বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ ইং

শামীম আনোয়ার

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ২০:৫৪

অন্যরকম এক সাইবার অপরাধীর উপাখ্যান

শামীম আনোয়ারের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া প্রতারক মাহফুজুর রহমান নবিন

একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের উপস্থাপিকার ফেসবুক আইডি হ্যাক হবার সূত্র ধরে তার সাইবার অপরাধ সাম্রাজ্যের বিষয়টি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। ব্যক্তিগত প্রণোদনা থেকে একটু গভীরে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে যা আবিষ্কার করলাম, তা রীতিমতো চমকে ওঠার মতোই। ফেসবুক আইডি হ্যাক করে টুপাইস কামিয়ে নেওয়ার মতো প্রথাগত সাইবার অপরাধী আর ঠুনকো কাজের কাজী নন তিনি মোটেও। তার কাজের বহুমাত্রিকতা সত্যিই একজনের মাথা খারাপ করে দেওয়ার তরফে যথেষ্ট।

Md Anowar Ahmed, Md Kamruzzaman, RJ Rimon আইডিগুলো ভিন্নভিন্ন হলেও মানুষ কিন্তু একটাই। পেশায় র‍্যাব অফিসার(!)। র‍্যাবের ডিএডি পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে ঘিরেই তার অপরাধ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি। তার শিকারের আওতা থেকে বাদ যান না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, মিডিয়া কর্মী, দেশজুড়ে পরিচিত সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী কিংবা আটপৌরে জীবন যাপনকারী সাধারণ একজন চাকুরীজীবী বা গৃহিণীও। একের পর এক ব্যক্তিকে টার্গেট করে তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করার মাধ্যমে অকল্পনীয় সব উপায়ে সাইবার অপরাধ সংঘটন করেন তিনি। হ্যাককৃত আইডি ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন, সম্ভাব্য সকল উপায়ে তার সম্মান বিনষ্ট করেন এবং সব চেয়ে ভয়ঙ্কর কথা হলো- সবশেষে এ আইডিগুলোকে তিনি নিয়োজিত করেন বড়বড় সাইবার অপরাধ সংঘটনের কাজে! তার অপরাধ প্রক্রিয়ার বয়ান শুনলে নিশ্চিত শিউরে উঠবেন যে কোন সুস্থ, স্বাভাবিক, বিবেকবান মানুষ।

টার্গেট করার ক্ষেত্রে নারীদের ফেসবুক আইডির প্রতিই তার বিশেষ 'নেক নজর'। হ্যাক করার পর প্রথমে তিনি আইডির মালিককে মানসিক চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে আইডিতে থাকা একান্ত ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্টস বিভিন্ন জনকে পাঠিয়ে দিতে থাকেন। আইডির মালিক 'আপসে' আসুন বা না আসুন, তিনি কখনোই ওই আইডি তার মালিককে ফেরত দেন না। বরং আইডির ছবি- ইনফোগুলো পরিবর্তন করে কোন কোনটাকে সাজিয়ে নেন র‍্যাব অফিসার, আবার কিছু আইডির পরিচয় রেখে দেন সাধারণ আমজনতা হিসেবেও। তারপর এই আইডিগুলো ব্যবহার করে শুরু হয় তার বিভিন্ন মুখী, বিচিত্র 'আসল' খেলা।

একটা মাত্র উদাহরণ দেই- বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে আমজনতা হিসেবে সাজানো একটা আইডি থেকে তিনি একটা হেল্প চেয়ে পোস্ট দেন। তারপর র‍্যাব অফিসার হিসেবে সাজানো আইডি থেকে সেখানে কমেন্ট করে অনুরোধ করেন ইনবক্স মেসেজে কথা বলতে। কারণ তিনি তো আবার র‍্যাবের অফিসার। প্রকাশ্যে কথা বলা বারণ!! কয়েক দিন পর প্রথম আইডি থেকে পোস্ট করে বলা হয় যে, ওমুক র‍্যাব অফিসার (যে আইডি থেকে ইনবক্সে আসতে বলা হয়েছিল তার নাম উল্লেখ করে) তার জমি বা হারানো মোবাইলটি উদ্ধার করে দিয়েছে। এজন্য তাকে অনেক অনেক থ্যাংকস - কৃতজ্ঞতা এসবও জানায়!!! যারা প্রকৃতই এ ধরনের সমস্যায় আছেন, তারা ভাবেন আহারে, কী দরদী অফিসার! অবধারিতভাবে ওই র‍্যাব অফিসার আইডিতে বিভিন্নজন তাদের সমস্যার কথা পাড়তে থাকেন। তখনই র‍্যাব অফিসার সুযোগটা নেন। সহযোগিতা করার বিনিময়ে টাকা দাবি করেন। এবং বিকাশের মাধ্যমে অগ্রিম টাকা না পাঠালে কাজ করা হবে না মর্মেও সোজাসাপ্টা জানিয়ে দেন। কারণ এই কাজ করতে গেলে র‍্যাবের প্রযুক্তি বিশারদের হেল্প প্রয়োজন, সেজন্য তাকে কিছু টাকা দিতে হবে। সাহায্যপ্রার্থীও কনভিন্সড। র‍্যাব অফিসার বলে কথা। একটু স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড তো তিনি হবেনই। বাস্তব জগতের র‍্যাবগুলা জানি কেমন! একটা টাকাও নিতে চায় না, কোন হেল্পও তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। আরেহ, অফিসার তো হতে হবে এই ইনার মতো। দুটাকা নেবে, দশ টাকার কাজ করে দেবে। অগ্রিম দেওয়ার প্রস্তাবে কেউই আপত্তি করেন না। এভাবে বিভিন্ন কৌশলে দিনের পর দিন পকেট ভারী করে চলেন তিনি।

এভাবে কিছুদিন এক আইডি দিয়ে অপরাধ সংঘটনের পর তিনি নিজে থেকেই সেই আইডি ডিজেবল করে দিয়ে নতুন আরেক আইডির মাধ্যমে তার কাজ শুরু করেন। চিন্তা করে দেখুন, একে তো এই আইডিগুলো তার নিজের নামে নয়, নিজের ডিভাইস থেকে খোলাও নয়, অন্যের হ্যাক করা আইডি। আবার এক আইডি কিছুদিন চালিয়ে সেটা ডিজেবলও করে দেন। সন্দেহজনক কাউকে দেন না নিজের ফোন নম্বরও। তার অপরাধ অনুসন্ধানের সময় তার এই নিখুঁত অপরাধ প্রক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি এড়ানোর ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত সচেতনতাবোধ দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারিনি। পুলিশের একটা স্বতঃসিদ্ধ পূর্বানুমান হলো, অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে অপরাধী কোন না কোন ক্লু পেছনে রেখেই যায়। কিন্তু এই একজনকে দেখলাম, যার ক্ষেত্রে এই আপ্তবাক্য ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি তিনি যখন বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা নিতেন, সেটা বিকাশ এজেন্টের নাম্বার ব্যবহার করে নিতেন। আরও অবাক ব্যাপার হলো, যিনি টাকা পাঠাচ্ছেন, তাকে তিনি সরাসরি সেই বিকাশ এজেন্টের নাম্বার দিতেন না। এমনকি সেই এজেন্টের কাছেও টাকা আসত কয়েক হাত ঘুরে। তার কাছে প্রতারিত বহুজনের সাথে আমি কথা বলেছি। এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায় নি, যাকে তিনি তার মোবাইল নম্বর দিয়েছেন। তিনি এতই সতর্ক যে, এমনকি একটা মেয়েও খুঁজে পাওয়া যায় নি, যার সাথে তিনি সশরীর দেখা করেছেন বা ভিডিও চ্যাট করেছেন। মোবাইলের বদলে তার সকল ধরণের যোগাযোগ সম্পন্ন হত ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে। উদ্দেশ্য একটাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে তার অপরাধ সাম্রাজ্য অটুট রাখা।

তার কর্মকাণ্ডের প্রতি ভালভাবে দৃষ্টিপাত করলে হরর উপন্যাসের পাতার কল্পনার 'বহুরূপী'কে নশ্বর জাগতিক রূপে দেখার ইচ্ছে দূর হয়ে যাবে নিশ্চিত। আইডি হ্যাক করে বহুজনকে তিনি চূড়ান্ত হেনস্থা করেছেন, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দিয়েছেন, র‍্যাব সেজে বহুজনের সাথে আর্থিক-অনার্থিক প্রতারণা করেছেন, বহু মেয়ের সাথে চরম অশালীন ও নোংরা ছবি পাঠিয়ে এবং উচ্চারণ অযোগ্য কথা বলে তাদেরকে আক্ষরিক অর্থে লাইফ হেল করে দিয়েছেন। আর সম্ভবত যা আপনি দূরতম কল্পনাতেও আনেন নি। তিনি এমন একটি চক্রের সদস্য যারা কোন মেয়েকে টার্গেট করে থ্রিএক্স ভিডিও বা ছবিতে ওই মেয়ের মাথা কেটে বসিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার বা তার বৈবাহিক/ব্যক্তিগত সম্পর্ক দুমড়ে-মুচড়ে শেষ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ৯০% ক্ষেত্রে তারা সফলও হন, কারণ এই এডিট প্রক্রিয়াটি তারা এমন সুনিপুণভাবেই করা হয়, দেখে কারো ভাবনাতেও না যে এই ভিডিও বা ছবি সেই মেয়ের নয়। ফলাফল? স্বামী-স্ত্রী, বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডের ভুল বোঝাবুঝি এবং অবশেষে....। এই কাজের ক্ষেত্রে তারা অনেকটাই প্রফেশনাল।

ফেসবুক তাকে কম কিছু তো দেয় নি। অর্থবিত্ত, আধিপত্য, প্রেম ভালবাসা (!) সব। অথচ আপনি জেনে তাজ্জব হবেন- মার্ক জাকারবার্গ এতই দুর্ভাগা তার ফেসবুকে এই মহারথী নিজের নামের একটা আইডিও খোলেন নি। এমনকি নেই তার নিজের ডিভাইস হতে খোলা কোন আইডিও। তার সকল আইডি মানুষের কাছ থেকে হ্যাক করে কেড়ে নেওয়া এবং সবগুলোরই নাম, ইনফো সব চেঞ্জ করা। থ্রিলারকে হার মানানো অবিশ্বাস্য অপরাধ কৌশল প্রয়োগ করে দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য ভুক্তভোগী মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর অবশেষে বুধবার বিকেলে (১৬ অক্টোবর, ২০১৯) তার খেলা সাঙ্গ হয়েছে। অনেক ঘটনা পরম্পরায় অবশেষে হবিগঞ্জ থেকে আমি ও আমার টিম গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই সাইবার জগতের এই ডনকে।

আগে যারা যারা এই লোকের হাতে টাকাপয়সা - মানসম্মান সব খুইয়েছেন, এরেস্টের পর তাদের সাথে যোগাযোগ করলাম। তার কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা করা দরকার। কিন্তু এবার আমার হতবাক হবার পালা। মামলা করার জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই শুধু হ্যাককৃত ফেসবুক আইডি আর হাতিয়ে নেওয়া টাকাপয়সাই ফেরত চান। এমনিতেই এতদিন ধরে এক সাইবার দুর্বৃত্তের হাতে জেরবার হয়েছেন, এখন কী দরকার মামলা করে নতুন আরেক বিপত্তি বাঁধানোর! খুব হতাশ বোধ করলাম। পাশের বাড়ির লোকের সাথে ঝগড়া-হাতাহাতি হলেও আমরা মামলা ঠুকে দিতে রাজি, কিন্তু যিনি ঠাণ্ডা মাথায় অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায়সহ তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো কেউ নেই!!!

অগত্যা আমরা র‍্যাব বাদী হয়েই মামলা রুজু করি। আটক রবিনের বিরুদ্ধে অন্যের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ব্যবহার, হ্যাক চেষ্টা, বিপুল পরিমাণ পর্নোগ্রাফিক ভিডিও ও ছবি মোবাইল ও ফেসবুকে সংরক্ষণ ও আদানপ্রদান, প্রতারণামূলক ভাবে অর্থ আদায় ও সাইবার অপরাধ সম্পর্কিত অন্যান্য অভিযোগ এনেছি আমরা। আশা করছি, নবিন ওরফে md Anowar Ahmed, ওরফে Md Kamruzzaman ওরফে RJ Rimon এবার তার কৃতকর্মের উপযুক্ত কর্মফলই ভোগ করবেন।

সবার কাছে একটি অনুরোধ জানিয়ে আজকের লেখা শেষ করব- আপনি যে ধরনের ক্রাইমের শিকারই হন, যদি কোন ফেসবুক গ্রুপে সেটা পোস্ট করার মাধ্যমে তার প্রতিকার লাভের আশা করেন, যদি মনে করেন সেই গ্রুপে অবস্থানরত র‍্যাব পুলিশের অফিসারেরা স্বপ্রণোদিত হয়ে আপনার অভিযোগটি আমলে নিয়ে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে নেবে, তাহলে বলব, ভাই আপনি ভুলের রাজ্যে বাস করছেন। বরং র‍্যাব পুলিশের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ছাড়া অন্য কোথাও অভিযোগ পোস্ট করে প্রতিকার চাওয়ার সাথে সাথেই এটা নিশ্চিত হয়ে গেল যে, আপনি কোন এক প্রতারকের খপ্পরে পড়তে যাচ্ছেন। কারণ আপনাকে সহযোগিতা করার জন্য আসল র‍্যাব/পুলিশ অফিসার সেখানে থাকুক বা না থাকুক, আপনার বিপদের সুযোগ নিয়ে আপনার টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক ভুয়া র‍্যাব/পুলিশ সেখানে ওঁত পেতে বসে আছে। আর সেই ভুয়াদের কথাবার্তা, সাজসজ্জা, আচরণ এতই নিখুঁত, আপনি ঠকে যাবেন নিশ্চিত।

অনলাইন ভিত্তিক অ্যাপস/ ওয়েবসাইটসমূহ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাই সতর্কতা অবলম্বন করুন, অন্য সবাইকেও এ বিষয়ে সচেতন করুন। কারণ সাইবার ক্রাইম বিষয়টা এমনই, একবার এর শিকারে পরিণত হলে দুর্বিষহ হয়ে যেতে পারে আপনার পুরো জীবন।

  • শামীম আনোয়ার : এএসপি, র‍্যাব-৯

আপনার মন্তব্য

আলোচিত