সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

২২ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৩০

সুনামগঞ্জে সড়কের পাশের সাড়ে চার হাজার গাছ কেটে ফেলছে বনবিভাগ

সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলাকায় সাড়ে চার হাজার গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অধীনে থাকা এই সড়কে গাছ কাটছে বন বিভাগ।

তবে সওজ বলছে, সড়কটি প্রশস্ত করার কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। গাছ কাটার কারণও তাদের জানা নেই। বন বিভাগ থেকে শুধু গাছ কাটার দরপত্রের একটি কপি তাদের দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গাছ কাটার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শনিবার সুনামগঞ্জ জেলা হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের উদ্যোগে সড়কের ইচ্ছারচর এলাকায় মানববন্ধন করা হয়। সেখানে বক্তারা অবিলম্বে গাছ কাটা বন্ধ করার দাবি জানান। অন্যথায় বন অফিস ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদেশি প্রজাতির গাছ কাটার কথা বলা হলেও সড়কের পাশে থাকা দেশীয় ফলদ ও ছায়াবৃক্ষও কেটে ফেলা হচ্ছে।

ইচ্ছারচর গ্রামের বাসিন্দা মানিক মিয়া তার বাড়ির সামনে কেটে ফেলা একটি জামগাছ দেখিয়ে বলেন, ‘জায়গাটুকু সরকারি, কিন্তু জামগাছটি আমি লাগিয়েছি। এলাকার শিক্ষার্থী ও পথচারীরা এই গাছের ছায়া পেতেন। জাম পাকার মৌসুমে সবাই গাছ থেকে জাম নিয়ে খেতেন। গাছটি কাটার সময় আশপাশের সবাই মিলে বাধা দিয়েছি। তবু তারা দুটি গাছ কেটে ফেলেছে।’

একই গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই সড়কের পাশের শত শত গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। আকাশমণি, রেইনট্রিসহ বিদেশি গাছ কাটার দরপত্র হয়েছে বলে শুনেছেন তিনি। কিন্তু দেশীয় গাছও কাটা হচ্ছে। বাধা দিলেও গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা তা মানছেন না।

হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলেন, সড়কের পাশে থাকা ছায়াবৃক্ষের মূল্য শুধু টাকার অঙ্কে নির্ধারণ করা যায় না। পথচারী ও স্থানীয় মানুষের জন্য এসব গাছ গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দাবি, ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় ৪ হাজার ৪৬৮টি গাছ বিক্রি করা হয়েছে। অথচ এসব গাছের কাঠের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে। এভাবে সরকারও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

সংগঠনের সভাপতি রাজু আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাছ কাটা বন্ধ না হলে বন অফিস ঘেরাও করা হবে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, ২০০৪ সালে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের দুই পাশে প্রায় ২০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছিল। স্থানীয় উপকারভোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব গাছের পরিচর্যা করে আসছেন।

এর আগে ২০২৪ সালে বন বিভাগ ওই সড়কের প্রায় ৩ হাজার গাছ কাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল। স্থানীয় লোকজনের প্রতিবাদের মুখে তখন গাছগুলো কাটা হয়নি।

হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমেদ বলেন, ২০২৫ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) করা একটি রিটের পর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সামাজিক বনায়ন বিধিমালা, ২০০৪-এর আওতায় রোপণ করা গাছ না কেটে গাছের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে নির্বাচিত উপকারভোগীদের অর্থ দেওয়ার বিধান যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই রায়ে সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের কমিটির অনুমোদনের বিষয়টিও এসেছিল বলে তিনি জানান।

সুনামগঞ্জ জেলা বন কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন শনিবার বলেন, গাছ কাটার অনুমোদন জেলা কমিটিতে হয়েছিল।

তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান বলেন, বর্তমান জেলা প্রশাসকের দায়িত্বকালে, অর্থাৎ গত তিন-চার মাসে এ ধরনের কোনো অনুমোদন হয়নি। এর আগে অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও ফাইল দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়ক প্রশস্ত করার কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। গাছ কাটার বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিছু জানা নেই। বন বিভাগ থেকে গাছ কাটার একটি দরপত্রের কপি শুধু তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

বন বিভাগের বক্তব্য
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, সড়কের পাশে সামাজিক বনায়নের আওতায় প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ রয়েছে। সামাজিক বনায়নের নিয়ম অনুযায়ী, বাগানের বয়স ১০ বছর পূর্ণ হলে গাছ কাটার পর সদস্যদের মধ্যে লভ্যাংশ বিতরণ এবং পরে সেখানে নতুন করে বনায়ন করার বিধান রয়েছে।

তিনি বলেন, সামাজিক বনায়নের সদস্যদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

সড়কের পাশে আকাশমণিসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন সংরক্ষণ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী এসব গাছের পরিবর্তে নতুন করে দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তবে সড়কের পাশে থাকা দেশীয় প্রজাতির গাছও কাটা হচ্ছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, দেশীয় প্রজাতির গাছ কাটা হবে না।

সামাজিক বনায়নের গাছ না কেটে উপকারভোগীদের সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে- আদালতের এমন নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তবে এখনো এ বিষয়ে সরকারের কোনো গেজেট বা চূড়ান্ত নির্দেশনা বন বিভাগ পায়নি। সরকার এ ধরনের নির্দেশনা দিলে বন বিভাগ তা অনুসরণ করবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত