Advertise

শ্যামল কান্তি ধর

০৩ এপ্রিল, ২০২০ ১৭:০৯

বাংলা চলচ্চিত্রের দুর্দিনের খর রৌদ্রে ফাগুন হাওয়ার বৃষ্টি

চলচ্চিত্র সমালোচনা

বাংলার ফাগুন আমাদের মন ও মননে এক রোমান্টিকতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়। প্রকৃতি সাজে নতুন সাজে। কবির কবিতায় ফাগুনের রূপ ও প্রিয়ার রূপ একাকার হয়ে যায়। ফাগুন আগুন ছড়ায়। আগুন লাগে মনে,চেতনায়।বাঙ্গালীর জীবিনে ও চেতনায় সত্যিকারের আগুন লেগেছিল ১৯৫২ সালের ফাল্গুনে। ইতিহাস সবারই জানা। আমি আজ সেই ইতিহাসের কথা লিখছি না। বাংলার নববর্ষের প্রারম্ভে আমি লিখতে বসেছি ফাগুনের গল্প! আমি বলতে চাচ্ছি সেই ফাগুনের পটভুমিকায়  নির্মিত তৌকির আহমেদ এর চলচ্চিত্র “ফাগুন হাওয়ায়” এর গল্প।

আমাদের মাধ্যামিক ও উচ্চ মাধ্যামিক পরীক্ষায় প্রায়শই একটা প্রশ্ন আসত “উপন্যাসটির নামকরনের সার্থকতা বিচার কর”” কিংবা “উপন্যাসটি উপন্যাস হিসাবে কতটুকু সার্থক হয়েছে তা বিচার কর”।  আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ত। কিছু না বুঝেই গাইড বই পড়ে মুখস্ত করা অংশটুকু যতটুকু পারতাম উগরে দিয়ে আসতাম। “ফাগুন হাওয়ায়” দেখতে বসার আগে আমার মাথায় এই প্রশ্ন দুটোই ঘুরছিল। যাই হোক, এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে সিনেমাটি শেষ অবধি দেখতে হবে। আমি চলচ্চিত্র সমালোচক নই। টেলিভিশনে বাংলা সিনেমা দেখে বড় হওয়া সামান্য দর্শক মাত্র। অডিটোরিয়ামের বাতি নিভে গেল। শুরু হলো “ফাগুন হাওয়ায়”।  

সময় ১৯৫২ সাল। খুলনাগামী একটি লঞ্চ। পাকিস্তানি এক পুলিশ অফিসার(যশপাল শর্মা)লঞ্চে উঠার সময় বাঙ্গালী প্রবীন ডাক্তার(আবুল হায়াত)কে পাশ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে চলে যেতে চাইলে ডাক্তার প্রতিবাদ করেন। অফিসার ক্ষেপে যায়,যেন এ তার অধিকার।এতো ঠিক পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের উপর ধাক্কা দিয়ে লাগতে আসার দম্ভ। যদিও আমরা মিডিয়ার কল্যানে আগেই জেনে গেছি “ফাগুন হাওয়ায়” ভাষা আন্দোলন এর ইতিহাস নিয়ে নির্মিত কোন সিনেমা না হলেও এটা ভাষা আন্দোলনের পটভুমিকায় নির্মিত। পরিচালক সুনিপুণ ভাবে একটি মফঃস্বল থানার কাহিনীর বিন্যাসে আমাদের ভ্রমন করিয়ে আনেন ভাষা আন্দোলনের চেতনায় ও সংগ্রামে।

আসুন, আমরা লঞ্চের ডেকে সিনেমার আরো প্রধান দুটো চরিত্রের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নাসির (সায়েম)ও  মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী দীপ্তি (তিশা)।দীপ্তি উপরোল্লিখিত ডাক্তারের নাতনী। ডেকে আরেকজন বাউলের  উপস্তিতি আছে যিনি আপন মনে গেয়ে চলছেন লালনের গান। বাংলার গান। পুলিশ অফিসার জামসেদের বাংলার এ বাউল গান সহ্য হয় না। সে বাউলকে এ গান বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। হতভম্ব বাউল। প্রতিবাদ জানায় নাসির। পাকিস্তানি শাসকদের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির  উপর আঘাতের আরেক প্রতিবিম্বের রূপ সুনিপুনভাবে তুলে ধরেছেন পরিচালক। নাসির প্রতিবাদী বাঙ্গালীদের প্রতিনিধি। বাউল গান থামিয়ে দিলেও নাসির হাতে তুলে নেয় বাউলের দোতরা। সম্পূর্ণ করে বাউলের অসম্পূর্ণ গান। বদ মেজাজী, অসৎ ও অহংকারী পুলিশ অফিসার জামসেদ এর উপস্তিতি সিনেমাটির অধিকাংশ জায়গা জুড়ে আমরা দেখতে পাব তবে তা কোনভাবেই বাহুল্য বয়ে আনেনা।দাম্ভিক এই অফিসার শান্তিনগর থানার ওসি হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে আসে শাস্তিমুলক পদায়ন হিসাবে। এসেই তার স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্বান্ত চাপিয়ে দিতে চায় অধিনস্ত অফিসার এবং এলাকাবাসীর উপর।জামসেদ দাম্ভিকতার সহিত ঘোষণা করে উর্দু হবে এই অঞ্চলের জনগনের একমাত্র ভাষা। যশপাল শর্মা তার সাবলীল অভিনয়গুনে বারবার যখন উচ্চারণ করেন “উর্দু, উর্দু এবং উর্দু ‘তখন আমরা চোখের সামনে যেন জিন্নাহর সেই রূপটিই দেখতে পাই।

পরিচালক তৌকির আহমেদ পাকিস্তানি শাসকদের প্রতিনিধি হিসাবে আমাদের সামনে হাজির করেন জামসেদকে। এই চরিত্রকে একটু বিশ্লেষণ করলেই আমরা তৎকালীন শাসকগোস্টির একটা পরিচয় পেয়ে যাই যা নতুন প্রজন্মকে আগ্রহী করে তুলবে ইতিহাস চর্চায়।  

পুলিশ অফিসার এর চরিত্রে যশপাল শর্মার অনবদ্য অভিনয়ে, সায়েম ও তিশার প্রতিবাদে ইতিহাস আরও জীবন্ত হয়ে উঠে রূপালী পর্দায়। এই পুলিশ অফিসার এর মতই পাকিস্তানি সেনারা বাঙ্গালীদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাধ্যমে রক্তের হোলী খেলায় মেতে উঠেছিল ১৯৭১ সালে। “ফাগুন হাওয়ায়” এর কিছু নমুনা আমরা দেখতে পাই। কামুক, লোভী জামসেদের হাত থেকে রেহাই পায়নি থানার নির্বাক ঝাড়ুদার ঝুমুর।লালশাড়ী, আলতা, লিপস্টিক দেখে ঝুমুরের বাবা (ফজলুর রহমান বাবু) যখন জামসেদের প্রশংসা করে তখন বোবা ঝুমুর অসহায় চোখে তাকায় তার বাবার দিকে। বাবা আপনমনে নৌকা চালিয়ে যায় নদীর বুক চিরে।ঝুমুর কিভাবে বুঝাবে তার বাবাকে জামসেদের লুচ্চামির কথা, তার অপমানের কথা। ঠিক সেই মুহূর্তে পরিচালক তৌকির আহমেদ পরিচালক হিসাবে তার সার্থকতার পরিচয় দিয়ে দেন। আমরা দেখতে পাই, নির্বাক ঝুমুর অশ্রুসজল চোখে আলতার গুড়ো ভাসিয়ে দেয় নদীর বুকে। লাল হয় নদীর জল। যেন রক্ত ভাসছে নদীর বুকে। এতো ঝুমুরের অপমানের রক্ত। এ আমাদের শহীদের রক্ত। যাদের রক্তের বিনিময়ে পেয়ছি আমাদের বাংলা ভাষা, আমাদের স্বাধীনতা।বাকহীন ঝুমুর যখন জামসেদের লালসার শিকার হচ্ছে  তখন পরিচালক আমাদের নিয়ে যান সায়েম ও দীপ্তির নাটকের দলের নীলদর্পণ নাটকের  রিহারসেলে। যেখানে অত্যাচারী ইংরেজ নীলকরদের হাতে অত্যাচারিত হচ্ছে আরেক বাঙ্গালী নারী, যে চিৎকার করে বলে, “আমাকে ছেড়ে দাও সাহেব, মোরে বাড়ি যেতে দাও”। এতো বোবা ঝুমুরের আর্তনাদ।ধন্যবাদ তৌকির আহমেদকে এই স্বল্প সময়ে কষ্টের বিশালতাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য।না দেখিয়ে,না বলে যা বলতে পেরেছেন তা আরো শক্তিশালী হয়েছে।আমরা বাংলা সিনেমায় সুদিনের আশা করতেই পারি।

“ফাগুন হাওয়ায়” চলচ্চিত্রটি টিটো রহমানের ছোট গল্প “বউ কথা কও” এর অনুপ্রেরণায় নির্মিত। এই গল্পে আজিজ সাহেব একজন পাকিস্তানি পুলিশ অফিসার যিনি বাংলাভাষা রপ্ত করেছেন বাঙ্গালীদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার সুযোগ লাভের জন্য। কিন্তু উর্দু ভাষার প্রতি তার সবিশেষ দুর্বলতা। উর্দু ভাষাকে বাংলার সর্বস্তরে চালুর জন্য তিনি জিন্নাহর কাছে একটা চিঠিও লেখেন। কিন্তু আজিজ সাহেব একদিন শুনতে পান একটি পাখিও “বউ কথা কও” বলে ডাকছে, তাই তিনি পাখিদের  ভাষাও উর্দু করার জন্য জিন্নাহের কাছে আরেকটি চিঠি লেখেন। আজিজ সাহেব একটি খাঁচা বন্দী পাখি পুষেন এবং পাখিটিকে “ পাকিস্তান জিন্দাবাদ” শেখানোর চেষ্টা করেন। মাস ঘুরে বছর যায় কিন্তু পাখিটি “ পাকিস্তান জিন্দাবাদ” বলে না। আজিজ সাহেব মহা বিরক্ত হন। তিনি পাখিটিকে অনেক অত্যাচারের মাধ্যামে খাবার ও পানি দেয়াও বন্ধ করে দেন। একদিন পাখিটির একটি ডানাও ভেঙ্গে দেন। তবুও পাখি উর্দু শিখে না। আজিজ উপলব্দি করেন, যে বোকা পাখিটিকে তিনি অনেক চেষ্টা করেও উর্দু শেখাতে পারছেন না জিন্নাহ সাহেব বুদ্ধিমান বাঙ্গালিকে কিভাবে উর্দু শিখাবেন। তিনি পাখিটিকে মুক্ত করে দেন। পাখিটি উড়ে যায় আকাশের সীমানায় মুক্তির দিকে, স্বাধীনতার দিকে, ইচ্ছেমতন বলার দিকে।

তৌকির আহমেদের ফাগুন হাওয়ায় পুলিশ অফিসার জামসেদও জিন্নাহ সাহেবের কাছে চিঠি লেখে পাখি ও মানুষের ভাষা উর্দু করার জন্য। কিন্তু তার এ চিঠি জিন্নাহের কাছে পৌঁছায় না। বুদ্ধিমান বাঙ্গালি অফিসার তা পুড়িয়ে ফেলে। জামসেদ পাখিদের উর্দু শেখানোর পাশাপাশি মানুষদেরও উর্দু শেখানোর ব্যাবস্তা করেন এবং তা রীতিমত মৌলভী  রেখে। তৌকির আহমেদ ছোট গল্পের মুল ভাব ঠিক রেখে “ফাগুন হাওয়ায়” এর কাহিনী এগিয়ে নিয়ে যান আরো বিস্তৃতভাবে তবে অবশ্যই লাগাম টেনে।  

নীলদর্পণ নাটকের প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায় জামসেদের অন্যায় হস্তক্ষেপে। এদিকে জিন্নাহর উর্দুকে রাস্ট্র ভাষা করার ঘোষণার প্রতিবাদে যখন ফোঁসে উঠে বাঙ্গালী প্রান, তখন তার ছোঁয়া এসে লাগে খুলনার মফঃস্বল থানা শান্তিনগরে। নাট্যকর্মীরা এবার দেয়াল লিখনে নামে। জামসেদের কোয়ার্টার এর পুরো দেয়াল একরাতে ঢেকে যার সুকান্তর কবিতায়। শহরের বিভিন্ন দে্যাল ছেয়ে যায় একটি শ্লোগানে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। এক রাতে দেয়াল লিখনের সময় জামসেদের প্ররোচনায় মুসলিম লীগের গুন্ডাদের হাতে নিহত হয় নাসিরের(সায়েম) এর ভাই সাজু খাদেম।উত্তাল হয় নাসিরদের বিক্ষোভ। রক্তে রাঙ্গা মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় থানা অভিমুখে।মিছিলে এসে যোগ দেয় সেই মৌলভী,ঝুমুরের বাবা। দীপ্তি(তিশা)কে নিয়ে তার ঠাকুরদা(আবুল হায়াত) ভারতের পথে রওয়ানা দিলেও মিছিলে এসে যোগ দেয় দীপ্তি। ভয় পায় জামসেদ। অসহযোগিতায় নামে বাঙ্গালী অফিসার। পালাবার পথ খোঁজে জামসেদ। নাসির, দীপ্তিদের মিছিল যেন মিশে যায় ঢাকার সেই মিছিলের সাথে। রক্ত রাঙ্গা পথ পেরিয়ে বাংলা হয় আমাদের ভাষা। ফাগুনের সেই দিনের হাওয়া এসে লেগেছিল শান্তিনগরেও। প্রেমে ও বিদ্রোহে এগিয়ে যায় সিনেমার কাহিনী। তাই বোধহয় সিনেমার নাম “ফাগুন হাওয়ায়”।

পুরো সিনেমা দেখার পর একটা ভালোলাগার আবেশ তৈরি হয়। এই সিনেমায় প্রেম আছে, বিদ্রোহ আছে, আছে কমেডি। যদিও ভুত সেজে মৌলভী ও পুলিশ অফিসারকে ভয় দেখানোর কমেডি হাস্যরসের কারন হয়েছে তবে আমার কাছে মনে হয়েছে তা না থাকলেও চলত। মিছিলে ড্রোন ক্যামেরার ব্যাবহার না করে মিছিলের মুখের অভিব্যাক্তি আরও ফোকাস করা যেত। ঠাকুরদাকে দাদু বললে ডাকলে আরেকটু শ্রুতিমধুর হত। এবার তাহলে সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হবে “চলচ্চিত্র হিসাবে ফাগুন হাওয়ায় কতটুকু সার্থক”। এটার উত্তর অবশ্যই দেশের চলচ্চিত্র বোদ্বাদের কাছ থেকে একদিন পেয়ে যাব। তবে আমি সাধারন দর্শক হিসাবে উপরের আলোচনায় পরিচালকের সার্থকতা প্রমান করার চেষ্টা করেছি।

প্রিয় পাঠক, আসুন আমরা বাংলা সিনেমা দেখি এবং তা হলে গিয়ে। “ফাগুন হাওয়ায়” এর মত সিনেমা যত বেশী নির্মাণ হবে আমরা ততই বাংলা সিনেমার সুদিনের কাছাকাছি যাব।

লেখক: ব্যাংকার।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত