নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ মে, ২০২১ ০০:৫২

গভীর সঙ্কটে তারাপুর চা বাগান

ক্ষতিপূরণ দেননি রাগীব আলী, ঋণ দিচ্ছে না ব্যাংক, বেতন পাচ্ছেন না শ্রমিকরা, পাতা উত্তোলন বন্ধ

গভীর সঙ্কটে পড়েছে সিলেটের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার দেবোত্তের সম্পত্তি তারাপুর চা বাগান। আদালতের নির্দেশে ব্যবস্থাপনা কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পর সিলেটের আলোচিত এই চা বাগান পরিচালনা নিয়ে সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অর্থের অভাবে শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছে না ব্যবস্থাপনা কমিটি। ফলে বন্ধ হয়ে পড়েছে উৎপাদন। এতে করে এই চা বাগানের ভবিষ্যত নিয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সিলেট নগরের তারাপুর এলাকার এই চা বাগান প্রতারণার মাধ্যমে দখল করে নিয়েছিলেন বিতর্কিত শিল্পপতি রাগীব আলী। ২০১৬ সালে উচ্চ আদালতের এক রায়ের প্রেক্ষিতে রাগীব আলীর দখল থেকে চা বাগানের ভূমি উদ্ধার করা হয়। সেসময় আদালত নির্ধারিত সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে ওই বাগান বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

তবে গত বছর উচ্চ আদালতের রিভিউ রায়ের প্রেক্ষিতে আলোচিত এই সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব হারান পঙ্কজ গুপ্ত। রিভিউ রায়ে এই সম্পত্তি সংরক্ষণ ও তদারকির জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই নির্দেশনার প্রেক্ষিতে সিলেটের জেলা প্রশাসক ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করেন। এরপর চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি ব্যবস্থাপনা কমিটি তারাপুর চা বাগানের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

তবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই অর্থ সঙ্কটে পড়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি। এতোদিন কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই বাগানের কার্যক্রম চললেও ব্যবস্থাপনা কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পর ঋণ প্রদান বন্ধ করে দেয় কৃষি ব্যাংক। ঋণ না পেয়ে শ্রমিকদের মজুরি প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে ব্যবস্থাপনা কমিটি। এদিকে, মজুরি না পাওয়ায় গত ২০ মে থেকে চা পাতা উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছেন শ্রমিকরা। ফলে বন্ধ হয়ে পড়েছে উৎপাদন। মজুরি না পাওয়ায় শ্রমিকরাও পড়েছেন সঙ্কটে।

ব্যবস্থানা কমিটির সদস্যরা জানান, রিভিউ রায়ে চা বাগান ধ্বংসের জন্য শিল্পপতি রাগীব আলীকে সোয়া ৩ কোটি ক্ষতিপুরণ প্রদান ও বাগানের ভেতর থেকে স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়। তবে এখন পর্যন্ত রাগীব আলী কোনো ক্ষতিপূরণ প্রদান করেননি। স্থাপনাও সরিয়ে নেননি।

এদিকে, বেতন ভাতা না পেয়ে গত ২০মে ও ২৩ সিলেটের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচী পালন করে তারাপুর চা বাগানের শ্রমিকরা। ২০ মে থেকে তারা পাতা উত্তোলন বন্ধ করে দেন। তবে সর্বশেষ বুধবার (২৬ মে) শ্রমিকদের সাথে বাগান ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠকে দুই সপ্তাহের মজুরি প্রদান সাপেক্ষে আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে কাজ শুরুর আশ্বাস দেন শ্রমিকরা। তবে অর্থের সংস্থান না হলে এভাবে কতদিন বাগানের কার্যক্রম চালানো যাবে এ নিয়ে সন্দিহান বাগান ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরাই।

তারাপুর চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি চৈতন মোদী বলেন, তারাপুর চা-বাগানের মালিকানা সংক্রান্ত নানা জটিলতা ও মামলা মোকদ্দমা থাকায় ঘন ঘন মালিকানা পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে যারা বাগান পরিচালনা করছেন তারা ঠিকমতো বেতন-ভাতা পরিশোধ করছেন না। শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তিনি বলেন, মাত্র ১২০টাকা মজুরিতে আমাদের সংসার চলে। এখন এই টাকাও যদি না পাই তবে না খেয়ে মরতে হবে।

বাগানে পাতা উত্তোলন বন্ধ থাকার কথা জানিয়ে তারাপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক অপু চক্রবর্তী বলেন, বাগানে নতুন চা পাতা তোলা যাচ্ছে না। শ্রমিকরা মজুরি পাচ্ছে না। একারণে তারা পাত্তা উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছেন।

বাগান ব্যবস্থাপক জানান, বর্তমানে তারাপুর চা বাগানে ১৪১ জন শ্রমিক কর্মরত আছেন। মজুরি না পাওয়ায় এই শ্রমিক ও তাদের পরিকবারও সঙ্কটে পড়েছে বলে জানান তিনি।

গতবছরের ২৭ সেপ্টেম্বর তারাপুর চা বাগান নিয়ে উচ্চ আদালতের রিভিউয়ের এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এতে বাগান পরিচালনার লক্ষ্যে ৫ বছরের জন্য ১১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন হাই কোর্ট। ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে চা বাগানের সম্পত্তি পরিচালনার পাশাপাশি বাগান দখল করে রাগীব আলী ও তার স্ত্রীর নামে গড়ে তোলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সকল স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া বাগান ধ্বংস করে স্থাপনা নির্মাণের জন্য রাগীব আলীকে ক্ষতিপুরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালতের নির্দেশে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নারায়ণ চন্দ্র সাহাকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিরল শান্তনু দত্ত সন্তু।

তিনি বলেন, আমরা গত জানুয়ারিতে বাগানের দায়িত্ব নেই। এরআগে থেকেই কৃষি ব্যংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাগানের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। চা পাতা বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করা হতো।

শন্তু বলেন, আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বাগানের কার্যক্রম চালিয়ে যাই। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ায় পর এই ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধের কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু ৬ মে কৃষি ব্যাংক থেকে জানানো হয়, যেহেতু এটি দেবোত্তোর সম্পত্তি তাই তারা আর ঋণ দিতে পারবেন না। ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত জানার পর আমরা বিপাকে পড়েছি।

বুধবার সন্ধ্যায় শন্তু বলেন, আজ আমরা শ্রমিক নেতাদের সাথে বসেছিলাম। আমরা তাদের দুই সপ্তাহের মজুরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছি। এবং তারা বৃহস্পতিবার থেকে কাজ শুরু করবেন।

তিনি বলেন, আমরা নিজেদের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এই টাকা প্রদান করবো। কিন্তু বাগান পরিচালনার জন্য দ্রুত অর্থের সংস্থান না হলে আমাদের পক্ষ থেকে এভাবে টাকা দিয়ে চালানো সম্ভব নয়। এভাবে চলতে থাকলে আমরা আদালতে গিয়ে নিজেদের অপরাগতা প্রকাশ করবো।

দেবেত্তোর সম্পত্তি জেনেও এতোদিন ব্যাংক ঋণ দিয়েছে অথচ আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর কেনো অস্বীকৃতি জানাচ্ছে এমন প্রশ্ন রেখে শান্তনু দত্ত বলেন, আমার মনে হচ্ছে এটি আমাদেরকে ব্যর্থ প্রমাণ করে আবার তারাপুর চা বাগান দখল করার একটি ষড়যন্ত্রের অংশ।

সুপ্রীম কোর্টের রায়ে বাগানের ভেতর থেকে রাগীব আলীর স্থাপনা সরানো ও ক্ষতিপুরণ আদায়ের নির্দেশনা প্রসঙ্গে শান্তনু দত্ত বলেন, এগুলো তো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। প্রশাসন এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু প্রশাসনের কাছ থেকে আমরা কোনো সহায়তা পাচ্ছি না।

এ প্রসঙ্গে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম. কাজী এমদাদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এরপর বলেন, আদালত ব্যবস্থাপ কমিটি করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আমি তা করে দিয়েছি। এখন বাগান পরিচালনার বিষয়টি ব্যবস্থাপনা কমিটি দেখবেন।

রাগীব আলীর স্থাপনা অপসারণ ও ক্ষতিপুরণ আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ব্যবস্থাপনা কমিটি উদ্যোগ নেবেন। তারা আমাদের সহযোগিতা চাইলে সহযোগিতা করবো।

সিলেট নগরের পাঠানটুলা এলাকার প্রায় ৪২৩ একরের তারাপুর চা বাগান দেবোত্তোর সম্পত্তি। প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার এই সম্পত্তি ১৯৯০ সালে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে দখল করে নেন শিল্পপতি রাগীব আলী। এরপর ১৯৯৫ সালে বাগানের ৮.২২ একর জায়গার চা গাছ ধ্বংস করে নির্মাণ করেন প্রায় এক হাজার শয্যার জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। মেডিকেল কলেজের পাশে আরও অনেক জায়গাজুড়ে নিজের স্ত্রীর নামে রাবেয়া খাতুন নার্সিং কলেজ, মেডিকেলে কলেজের ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাসসহ বেশিকিছু স্থাপনা গড়ে তুলেন রাগীব আলী। এছাড়া বাগান ধ্বংস করে গড়ে ওঠেছে আরও অসংখ্য স্থাপনা।

জেলা প্রশাসনের হিসেবে জানা গেছে, চা বাগানের ভেতরে অবৈধভাবে মোট ৩৩৭টি স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এরবেশিরভাগই বহুতল আবাসিক স্থাপনা।

তারাপুর চা বাগানের মালিক বৈকুন্ঠ চন্দ্র গুপ্ত ১৯১৫ সালের ২ জুলাই তারাপুর চা বাগানসহ তার সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ জিউড় দেবতার নামে রেজিস্ট্রি দানপত্র করে দলিল করে দেন।

 বৈকুণ্ঠ গুপ্তের ছেলে রাজেন্দ্র গুপ্ত ও তার তিন ছেলে শহীদ হন। তার তিন মেয়ে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে পাক সেনারা। ১৯৮২ সালে রাজেন্দ্র গুপ্তের ছেলে পঙ্কজ গুপ্ত ভারতে চলে যান। এসময় পাশ্ববর্তী মালনীছড়া চা বাগানের সত্ত্বাধিকারী রাগীব আলীকে তারাপুর চা বাগান দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে যান। এরপর পাওয়ার অব এটর্নি মূলে দেবোত্তোর সম্পত্তিটির সেবায়েত বনে যান দেওয়ান মেস্তাক মজিদ। যিনি রাগীব আলীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তিনি রাগীব আলীকে ৯৯ বছরের জন্য বাগনটি লিজ প্রদান করেন। ১৯৯০ সালে বাগানটির দখল নেন শিল্পপতি রাগীব আলী।

২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিচারপতির সুশেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বে হাই কোর্টের আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ দেবোত্তোর সম্পত্তি তারাপুর চা-বাগান রাগীব আলীর দখল করাকে প্রতারণামূলক আখ্যা দিয়ে পুরো বাগান সেবায়েত পঙ্কজগুপ্তকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বাগান দখল করে গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ছয় মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এই নিদের্শনার পর ওই বছরের ১৫ মে জেলা প্রশাসন রাগীব আলীর দখল থেকে চা বাগানের ভ’মি উদ্ধার করে সেবায়েত পঙ্কজ গুপ্তকে বুঝিয়ে দেয়। বাগানের ৪২২.৯৬ একর ভূমির মধ্যে ৩২৩ একর ভূমি সেদিন সেবায়েতকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তবে বাগানের ভেতরে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নার্সিং কলেজসহ রাগীব আলীর নির্মিত সকল স্থাপনা বহাল থাকে। মেডিকেল কলেজসহ স্থাপনাগুলো না সরাতে উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন রাগীব আলী। তবে এই আবেদনও খারিজ হয়ে যায়।

তবে রিভিউ রায়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসাইনের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের আপীল বেঞ্চ পংকজ গুপ্তের সেবায়েত দাবিও খারিজ করে দেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত