সাজু মারছিয়াং, শ্রীমঙ্গল

১০ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৩৬

সিলেটের নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থা: সড়কে ভোগান্তির অন্ত নেই, ট্রেনের টিকিট যেন ‘সোনার হরিণ’

সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক। ৬ লেনে উন্নীতর কাজ চলায় এই সড়ক প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই লেগে থাকে দীর্ঘ যানজট। ধীরগতির উন্নয়নকাজ, ভাঙাচোরা রাস্তার দুর্ভোগ তো আছেই।

এ অবস্থায় ট্রেনেও স্বস্থি নেই। সিলেটে ট্রেনের টিকিট যেন সোনার হরিণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট ছাড়ার পরপরই তা উধাও হয়ে যায়। সাধারণ যাত্রীরা টিকিটের নাগাল পান না। অথচ পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বেশি দামে টিকিট বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

শুধু টিকিট নয়, সিলেটের রেল যোগাযোগের সামগ্রিক চিত্রও হতাশাজনক। নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা এসেছে, কিন্তু ট্রেন চালু হয়নি। ডাবল লাইন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটিও থমকে আছে।‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ চালুর নির্দিষ্ট তারিখ সংসদে ঘোষণা করা হলেও ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে, ট্রেনের দেখা মেলেনি।

সবমিলিয় সিলেটে যাতায়াত এখন দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে ওঠে। রেল ও সড়ক—দুই পথেই সিলেটবাসীর যাতায়াত যেন ভোগান্তির বৃত্তে আটকে আছে।

টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটেই শেষ

সিলেট থেকে ঢাকায় উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এবং চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস চলাচল করে। এসব ট্রেনের টিকিট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

বিষয়টি নজরে আসে সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমানের। আদালত ট্রেনের টিকিট বিক্রির সরকারি ওয়েবসাইট পরিদর্শন করে দেখতে পান, নির্দিষ্ট দিনের টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক টিকিট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এত অল্প সময়ে সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়াকে সন্দেহজনক মনে হয় আদালতের।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে স্বপ্রণোদিত হয়ে মিস মামলা নং-০১/২০২৬ দায়ের করেন আবদুল্লাহ আল নোমান। এজাহারে কালোবাজারি ও মজুদদারির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।

মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পিবিআই সিলেটকে। ৭ অক্টোবর মামলার নথিপত্র পিবিআইয়ের কাছে পৌঁছেছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআই সিলেটের উপপরিদর্শক আবদুল আহাদ। তিনি জানিয়েছেন, আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে দায়ের করা মামলাটিই তিনি তদন্ত করছেন।

মামলার নথিতে বলা হয়েছে, একটি চক্র ট্রেনের টিকিট বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কারও কারও সহযোগিতায় মুহূর্তের মধ্যে টিকিট সরিয়ে নিয়ে পরে তা অধিক মূল্যে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে থাকতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণ যাত্রীদের হয়রানির পাশাপাশি সিলেটের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অনলাইন টিকিটেও ‘ব্লকের’ অভিযোগ

ট্রেনের টিকিট নিয়ে অভিযোগের আরেকটি দিক উঠে এসেছে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিট সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই তা অবৈধভাবে ব্লক করে রাখার ঘটনা ঘটেছে।

অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ‘সহজ ডট কম (Shohoz.com)-এর কর্মীদের হাতে সিস্টেমের মূল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাঁদের কাজ হওয়ার কথা ছিল কেবল কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক ও আসন সংরক্ষণের মতো কাজ নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।

সাধারণ যাত্রীদের সুবিধার জন্য চালু করা ই-টিকিটিং ব্যবস্থাই যদি নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে টিকিট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করে, তাহলে ডিজিটাল ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে অনলাইন ব্যবস্থাও টিকিট কালোবাজারির আধুনিক রূপ ধারণ করতে পারে।

সিলেট রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম গণমাধ্যম কর্মীদের অবশ্য বলেছেন, রেলের টিকিট অনলাইনে কিনতে হয়। কেউ কেউ সরাসরি কাউন্টার থেকেও কেনেন। টিকিট বিক্রিতে স্টেশন কর্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই।

ঘোষণার পরও নেই ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’

সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস। সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল, নতুন এই ট্রেন ঢাকার সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করবে।

সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া' নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে। মে ও জুন মাসে এ নিয়ে আলোচনা হয়।

কিন্তু নির্ধারিত ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে। ট্রেন চালুর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকেও এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০২৩ সালে অনুমোদন পাওয়া এই ট্রেনকে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আধুনিক, ননস্টপ ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ট্রেনটি চালু হয়নি।

আন্তনগর ট্রেনেও স্বস্তি নেই!
নতুন ট্রেন না পাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান আন্তনগর ট্রেনের সেবা নিয়েও সিলেটবাসীর অভিযোগ রয়েছে। সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেনগুলোতে পথে বিভিন্ন স্টেশনে ব্যাপক যাত্রী ওঠানামার কারণে অনেক সময় ট্রেনের ভেতরে চলাচলের জায়গা থাকে না।আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠায় সিলেট থেকে যাত্রা করা অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।

যাত্রীদের বক্তব্য, আন্তনগর ট্রেনের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো দ্রুত ও তুলনামূলক আরামদায়ক যাত্রা। কিন্তু পথে অতিরিক্ত স্টপেজ ও যাত্রী ওঠানামার কারণে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে।

পর্যটনের সম্ভাবনা, যোগাযোগে পিছিয়ে

সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে এখানে।

শ্রীমঙ্গলের রাধানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। লেবু, আনারস, কাঁঠাল ও চা-বাগানের বিস্তৃত চাষাবাদকে ঘিরেও গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শত শত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। এত সম্ভাবনার পরও শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের পর্যটন কেন্দ্র গুলোকে ঘিরে আধুনিক রেলসেবা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখান কিংবা শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান,বাইক্কার বিল, কমলগঞ্জের হামহাম জলপ্রপাত, মাধবপুর লেক প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রই দেশের পর্যটন খাতকে আরও বড় করার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু আধুনিক ও দ্রুত রেল যোগাযোগের অভাব সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর পথে বড় সীমাবদ্ধতা।

সড়কেও দুর্ভোগ!
রেলের দুরবস্থার পাশাপাশি সড়কপথেও সিলেটবাসীর স্বস্তি নেই। ঢাকা বা দেশের অন্য অঞ্চল থেকে সড়কপথে সিলেটে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লাগে। বিভিন্ন সড়কে উন্নয়নকাজ ধীরগতিতে চলার পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা, গর্ত ও অমসৃণ সড়কের কারণে বাস, কার ও জিপসহ বিভিন্ন যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।

এর সঙ্গে রয়েছে তীব্র যানজট। দীর্ঘ পথের যানজট, সড়কের দুরবস্থা ও নির্মাণকাজ মিলিয়ে অনেক সময় গন্তব্যে পৌঁছানোই যাত্রীদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়।
ফলে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য রেল যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা সিলেটবাসীর কাছে কেবল আরামের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে সময়, অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে রেল:

সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসী ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিপুল প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পর্যটন—সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।

একটি কার্যকর রেলপথ শুধু যাত্রী পরিবহন করে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, কর্মসংস্থান, পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির গতি। ময়মনসিংহের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে দুই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়তে পারে। ডাবল লাইন হলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেল চলাচলের সক্ষমতা বাড়বে। নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু হলে সড়কপথের ওপর চাপও কমতে পারে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত