নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ২৩:১৭

কমলগঞ্জের পর্যটন কেন্দ্র সমুহে ঈদে সাজ সাজ রব

ঈদুল আজহার ছুটিতে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অপরুপ লীলাভূমি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ। এ উপজেলায় টিলাঘেরা সবুজ চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ত্রিপুরা সীমান্তর্বর্তী ধলই চা বাগানে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ, ছায়া নিবিড় পরিবেশে অবস্থিত নয়নাভিরাম মাধবপুর লেক, ঝর্নাধারা হামহাম জলপ্রপাত, মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, ডবলছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, শিল্পকলা সমৃদ্ধ মণিপুরীসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবন ধারা ও সংস্কৃতিসহ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই জনপদ যে কোন পর্যটকের মন ও দৃষ্টি কড়ে নেবে। তাইতো পবিত্র ঈদুল আজহাতে এসব আকর্ষনীয় পর্যটন স্পটগুলো পর্যটকদের বরণ করতে প্রস্তুত।

দেশের ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অপার লীলা ভূমি কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাঝে সবচেয়ে দর্শণীয়, নান্দনিক ও আকর্ষণীয়। পশুপাখি, বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস স্থল। এ উদ্যানে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সবুজ বৃক্ষরাজি। বিশ্বের বিলুপ্ত প্রায় জীব উল¬ুকসহ কয়েকটি জন্তু ও বিলুপ্ত প্রায় কয়েকটি মূল্যবান গাছ গাছালির শেষ নিরাপদ আবাসস্থল হল লাউয়াছড়া। এই উদ্যান ভ্রমন পিপাষুদের জন্য এখন একটি আকর্ষনীয় স্থান। ১৯৯৬ সালে ১২৫০ হেক্টর এলাকা নিয়ে লাউয়াছড়াকে ঘোষণা করা হয় জাতীয় উদ্যান হিসেবে।

কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর চা বাগানে নয়নাভিরাম মনোরম দৃশ্য মাধবপুর লেক ভ্রমন পিপাষু মানুষের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। এখানকার পাহাড়ি উঁচু নিচু টিলার মাঝে দৈর্ঘে প্রায় ৩ কিঃমিঃ পানির হ্রদ ও তার শাখা প্রশাখা, চারপাশে পাহাড়ি টিলার উপর সবুজ চা বাগানের সমারোহ, জাতীয় ফুল দুর্লভ বেগুনী শাপলার আধিপত্য, ঝলমল স্বচ্ছ পানি, ছায়া নিবিড় পরিবেশ, শাপলা শালুকের উপস্থিতি আনন্দের বাড়তি মাত্রা যুক্ত করেছে। এক দিনেই মাধবপুর লেকের দৃশ্য উপভোগ করে বেরিয়ে এসে একই রাস্তায় প্রায় ১০ কিঃমিঃ যাওয়ার পরই বীরশ্রেষ্ট শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ ঘুরে আসা যাবে। এখানে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক, দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন এ স্মৃতিসৌধ দেখতে আসছেন। সকালে বের হলে লাউয়াছড়া ভ্রমণ শেষে মাধবপুর লেক ও বীরশ্রেষ্ট হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ ঘুরে আসা যাবে।

এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরুর সময়ে বিট্রিশ আমলে গড়ে উঠেছে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরে বিশালাকার বিমান বন্দর। বর্তমানে এখানে আরটিএস (রিক্রুট ট্রেনিং) স্কুল স্থাপন করায় ভেতরে প্রবেশ করে ভ্রমন করা সবার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। শমশেরনগর বিমান বাহিনী ইউনিট এলাকায় পতিত ভূমিকে কাজে লাগিয়ে কাঁঠাল, আনারস, লিচু, কুল, ধান, আলুসহ নানা জাতের ফল, কৃষি ও মৎস্য খামার গড়ে তোলা হচ্ছে। শমশেরনগর বিমান বাহিনীর সংরক্ষিত এলাকা সংলগ্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধকালীন বধ্যভূমির উপর একটি স্মৃতি সৌধও নির্মিত হয়েছে। ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী দূর্গম পাহাড়ি এলাকা ডবলছড়া। ত্রিপুরা থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি পাহাড়ি ছড়ার নামে স্থানটির নাম হয়েছে বলে জানা যায়।

ডবলছড়া খাসিয়া পল্লী যেতে পাহাড়ি উঁচু নিচু কাঁচা ১২ কিঃমিঃ রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। পথিমধ্যে শমশেরনগর চা বাগানের দু’টো প্রাকৃতিক হ্রদ, একটি গলফ মাঠ ও ক্যামেলিয়া ডানকান হাসপাতাল যে কোন পর্যটকের নজর কাড়বে। অপরূপ সৌন্দর্য্যে আধার ডবলছড়া খাসিয়া পল্লিটি পাহাড়ি টিলার উপর ঘর করে বসবাস করছে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর লোকজন। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় সোয়া ২শ’ কিঃমিঃ উত্তর পূর্বে ও সিলেট বিভাগীয় শহর থেকে প্রায় ৬০ কিঃমিঃ দক্ষিণ পূর্বে ডবলছড়ার অবস্থান। একজন হেডম্যান বা মন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে ডবলছড়া খাসিয়া পল¬ীতে আড়াই শ’ ফুট উপরের হেডম্যান বা মন্ত্রীর বাংলোটি দেখতে খুবই সুন্দর।

কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিঃমিঃ পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি বন রেঞ্জের কুরমা বনবিট এলাকার প্রায় ১০ কিঃমিঃ অভ্যন্তরে দৃষ্টিনন্দন হামহাম জলপ্রপাত। স্থানীয় পাহাড়ি অধিবাসীরা এ জলপ্রপাত ধ্বনিকে হামহাম বলে। তাই এটি হামহাম নামে পরিচিত। সেখানে সরাসরি যানবাহন নিয়ে পৌঁছার ব্যবস্থা নেই। কুরমা চেকপোস্ট পযর্ন্ত প্রায় ২৫ কিঃমিঃ পাকা রাস্তায় স্থানীয় বাস, সিএনজি, জিপ ও মাইক্রোবাসে যেতে হয়। বাকি ১০ কিঃমিঃ পায়ে হেঁটে যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় ৫ কিঃমিঃ দূরে সীমান্ত এলাকায় ত্রিপুরা আদিবাসী পল্লি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা তৈলংবাড়ী কলাবন বস্তি থেকে পায়ে হেঁটে রওয়ানা হতে হবে। প্রায় ৬ কিঃমিঃ পাহাড় টিলা ও ২ কিঃমিঃ ছড়ার পানি অতিক্রম করে ৩ ঘন্টা পায়ে হাঁটার পর ১৬০ ফুট উচ্চতার হামহাম জলপ্রপাতের দেখা পাওয়া যাবে। হামহাম জলপ্রপাত ভ্রমণ করতে পুরো একদিনের প্রয়োজন।

এছাড়াও ভ্রমণের জন্য রয়েছে-কমলগঞ্জে পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের নিরব স্বাক্ষী বিভিন্ন বধ্যভূমি, ব্রিটিশদের শোষনের প্রতীক তিলকপুর নীলকুটি, ঘটনাবহুল মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড, বর্নময় শিল্পসমৃদ্ধ মনিপুরী সম্প্রদায়সহ টিপরা, খাসিয়া, গারো সমাজের ক্ষদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা এলাকা সমূহ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত