১৬ অক্টোবর, ২০১৮ ১৭:৫১
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজায় গেজেট ও শ্রম আইন না মেনে উৎসব বোনাস প্রদানে অনিয়ম ও বৈষম্যের অভিযোগ ওঠেছে।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে চা-বাগানের শ্রমিকরা উৎসব বোনাস পেয়ে থাকেন। গেজেটে ও শ্রম আইনে সকল শ্রমিকরা সমান হারে উৎসব বোনাস পাওয়ার কথা থাকলেও এই বোনাস প্রদান নিয়ে বৈষম্যের শিকার চা শ্রমিকরা। বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকদের ভিন্ন ভিন্ন হারে বোনাস প্রদান করার কারণে অনেকেই অন্যান্যদের মতো দুর্গাপূজার আনন্দ উৎসব পালন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা যায়, ৮৫ টাকা থেকে দীর্ঘ দিন পর সম্প্রতি চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করে দৈনিক ১০২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মজুরি চুক্তি অনুযায়ী চা-শ্রমিকদের বার্ষিক বোনাস ৪৫৯০ টাকা। যার মধ্যে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজায় বকেয়াসহ ৩৫০০ টাকা উৎসব বোনাস প্রদান করার কথা থাকলেও সকল শ্রমিককে সমান হারে উৎসব বোনাস প্রদান করা হচ্ছে না।
চা-বাগান শ্রমিকরা জানান, দৈনিক মাত্র ১০২ টাকা মজুরিতে বর্তমান বাজারদরে যেখানে দুইবেলা ডাল-ভাত জুটানো দায়, সেখানে আনন্দ উৎসব করা তো দূরের কথা। তার উপর চা-বাগান কর্তৃপক্ষ দুর্গাপূজা উপলক্ষে উৎসব বোনাস প্রদানেও অনিয়ম করছেন বলে চা-শ্রমিকরা অভিযোগ করেন।
দুর্গাপূজায় উৎসব বোনাস হিসেবে রাজনগর চা-বাগানের নারায়ন গোড়াইত ৭শত টাকা, সুনছড়া চা-বাগানের হরিনারায়ন হাজরা ২ হাজার ৬শত ১৬ টাকা, শ্রীরাম ভূঁইয়া ১ হাজার ৪শত টাকা, শিবু উরাং ২ হাজার ৬শত টাকা, চাতলাপুর চা-বাগানের অঞ্জলি ভৌমিক ৭শত টাকা পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
জানতে চাইলে চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহবায়ক চা-শ্রমিক নেতা রাজদেও কৈরী বলেন, যে কোন সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সকল স্থায়ী শ্রমিক উৎসব বোনাস পেয়ে থাকেন এবং তা সবার জন্য সমান হয়। চা-সেক্টরে ২০১০ সালের ৩০ মার্চ নিম্নতম মজুরির গেজেট (এসআরও নং ৮৯) এর ৫ (ক) নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে চা শ্রমিকদের প্রতি বছর যেকোন প্রধান দুইটি ধর্মীয় উৎসবে বোনাস পাবেন। বাংলাদেশ শ্রম আইনের শ্রম বিধিমালা-২০১৫ এর ১১১(৫) বিধি অনুযায়ী শ্রমিক কর্মচারীদের উৎসব বোনাস প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উৎসব বোনাস সকল শ্রমিকের সমান হয় এবং এর সাথে কর্মে উপস্থিতি বা উৎপাদনের কোন সম্পর্ক নেই। তবে শ্রমিক কর্মচারীদের কাজে উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য কর্মদিবস এবং উৎপাদনশীলতার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন সেক্টরে বোনাস দেওয়ার রেওয়াজ আছে, যা উৎসাহ বোনাস হিসেবে পরিগণিত। উৎসাহ বোনাস কর্মদক্ষতা ও কাজে উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় তা বিভিন্ন শ্রমিকের ক্ষেত্রে কম-বেশি হয়ে থাকে। চা-বাগান কর্তৃপক্ষ দুর্গাপূজা উপলক্ষে উৎসব বোনাসের পরিবর্তে উৎসাহ বোনাস প্রদান করে চা শ্রমিকদের ঠকাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাস বলেন, চা-বাগান কর্তৃপক্ষ দেশের প্রচলিত শ্রম আইনের কোন তোয়াক্কাই করেন না। চা-শ্রমিক ইউনিয়নও মালিকপক্ষের হয়ে আইন বহির্ভূত চুক্তি সম্পাদন করে মালিকদের স্বার্থরক্ষা করছেন। চা সেক্টরে সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরির কোন সুবিধা বাদ দিয়ে চুক্তি করলে তা শ্রম আইনের পরিপন্থি হয়। তাছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১০৩ (গ) ধারায় সকল শ্রমিককে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের মজুরি প্রদান বাধ্যতামূলক করা হলেও চুক্তিতে বেআইনি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। চা-বাগান কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বাংলাদেশ শ্রম আইন-এর ৫ ধারায় নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র, ৬ ধারায় সার্ভিস বই, ২(১০) ধারায় প্রতি বছর চাকরির জন্য ৪৫ দিনের গ্রাচুইটি, ২৩৪ ধারায় অংশগ্রহণ তহবিল ও কল্যাণ তহবিল স্থাপন, গ্রুপবীমা ইত্যাদি আইনগত অধিকার থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করে চলেছেন।
কমলগঞ্জের এনটিসি কোম্পানির বাগানের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা-বাগান মালিকপক্ষের চুক্তি অনুযায়ী তাদের বোনাস প্রদান করা হচ্ছে। এই রেওয়াজটি দীর্ঘদিনের বলে তিনি দাবি করেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, চা-বাগানে উৎসব বোনাস আছে, তবে উৎসাহ বোনাস নেই। এটা আসলে দীর্ঘদিনের একটি ট্র্যাডিশন। আগে একটা নিয়ম ছিল ১৯০ দিনের নিচে এক টাকাও দেয়া হত না। এখন ১৭৫ দিনের নিচে যারা আছে তারা ২০ শতাংশ হারে পাবে। তবে আমরা সেখান থেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করছি। চা শ্রমিকদের গ্রাচ্যুইটি নিয়ে আমরা লড়াই করবো।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গলস্থ বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, চা শ্রমিকদের বোনাস দুই মাসের মজুরির বেশি হবে না। তবে উৎসব বোনাস সকল শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই সমান। ভিন্ন ভিন্ন হারে শ্রমিকরা বোনাস প্রাপ্তির বিষয়ে কেউ অভিযোগ দিলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
আপনার মন্তব্য