নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:০৬

ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে অপসারিত হয়েছিলেন জামায়াতে যোগ দেওয়া বিচারপতি শাহিদুর রহমান

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তিনি অপসারিত হন

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন হাইকোর্টের সাবেক অতিরিক্ত বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানসহ বিভিন্ন পেশার ও অঙ্গনের বেশ কয়েকজন ব্যক্তিত্ব।

গতকাল মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকালে রাজধানীর কাকরাইলস্থ ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে দলটিতে যোগদান করেন।

রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শাহিদুর রহমানের এই যোগদান নতুন করে আলোচনায় এনেছে তার বিচারিক জীবনের এক নজিরবিহীন ও বিতর্কিত অধ্যায়কে। বিচার বিভাগে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে বাংলাদেশে প্রথম বরখাস্ত হওয়া বিচারপতি ছিলেন সৈয়দ শাহিদুর রহমান। তার বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনসহ সংবিধানসম্মত সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় এবং দীর্ঘ বিচারিক লড়াই শেষে সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের রায়েই তার অপসারণ চূড়ান্তভাবে বহাল থাকে।

মামলার নথি ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সৈয়দ শাহিদুর রহমান বিএনপি-জামায়াতের চার-দলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৩ সালের এপ্রিলে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। একই বছর নাসিম সুলতানা কনা নামের এক নারী অভিযোগ করেন, ঘুষের বিনিময়ে জামিন করিয়ে দেওয়ার কথা বলে শাহিদুর রহমান অর্থ গ্রহণ করেছেন। বিষয়টি তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদের দৃষ্টিগোচর করেন।

২০০৩ সালের ১ অক্টোবর আইনজীবীদের এক সভায় ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ জানান যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় অন্য এক সহকর্মী বিচারককে বলে জামিন করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ওই বিচারক ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ১৪ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে বিষয়টি জানানো হলে ২০ অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠান।

চিঠির প্রেক্ষিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ৩০ অক্টোবর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি রুহুল আমিন ও বিচারপতি মো. ফজলুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিস্তারিত তদন্ত শেষ করে ২০০৪ সালের ২৬ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়— অভিযোগটি পূর্ণাঙ্গভাবে সন্দেহাতীত প্রমাণিত না হলেও তা একেবারেই ভিত্তিহীন বলা যাচ্ছে না। ফলে অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে শাহিদুর রহমানের পদে থাকা উচিত নয় বলে কাউন্সিল মতামত দেয়। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তদানীন্তন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৬ (৬) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে তাকে পদ থেকে অপসারণ করেন।

পদচ্যুত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সেই আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে শাহিদুর রহমান হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রুলের শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রাষ্ট্রপতির অপসারণের সিদ্ধান্তকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে রায় দেয়।

তবে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি সুরক্ষায় হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ করেন। ২০০৫ সালের ২৫ এপ্রিল আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে আপিল শুনানির অনুমতি দেন।

দীর্ঘ ১০ বছর পর ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আগের রায় বাতিল করে আইনজীবীর আপিল মঞ্জুর করেন। এতে করে ২০০৪ সালে তাকে অপসারণের জন্য নেওয়া রাষ্ট্রপতির মূল সিদ্ধান্তটিই চূড়ান্তভাবে বহাল থাকে এবং সৈয়দ শাহিদুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে বসার স্থায়ী পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

শুনানিতে আপিলকারী পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন ও রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা অংশ নেন। অপরদিকে শাহিদুর রহমান নিজের পক্ষে নিজেই শুনানি করেছিলেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত