নিজস্ব প্রতিবেদক

২১ ফেব্রুয়ারি , ২০১৭ ০০:২০

ভাষাকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ : যা ঘটেছিলো সেদিন

আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন তরুণ শহীদ হন। তাই এ দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালে মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিয়মিত পালিত হচ্ছে।

বিশ্বে এ যাবতকালে একমাত্র বাঙালি জাতিই ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। ভাষার জন্য জীবন দেয়ার এমন নজির পৃথিবীর আর কোথাও নেই।

যা ঘটেছিল সেদিন:

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন ছাত্র-যুবক হতাহত হন। শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে রাজপথ। শোকাবহ এ ঘটনার প্রতিবাদে পুরো পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে বেরিয়ে আসে রাস্তায়।

এর আগে ছাত্রদের আন্দোলনের পাশাপাশি পূর্ব বঙ্গের আইন পরিষদের সদস্যরা ভাষা সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মতামতকে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। ওই দিন সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত আইন পরিষদের সদস্যদের সভাস্থল ঘিরে রাখে পুলিশ।

এর ২ ঘণ্টা পর ছাত্ররা পুলিশের প্রতিবন্ধকতা ভেঙে ছাত্ররা রাস্তায় নামার প্রস্তুতি নিলে তাদের সতর্ক করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এসময় কিছু ছাত্র বের হতে পারলেও অনেকে পুলিশ দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ বন্ধ করতে অনুরোধ জানালেও পুলিশ তা করেনি। ছাত্ররা ঢাবি ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময় কয়েকজনকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ছাত্রদের গ্রেফতারের পর ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা।

বেলা ২টার দিকে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ছাত্ররা প্রথমে আইন পরিষদের সদস্যদের আইনসভায় যোগ দিতে বাধা দিলেও পরে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারাও আইনসভায় গিয়ে নিজেদের দাবি উত্থাপন করবে। কিন্তু ছাত্ররা আইনসভার দিকে রওনা হলে বিকাল ৩টার দিকে পুলিশ ছাত্রাবাসে ঢুকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। গুলিতে আব্দুল জব্বার এবং রফিক উদ্দিন আহমেদ ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এছাড়া অহিউল্লাহ নামের একজন ৮/৯ বছরেরে এক কিশোরসহ নিহত হন আব্দুস সালাম, আবুল বরকতসহ আরও অনেকে।

ছাত্রদের হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে জনগণ ঘটনাস্থলে ছুটে আসতে থাকেন। ছাত্রদের আন্দোলন জনমানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়। তাতে যোগ দেন সংস্কৃতিকর্মীরাও। বেতারের শিল্পীরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে শিল্পী ধর্মঘট আহ্বান করেন এবং রেডিও স্টেশনে পূর্বে ধারণকৃত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে থাকেন।

গণপরিষদে অধিবেশন শুরুর প্রস্তুতি চললেও পুলিশের গুলির খবর জানতে পেরে মাওলানা তর্কবাগিশসহ বিরোধী দলীয় বেশ কয়েকজন অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান।

২১ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের ছয়জন সদস্য মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে হাসপাতালে আহত ছাত্রদের দেখতে যাওয়ার অনুরোধ করেন এবং শোক প্রদর্শনের জন্য অধিবেশন স্থগিতের কথা বলেন। নুরুল আমিন তাদের অনুরোধ না রাখায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা।

পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি আইন পরিষদে বিরোধী দলের সদস্যরা বিষয়টি উত্থাপন করেন। এদিনও তারা নুরুল আমিনকে হাসপাতালে আহত ছাত্রদের দেখতে যাওয়ার এবং অধিবেশন মুলতবি করার আহ্বান জানান। এদিন ক্ষমতাসীন দলের কিছু সদস্যও এই আহ্বানে সমর্থন জানান। কিন্তু নুরুল আমিন তাদের আহ্বানের সাড়া না দিয়ে অধিবেশন অব্যাহত রাখেন এবং হাসপাতালে যেতে অস্বীকৃতি জানান।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা এক মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং পরে ক্রমে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষকবৃন্দ, ঢাকাস্থ বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন এবং সর্বস্তরের জনগণ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। দিবসের ভোরে অনুষ্ঠিত হয় প্রভাতফেরী। রাজধানীর পাশাপাশি সারাদেশের জেলা-উপজেলা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সর্বস্তরের জনতা। সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হয় ভাষা শহিদদের।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যে চেতনায় উদ্দীপিত হয়ে বাঙালিরা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, আজ তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সারা পৃথিবীর মানুষ শ্রদ্ধা জানান বাংলার ভাষা শহিদদের, জানতে পারে ভাষাকে ভালোবেসে জীবন দেয়া বীর বাঙালিদের আত্মত্যাগের কথা।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত