২৪ মে, ২০২১ ১৯:১৪
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার বিভিন্ন পুঞ্জিতে পানজুম দখলের চেষ্টা ও নির্বিচারে গাছ কাটার হিড়িক লেগেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পুঞ্জিতে একের পর এক গাছ কাটার ঘটনায় খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠী নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। পানজুম থেকে তাদের উচ্ছেদ, চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়া ও পানীয়জল ব্যাবহারে বাঁধা প্রদানের ঘটনায় পুঞ্জিত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। জীবনজীবিকা হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়ায় বংশপরম্পরায় টিলা-পাহাড় চূড়ায় তিলে তিলে গড়ে তোলা বসতি ফেলে চলে যাচ্ছে খাসিয়ারা। এই পরিস্থিতি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)'র পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কাঁকড়াছড়া পুঞ্জি পরিদর্শন করেন।
রোববার (২৩ মে) বাপা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিলের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাপার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ও বাপা সিলেট আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম, বাপার জাতীয় পরিষদ সদস্য ও হবিগঞ্জ আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল, বৃহত্তর সিলেট ত্রিপুরা উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি জনক দেববর্মা এবং সম্পাদক সুমন দেববর্মা, ঝিমাই পুঞ্জির হেডম্যান রানা সুরং এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নেত্রী জেসলিনা পলং।
পরিদর্শনকালে বাপা প্রতিনিধিদল প্রত্যক্ষ করেন যে, বিগত কয়েক বছর থেকে কাঁকড়াছড়া পুঞ্জিতে নির্বিচারে গাছ কেটে প্রায় ২০টি পানজুম বিনাশ করে চা-বাগান সৃজন করা হয়েছে। পানজুম বিনাশ করতে যেয়ে ছোটবড় প্রায় হাজারখানেক বৃক্ষ কাটা হয়েছে। এখনো বছর দু'য়েক পূর্বে কাটা গাছের গোড়া প্রত্যক্ষ করেছেন প্রতিনিধি দল। কাটা গাছগুলোর ভেতর বন্যপ্রাণীর খাবার বিভিন্ন ফল-ফলাদি ও ঔষধি গাছও রয়েছে। পানজুম বিনাশ করতে যেয়ে নির্বিচারে চা-বাগান কর্তৃপক্ষের এভাবে গাছ কাটা নজিরবিহীন।
বাপা প্রতিনিধি দলের কাছে পুঞ্জিবাসী অভিযোগ করেন যে, গত প্রায় সাত/আট বছর ধরে বাগান কর্তৃপক্ষ অন্তত ২০টি ছোট-বড় জুম দখল করে সেখানে চা-চারা রোপণ করছে। এ ছাড়া পুঞ্জি থেকে বের হওয়ার প্রধান রাস্তাটি বন্ধ করে দিয়েছে বাগান কর্তৃপক্ষ। গত দু-তিন বছরে তাদের কবরস্থান দখল করে সেখানেও চায়ের চারা রোপণ করা হয়েছে। বর্তমানে তারা মরদেহ সৎকারের জায়গাও খুঁজে পাচ্ছেন না। এছাড়া খাবার পানির জন্য খনন করা ইদারা (কুয়া) থেকে সাম্প্রতিককালে তাদের পানি খেতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে পুঞ্জিবাসীকে ছড়ার পানি খেতে হচ্ছে। চা বাগানের মালিক নিজেকে অনেক প্রভাবশালী পরিচয় দিয়ে পুঞ্জিবাসীদের উচ্ছেদ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। তাদের অত্যাচারে ইতিমধ্যে পুঞ্জি ছেড়ে চলে গেছে প্রায় ৩০টি খাসিয়া ও গারো পরিবার। মাত্র ১৭টি পরিবার এখনো মাটি কামড়ে পড়ে আছে। কিন্তু সম্প্রতি এই পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করতে ১১ই মে পুঞ্জিবাসীর আয়ের অন্যতম উৎস একটি সমৃদ্ধ পানজুম কেটে ফেলা হয়।
বাপা প্রতিনিধিরা সরেজমিনে সেই পানজুম পরিদর্শনকালে দেখতে পেয়েছেন কেটে ফেলা শতাধিক ছোটবড় গাছ। এছাড়াও প্রায় দুই বছর পূর্বে কাটা অনেক গাছের গোড়া দেখতে পেয়েছেন দখল করে নেওয়া পানজুমে।
পানজুম পরিদর্শন শেষে পুঞ্জিবাসীকে নিয়ে আয়োজিত একটি সংহতি সমাবেশে বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কুলাউড়াসহ মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার হরনের চেষ্টা চলছে। কোন না কোন পুঞ্জির পানজুম থেকে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলার ঘটনার তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। অতিসম্প্রতি খেঁজুরছড়া, আগারপুঞ্জি, নুনছড়া, সাহেবের টিলাসহ বিভিন্ন পুঞ্জির পানজুমে গাছ কাটার ঘটনার খবর স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে এসেছে। অনেক পুঞ্জির ঘটনা এই কাঁকড়াছড়া পুঞ্জির মত এখনো হয়তো গোপন রয়েছে।
তিনি বলেন, পুঞ্জি থেকে উচ্ছেদের ভয়ে এবং হামলা-মামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে অনেক পুঞ্জি চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ও বন-বিভাগের অসাধু কিছু কর্মকর্তার অযৌক্তিক চাঁদাবাজির স্বীকার হচ্ছে। চা-বাগানের উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রে হামলা-মামলায় বিপর্যস্ত হয়েছে বিভিন্ন পুঞ্জির নিরীহ নাগরিকেরা। নাহার চা বাগান ও ঝিমাই চা বাগান পুঞ্জিবাসীকে কিভাবে হেনস্থা করেছে তা বাপা ইতিপূর্বে প্রত্যক্ষ করেছে। যদিও বাপা সহ সংবাদমাধ্যম ও আদিবাসী সংগঠনের যৌথ লড়াইয়ে এ দুই পুঞ্জির অধিবাসীদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। তাদের চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়ার মধ্যযুগীয় সামন্তবাদী উদ্যোগ চা-বাগান কর্তৃপক্ষকে শেষতক প্রত্যাহার করতে হয়।
বাপা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেখতে চায়। কাঁকড়াছড়া পুঞ্জিতে কয়েক বছর ধরে নির্বিচারে গাছ কাটা হলেও বন বিভাগ গাছ কাটার দায়ে চা-বাগান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পাশাপাশি ভোটার তালিকায় নাম থাকা পুঞ্জির ৩০টি পরিবার ইতিমধ্যে উচ্ছেদ হয়ে গেলেও স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা উদ্বেগ প্রকাশ করেন শরীফ জামিল।
বাপার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ও বাপা সিলেট আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের অংশীদার। খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠীর ভূমির সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় বাপা বিভিন্ন পুঞ্জির প্রতিনিধি, আদিবাসী সংগঠনের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সমস্যা সমাধানে বৃহৎ কর্মসূচি পালন করবে। কিছু দিন পরপর একেকটি পুঞ্জিতে একি সমস্যা সৃষ্টি করে পুঞ্জিবাসীদের হেনস্থা করা হয়। যা বন্ধ করতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাপার জাতীয় পরিষদ সদস্য ও হবিগঞ্জ আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, গাছ কাটার ক্ষেত্রে প্রথমে বাংলাদেশ চা বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। চা বোর্ড অনুমোদন দিলে তা বন বিভাগের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। এখানে গাছ কাটার কোন বিধি মানেনি বাগান কর্তৃপক্ষ।
বৃহত্তর সিলেট ত্রিপুরা উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি জনক দেববর্মা বলেন, আমাদের সমস্যা এক ও অভিন্ন। এই সমস্যা সমাধান করতে হলে বাপার সাথে মিলে আদিবাসী সংগঠনসমূহের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করতে হবে।
পুঞ্জির শতবর্ষী বাসিন্দা এডুয়েন মারলিয়া বলেন, ‘এই পুঞ্জিতে আমার জন্ম। এই পুঞ্জিতে অনেক জুম ও পুরনো গাছ ছিল। এখন আর এগুলো নেই। সব দখল করে নিচ্ছে বাগান কর্তৃপক্ষ। অনেকেই এখান থেকে অন্যত্র চলে গেছে। এভাবে চললে তারা পুঞ্জিতে বসবাস করতে পারবে না।’
পুঞ্জির হেডম্যান জনপল চিছিম বলেন, উচ্ছেদের ভয়ে আমরা পুরনো গির্জা ঘরটি সংস্কার করতে পারছি না। জুম দখলের চেষ্টায় যেকোনো সময় আমাদের উপর হামলা চালানো হতে পারে। সেজন্য রাত জেগে পুরুষদের জুমে পাহারা দিতে হচ্ছে। মাত্র ১৭ পরিবারে পুরুষের সংখ্যাও এখন কম। পুঞ্জি ছেড়ে চলে গেছে প্রায় ৩০টি পরিবার। রেহানা চা-বাগান কর্তৃপক্ষ যেভাবে একের পর এক জুম দখল করছে, তাতে আমরা পুঞ্জিবাসী নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। এসব ঘটনা প্রশাসন বা সংবাদমাধ্যমকে জানালে পুঞ্জি থেকে দ্রুত উচ্ছেদ করে দেয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
আপনার মন্তব্য