মোসাইদ রাহাত, সুনামগঞ্জ:

২৮ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৫১

নষ্ট সরকারি নলকূপ, ‘পানি কিনে খাচ্ছেন’ গুচ্ছগ্রামের মানুষ

‘গেল দেড় বছর ধরি আমাদের খাবার পানি নিয়া সমস্যা। অনেকবার স্যার ম্যাডামরে জানাইছি। তারা দেখবা কইয়া কোনো ব্যবস্থা নিছোইন না। আমরার মসজিদের কলও আগে পানি উঠতো। সেটিও নষ্ট। তাই সবাইরে নদীত গিয়া ওযু করা লাগে। প্রতিদিন ৫টাকা দিয়ে খাবার পানি কিনতে হয়। প্রধামন্ত্রী আমরার ভালার লাগি থাকার জায়গা দিসোইন। নষ্ট টিউবওয়েলগুলা ঠিক করি দিলে আমরার পানির কষ্ট কমতো।’

আক্ষেপভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ওয়েজখালী গ্রামের কালা মিয়া।

খাবার পানি সংগ্রহের জন্য গ্রামের একটি বাড়িতে এসেছেন তিনি। এখানে তার মতো পানি নিতে এসেছেন আরও শতাধিক পারিবারের সদস্য। কারো হাতে কলস, কারো হাতে বালতি।



তারা সকলেই লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ওয়েজখালী এলাকার সুরমা নদী পাশ্ববর্তী ‘গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামে ১২০টি পরিবারের বসবাস। গ্রামের বাসিন্দাদের খাবার পানির জন্য এখন নেই কোনো নলকূপ। সরকারি নলকূপগুলো একে একে নষ্ট হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির জন্য দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা।

সরজমিনে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দিন আনে দিন খায়। এখানে কেউ অন্যের জমিতে ধান চাষাবাদ করে আবার কেউ নদী থেকে মাছ ধরে। আবার নদী থেকে বালু তুলে জীবনযাপন করেন। তবে গেল এক-দেড় বছর ধরে এক এক করে সরকারের দেয়া ১৫টি নলকূপই নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন মেরামত না করা ও পানি লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় একটি নলকূপ থেকে আসছে না পানি। বর্তমানে খাবার পানি সংকট দূরকরণে গ্রামেরই এক বাসিন্দা মীনা রানী দাসের সহযোগিতায় মটরের মাধ্যমে পানি নিয়ে দিনযাপন করছেন তারা। তবে সেক্ষেত্রে দৈনিক প্রত্যেককে গুনতে হচ্ছে ৫ টাকা করে। টাকা নেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে কারেন্ট বিল বেশি আসা। এছাড়া সুরমা নদী পাশে থাকায় গ্রামের একমাত্র মসজিদের মুসল্লীরা সেখানেই ওযু করেন বাধ্য হয়েই। তবে গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি পুকুরের পানিতে গোসল তালা বাসন এসব ধোয়া হয়। এই পানি খাওয়া যায় না। সরকারের দেওয়া নলকূপগুলো নষ্ট। তার মধ্যে এখন বিকেলে ইফতারের আগে দৌড় দিতে হয় পানির জন্য।



গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা পারভিন বেগম বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে আছি পানির লাগি। রোজ আওয়া লাগে আফা (মীনা রানী দাস) বাড়িত। ইকানো আমরারে ৬মাস পানি মাগনা দিছেন। কোনো টাকা নেয় নাই। এখন কারেন্ট বিল বেশি আয় দেখিয়া ৫ টাকা করি দেওয়া লাগে। আমরার টিউবওয়েল ঠিক করি দিলে এই কষ্ট করা লাগতো না।’

ছগ্রামের মসজিদের ইমাম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে দিনপার কররা। নদীত গোসল তালা বাসন সব ধোয়া হয়। ওযুর পানিও ইকান থকি আনা লাগে নদীএ পাড়টাও ঠিক না পাও পিছলিয়া। অনেক সময় দূর্ঘটনা অয়। এখন আবার রমজান মাস সবাইরে ইফতারের আগে পানি লাগি লাইন ধরতে হয়। এক বাড়ি থকি ৫ টাকা করি আমরা সবে পানি আনি। তাইন এই সাহায্য করায় আমরা পানি খাইয়া বাঁচিয়া আছি।’

মীনা রানী দাস বলেন, ‘আমিও সরকারের গুচ্ছগ্রামে ঘর পাওয়া একজন নারী। সবার কষ্ট লাগি আর নিজেদের পানির দরকারের লাগি মটর লাগাইয়া সবাইরে পানি তুলিয়া দেই। প্রথম ৫-৬ মাস আমি টাকা নিসি না। কিন্তু কারেন্ট বিল বেশি আয় যার লাগি আমি ৫ টাকা করি নেই। আমিও গরীব মানুষ টাকা কই পাইতাম।’

তবে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানতাম না। দ্রুত ওই গ্রামের খাবার পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে টিউবওয়েলগুলো পুনরায় মেরামত করা হবে।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত