০১ নভেম্বর, ২০২৬ ১১:৪৮
জলমহাল, বালুমহাল, পাথরমহাল। এই মহাল-মহিমায় সুনামগঞ্জে গড়ে উঠেছে বড় ‘অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড’। এর অন্যতম যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহাল। বছরজুড়ে নৌপথে পরিবহন সুবিধা থাকায় বালুমহাল দুটির ইজারা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তবে এবারের ইজারাপ্রক্রিয়া ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। আগের মেয়াদে ইজারায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি আদালতে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তার পরও সেই দাবির ভিত্তিতে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ বালুমহাল দুটি থেকে বালু উত্তোলনের একক অনুমতি পেয়েছেন সাবেক ইজারাদার মো. নাছির মিয়া। তাকে ‘লুজার’ বা ক্ষতিগ্রস্ত বিবেচনায় এই অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্য দরপত্রের উদ্যোগ স্থগিত রেখে এককভাবে নাছিরকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিনি তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারদলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ঘনিষ্ঠজন। আরেকটি অভিযোগ হলো, সরকারি রাজস্বের ফিফটি ফাইভ পার্সেন্ট (৫৫ শতাংশ) অর্থ ভাগ-বাটোয়ারার পর (অজ্ঞাত স্থানে বিলি-বণ্টন) এই অনুমতি নিশ্চিত করা হয়েছে। ভাগ-বাটোয়ারার এ বিষয়টি ‘ফিফটি ফাইভ’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। তবে সংসদ সদস্য ও ইজারাদার এক সুরে এসব খবরকে ভিত্তিহীন অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন।
এর আগে সাত মাসের রাজস্ব আদায়ে সরকারের সম্ভাব্য ৭৯ কোটি টাকা বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি রয়েছে বেপরোয়া বালু-পাথর উত্তোলন, নদীভাঙন ও পরিবেশগত ক্ষতির প্রশ্ন। এসবের সুরাহা না করেই বিশেষ বিবেচনায় বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ায় যাদুকাটার প্রাকৃতিক সম্পদ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা যাদুকাটা নদীর উৎসমুখের অববাহিকায় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় বালুমহাল দুটি অবস্থিত। বালুমহাল যাদুকাটা-১-এর আয়তন ৮৯ একর ৫৬ শতক এবং যাদুকাটা-২ বালুমহালের আয়তন ২২ একর ৫৪ শতক। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২২ সেপ্টেম্বরের আদেশে চলতি বাংলা ১৪৩৩ সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি পান নাছির মিয়া। এ জন্য সরকারি রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪২২ টাকা।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাংলা ১৪৩২ সনের জন্য যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল মোট ১০৮ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমদ এবং তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের স্বত্বাধিকারী নাছির মিয়া পৃথকভাবে মহাল দুটি ইজারা নেন। মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় ইজারা পাওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর তারা মহাল দুটির দখল বুঝে পান।
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দুই ইজারাদার নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে আরও পাঁচ মাস বালু উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত প্রথমে তাদের পক্ষে আদেশ দিলেও জেলা প্রশাসনের আপিলের পর ১৩ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষে রিটকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি গ্রহণ করেননি। এরপর জেলা প্রশাসন বালু উত্তোলন বন্ধের বিজ্ঞপ্তি জারি করে। একই সঙ্গে অবশিষ্ট সময়ের জন্য মহাল দুটি থেকে খাস আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান করা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়।
এর মধ্যে দুই সাবেক ইজারাদারই নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। ২২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় শুধু নাছির মিয়াকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়। অর্থাৎ আগের ইজারায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি আদালতে গ্রহণযোগ্য না হলেও পরে তাকে ‘লুজার’ বা ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে বিবেচনা করে মন্ত্রণালয়।
অভিযোগ উঠেছে, আদালতের আদেশের তথ্য গোপন করে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। মামলাসংক্রান্ত জটিলতার মধ্যেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বালু উত্তোলনের পথ তৈরি করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না।
মহাল ইজারা ও ব্যবসাসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ থেকে প্রতিদিন গড়ে এক লাখ ঘনফুট বালুমিশ্রিত পাথর এবং দুই থেকে আড়াই লাখ ঘনফুট বালু আহরণ করা হয়। প্রতি ঘনফুট বালুর বাজারদর ৭০ থেকে ১২০ টাকা এবং সরকারি রয়্যালটি ২০ টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিসাবের ভিত্তিতে পাঁচ মাসে শুধু বালু বিক্রি থেকেই বিপুল অর্থের বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে বালুমিশ্রিত পাথর আহরণ। শুষ্ক মৌসুমেও নৌপথে পরিবহন সুবিধা থাকায় সংশ্লিষ্টদের হিসাবে ৫ মাসে বালুমহাল দুটিতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, ১৪৩৩ সনে বালু উত্তোলন ও রাজস্বের হিসাব ঘিরে সরকারের ৭৯ কোটি টাকা রাজস্ববঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখার একটি সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে সাবেক দুই ইজারাদার শাহ রুবেল ও নাছির মিয়ার ইজারাসংক্রান্ত নথিপত্র সরকারের আর্থিক খাত তদন্তকারী দুটি সংস্থা তলব করেছে।
সূত্রটির দাবি, শাহ রুবেলের নথি ফেরত দেওয়া হলেও নাছির মিয়ার নথি যাচাই করা হচ্ছে। এ ঘটনায় ইজারাদার-ঘনিষ্ঠ আরও কয়েকজন বালুব্যবসায়ীর নাম এসেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় অর্থের প্রকৃত পরিমাণ, হিসাবের ভিত্তি ও রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগের বিস্তারিত জানা যায়নি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশে গত তিন বছরের গড় বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ১২ শতাংশ ধরে বালুমহাল দুটির অবশিষ্ট মেয়াদের রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪২২ টাকা। এর মধ্যে যাদুকাটা-১-এর জন্য ১৫ কোটি ৮৩ লাখ ১৪ হাজার ৬৯ টাকা এবং যাদুকাটা-২-এর জন্য ২৬ কোটি ৮৩ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ টাকা। যাদুকাটা-২ আয়তনে চারভাগের এক ভাগ হওয়া সত্ত্বেও এর অবস্থান সীমান্ত এলাকায় হওয়ায় ‘নানাবিধ সুবিধার’ কারণে এর ইজারা মূল্য বেশি ধরা হয়েছে। কিন্তু এই রাজস্ব নির্ধারণের ভিত্তি কী ছিল? প্রকাশ্য দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলকভাবে আরও বেশি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ ছিল কি না, তা কি যাচাই করা হয়েছিল? জেলা প্রশাসন প্রথমে খাস আদায়ের উদ্যোগ নিলেও পরে সেই প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে একজনকে এককভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ায় এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বালুমহাল ইজারাসংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ম অনুযায়ী বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রকাশ্য দরপত্রে ইজারা দেওয়া অথবা খাস আদায়ের ব্যবস্থা করার কথা। বিশেষ পরিস্থিতিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে, কী শর্তে আদেশটি দেওয়া হয়েছে এবং তা প্রচলিত ইজারাপদ্ধতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ–এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
নাছির মিয়াকে এককভাবে অনুমতি দেওয়ার পর সাবেক ইজারাদার শাহ রুবেল আহমদ ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত মন্ত্রণালয়ের আদেশ তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা হলে রিট আবেদন প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর ১৫ অক্টোবর মহালের আরেক সাবেক ইজারাদার ‘ড্যাগ রতন’ (আগে হাড়ি-পাতিলের ব্যবসা ছিল) নামে পরিচিত রতন মিয়া একই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই মামলায় দেওয়া স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে নাছির মিয়া আপিল করেন। পরে স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা ১৫ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়। এরপর ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসন নাছির মিয়াকে মহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেয়।
দখল হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তাপস শীল। তিনি বলেন, ‘আমরা এই দুটো বালুমহাল-সংক্রান্ত প্রতিটি বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের লিখিত নির্দেশনা চেয়েছি। সর্বশেষ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতেই নাছির মিয়াকে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয় আমাদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। আমরা যা করেছি, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতেই করেছি।’
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণের কথা প্রশাসন জানালেও প্রকাশ্য দরপত্রের উদ্যোগ স্থগিত হওয়ার কারণ, রাজস্ব নির্ধারণের পদ্ধতি এবং বিশেষ অনুমতির আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে আগের সাত মাসের রাজস্ব আদায়ের হিসাবও স্পষ্ট নয়। এ কারণে রাজস্ববঞ্চিত হওয়ার অভিযোগের নিষ্পত্তি ও সংশ্লিষ্ট নথির যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, যাদুকাটা-১ বালুমহাল চালিয়াঘাট মৌজার ১০০২ ও ১০০৩ দাগে এবং যাদুকাটা-২ পুরান লাউড় ও চালিয়াঘাট মৌজা খাস দাগভুক্ত। এর পাশাপাশি ফাজিলপুর বালুমিশ্রিত পাথরমহালসহ নির্দিষ্ট এলাকাবহির্ভূত (বালু উত্তোলনের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত) নদীর ভেতরে চালিয়াঘাট, লামাশ্রম ও পুরান লাউড় এলাকায় বালু-পাথর উত্তোলনের কার্যক্রম বিস্তৃত।
২২ অক্টোবর ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীর সীমানা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না থাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বালু ও পাথর আহরণ চলছে। স্থানীয় শ্রমিকদের অভিযোগ, বালুমহাল ইজারা নেওয়ার পর একই এলাকা থেকে বালুমিশ্রিত পাথরও উত্তোলন করা হচ্ছে, যার মূল্য শত শত কোটি টাকা। এ বিষয়ে জানা থাকা সত্বেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের ‘নীরবতায়’ ইজারাদাররা বালুর পাশাপাশি পাথরও সমানতালে উত্তোলন করছেন। শ্রমিকদের ভাষায়, বালুমহাল পেলেই পাথরমহাল ফ্রি–এটি কার্যত ওপেন সিক্রেট।
সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখার একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত যাদুকাটা এলাকা থেকে বালু ও বালুমিশ্রিত পাথর আহরণে সরকার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একাধিক প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এ হিসাবের ভিত্তি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সিলেট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বালুবাহী বারকি নৌকার কর্মক্ষেত্র যাদুকাটা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিন থেকে পাঁচ হাজার বারকি নৌকায় বালু আহরণের কাজে অন্তত ১০ থেকে ১৫ হাজার শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন।
জেলা বারকি শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদ মিয়া বলেন, ‘আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা প্রশাসনের কাছে বারবার লিখিত আবেদন করেছি যে, ইজারাপদ্ধতি বাতিল করে সরকারিভাবে ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র চালু করলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাণ-প্রকৃতিও রক্ষা পাবে। কিন্তু সাধারণ বারকি শ্রমিকের সেই আবেদন কেউ শোনেনি।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর ভেতরে সুনির্দিষ্ট সীমানা না থাকায় একই জায়গা থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু ও পাথর আহরণ করা হচ্ছে। এতে সরকারি সম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
নতুন করে দখল বুঝে নেওয়ার পরও ২২ অক্টোবর বালুমহাল এলাকায় উত্তোলিত বালুর সরকারি রয়্যালটি পরিমাণের তালিকা দৃশ্যমান স্থানে দেখা যায়নি। ফলে কোন ধরনের বালুর জন্য কত রাজস্ব আদায় হবে, তা প্রকাশ্যে জানার সুযোগ নেই। উত্তোলনের পরিমাণ, রয়্যালটি আদায়, নির্ধারিত সীমানার মধ্যে খনন এবং পরিবেশগত শর্ত প্রতিপালন কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দখল বুঝে নেওয়ার পর ২০ অক্টোবর একাধিক অংশীদারকে সঙ্গে নিয়ে স্পিডবোটে মহাল এলাকা পরিদর্শন করেন নাছির মিয়া। আগের ইজারার সময় ৭৯ কোটি টাকার রাজস্ববঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি অবহিত নন। তার ভাষ্য, ‘আমি আগে থেকেই লুজার! কর্তৃপক্ষ যথাযথ বিবেচনা করায় নতুন করে ইজারা পাইছি। এই ইজারায় কোনো ত্রুটি নেই।’
সরকারি রাজস্বের ফিফটি ফাইভ পার্সেন্ট (৫৫ শতাংশ) ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগ সরকার আমলের সাবেক ইজারাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সিলেট, ঢাকা ও সুনামগঞ্জে অনুষ্ঠিত তিনটি বৈঠকের সিসিটিভি ফুটেজ ও কথোপকথনের রেকর্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্রের মাধ্যমে এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এসব রেকর্ডে যাদুকাটার সাবেক একজন ইজারাদার, দুজন কয়লা ব্যবসায়ী এবং ঢাকাকেন্দ্রিক বালু সরবরাহকারীসহ চার ব্যবসায়ীর কথোপকথন রয়েছে।
রেকর্ড করা কথোপকথনে সরকারি ধার্য করা ৪২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ৫৫ শতাংশ অর্থ ভাগ-বাটোয়ারার আলোচনা শোনা যায়। এই হিসাবে অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। কথোপকথনে এক হাতেই ১৬ কোটি টাকা পৌঁছে দেওয়ার প্রসঙ্গও এসেছে। এ বিষয়ে রেকর্ডে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক বালুব্যবসায়ীর কণ্ঠ বলে শনাক্ত করা হয়েছে। কথোপকথনের একপর্যায়ে ‘ফিফটি ফাইভ পার্সেন্ট, ফিফটি ফিফটি’ কথাগুলো অনেকটা বচসার সুরে বলতে শোনা যায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র বলছে, কথোপকথনে উল্লিখিত অর্থের প্রকৃত উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অর্থ লেনদেনের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। শুধু কথোপকথনের ভিত্তিতে অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা যাচাই করা নিশ্চিত করতে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে যাদুকাটার সদ্য সাবেক ইজারাদার শাহ রুবেল আহমদ জানান, তিনি পবিত্র ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে আছেন। এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না, এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতেও রাজি নন।
বর্তমান অনুমতিপ্রাপ্ত ইজারাদার নাছির মিয়া বলেন, ‘এসব এখন না, আগের টার্মে (আওয়ামী লীগ আমলে) হতে পারে। এখন তো এমপি সাব অনেক কষ্টে মহালটা নিয়মের মধ্যে আনছেন।’
যাদুকাটা নদীর সংকট শুধু ইজারা বা রাজস্ব আদায়ের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। নদীর পাড় কাটা এবং বালু-পাথর উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের নথিতে ২০১১ সাল থেকেই নদীর পাড় কাটার বিষয়টি উঠে এসেছে। শুরুতে রাতের আঁধারে পাড় কাটার অভিযোগ থাকলেও ২০২১ সালে বালুমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়ার পর দিন-রাত বালু উত্তোলন শুরু হয়। ইজারায় সনাতন পদ্ধতিতে বালু আহরণের নির্দেশনা থাকলেও ড্রেজার ব্যবহারে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সরকারি নথি অনুযায়ী, নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এবং ঐতিহাসিকভাবে গড় প্রস্থ ৫৭ মিটার। স্থানীয়দের ভাষ্য, পাড় কাটার কারণে কোনো কোনো অংশে নদীর বিস্তৃতি কয়েক কিলোমিটারে পৌঁছেছে। তাদের আশঙ্কা, গত দেড় দশকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীরবর্তী জনপদে তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণে নদীর বর্তমান অবস্থা, ঐতিহাসিক মানচিত্র ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি সমীক্ষা প্রয়োজন।
‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন’-এর সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক মিলন বলেন, ‘যাদুকাটার বালুমহাল অংশ আর নদী নেই, প্রতিনিয়ত নদীর পাড় খননের কারণে সেটি এখন দরিয়া আকার ধারণ করেছে। বালু-পাথর উত্তোলন নদী ও নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের জন্য সুদূরপ্রসারী সংকট তৈরি করছে। নদীভাঙনে গ্রাম, নির্মাণাধীন সেতু এবং শিমুলবাগান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই দফা বালু আহরণ শেষ হওয়ার আগেই বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত জলবন্দর বাস্তবায়নের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া দরকার।’
ওবায়দুল হকের মতে, শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনায় নিয়ে বালুমহাল চালু করা হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ এতে উদ্বিগ্ন। বালু আহরণ একসময় বন্ধ হলে শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার কী হবে, সে প্রশ্নও রয়েছে। তার মতে, বর্তমান কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প জীবিকার পরিকল্পনা জরুরি।
যাদুকাটা নদী সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনি এলাকায় অবস্থিত। এ এলাকার তিনবারের সাবেক বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য প্রয়াত নজির হোসেন নব্বইয়ের দশকে বড়ছড়া-চারাগাঁও শুল্কস্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে কয়লা আমদানি বাণিজ্যে নতুন দিক উন্মোচন করেন। জলমহাল, পাথরমহাল ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনার বিকল্প হিসেবে তিনি যাদুকাটায় জলবন্দর স্থাপনের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে রয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যাদুকাটার আগে ফাজিলপুর ছিল বালু ও খনিজসম্পদ আহরণের অন্যতম স্থান। সেটি এখন পরিত্যক্ত। যাদুকাটায় বালু আহরণ কমে গেলে বা বালুমহালের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে এলে শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রশ্ন সামনে আসবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘বিকল্প চিন্তা হিসেবে জলবন্দর স্থাপনের প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়া যায় কি না, তা দেখা হবে। এর আগে গোটা এলাকাকে পর্যটনের আওতায় এনে শিমুলবাগান, বারকিটিলা (বারেক্কাটিলা) এবং হজরত শাহ আরেফিনের ওরস ও বারুণিমেলার স্থানকে বিশেষায়িত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
‘লুজার’ ছকে যাদুকাটা ‘উজাড়’ হওয়া নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন সংসদ সদস্য। তার ভাষ্য, বালু আহরণ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের বিষয় হলেও পরিবেশের ক্ষতির হিসাবের চেয়ে স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এলাকায় শ্রমিকদের স্থায়ী কর্মসংস্থানের মতো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা কলকারখানা নেই। তার দাবি, দেশের অন্যতম বড় এই বালুমহাল বন্ধ থাকার সময় পুরো এলাকা কর্মহীন হয়ে পড়েছিল এবং দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
‘ফিফটি ফাইভ’ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য বলেন, ‘এসব ভিত্তিহীন। ২০১১ সাল থেকে এখানে লুটপাট চলছিল। এখন সবকিছু নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করছি। এ কারণে বিগত দিনে লুটপাটকারীদের মধ্য থেকে নানা অপপ্রচার হচ্ছে।’
তবে প্রকাশ্য দরপত্রের উদ্যোগ কেন স্থগিত করা হলো, একক অনুমতির আইনগত ভিত্তি কী এবং রাজস্বের ‘ফিফটি ফাইভ’সহ বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্নের সুস্পষ্ট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বালুমহালের ইজারা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের স্বচ্ছতা, নদীর সুরক্ষা এবং বারকি শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে।
সূত্র: খবরের কাগজ।
আপনার মন্তব্য