশ।

হরিপুর ইউনিয়ন থেকে ১৪-১৫টি ট্রাক ভরে মানুষ আসার পর নাসিরনগরের হিন্দু পল্লীতে হামলা হয়। যেসব ট্রাকে হামলাকারীরা এসেছিল সেগুলোর ব্যবস্থা ও অর্থের যোগান চেয়ারম্যান আঁখি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে।

এরই মধ‌্যে নাসিরনগরের ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তকারীরা জানতে পারেন রসরাজের মোবাইল ফোন থেকে ধর্মীয় অবমাননার ছবি আপলোড হয়নি। ওই ছবি সম্পাদনা করা হয়েছিল হরিণবেড় বাজারে আল আমিন সাইবার পয়েন্ট অ্যান্ড স্টুডিও থেকে, যার মালিক জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ব‌্যক্তি।

ঘটনার শুরু থেকেই অভিযোগ ছিল, জাহাঙ্গীর আলম তার সাইবার ক‌্যাফে থেকে ধর্মীয় অবমাননাকর ছবিটি প্রিন্ট করে লিফলেট আকারে তা এলাকায় বিতরণ করেন। গত বছরের ২৮ নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর জাহাঙ্গীর ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তা স্বীকারও করেন।

জাহাঙ্গীর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আশুতোষ দাসের নাম বলেন, যিনি রসরাজের ফেইসবুক আইডি ও পাসওয়ার্ড জানতেন।

১০ জানুযারি আশুতোষ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং পরদিন তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. শফিকুল ইসলামের আদালতে জবানবন্দি দেন।

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন ও বিডিনিউজ

আপনার মন্তব্য

আলোচিত