হাসান মোরশেদ

২৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০২

স্যালুট আপনাকে স্যার চিত্ত রঞ্জন দত্ত

জেনারেল চিত্ত রঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত) মুক্তিযুদ্ধে ৪ নং সেক্টর কমান্ডার ছিলেন- সদ্য প্র‍য়াত এই মহাত্মা'কে নিয়ে অতোটুকুই যথেষ্ট নয়।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব অর্থ্যাৎ ২৬ মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে উঠা স্বতস্ফুর্ত প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যারা জেনারেল দত্ত তাঁদের একজন, তখনো সেক্টর গড়ে উঠেনি তখনো কেউ জানতোনা কী হতে পারে?

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই মেজর ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। ২৭ মার্চ হবিগঞ্জ শহরে আওয়ামী লীগের দুই জনপ্রতিনিধি জেনারেল রব আর মানিক চৌধুরী সিদ্ধান্ত নেন হবিগঞ্জ থেকে উত্তর দিকে এসে সিলেট শহর দখল করার। বৃহত্তর সিলেট মুক্ত করে বাংলাদেশ মুক্তের যুদ্ধ চালাতে হবে। জেনারেল রবের নির্দেশে এই যুদ্ধের নেতৃত্ব গ্রহন করেন সামরিক অফিসার চিত্ত রঞ্জন দত্ত। হবিগঞ্জ ট্রেজারি থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে ১৫০ জনের মতো বাঙালী ইপিআর পুলিশ নিয়ে এক অসামান্য যাত্রা সি আর দত্তের। হবিগঞ্জ থেকে শ্রীমঙ্গল মৌলভীবাজার হয়ে সিলেটে অভিমুখে, পথে পথে যোগ দেয় শত শত মুক্তিকামী মানুষ দেশী অস্ত্র নিয়ে। শেরপুর আর সাদীপুরে ভয়াবহ যুদ্ধ পাকিস্তানী সৈনিকদের সাথে। পাকিস্তানীদের গুঁড়িয়ে দিয়ে সিআর দত্তের বাহিনী এগিয়ে যায় সিলেটের দিকে। মৌলভীবাজার থেকে সিআর দত্তের সাথে যোগ দেন শফিউল্লাহ’র বাহিনীর ক্যাপ্টেন আজিজ। ক্যাপ্টেন আজিজ তাঁর কোম্পানী নিয়ে অন্যদিকে ঘুরে অবস্থান নেন সুরমা নদীর দক্ষিন পাড়ে। মেজর সিআর দত্ত আর ক্যাপ্টেন আজিজের নেতৃত্বে তখন কয়েকশো সৈন্য, পুলিশ, ইপিআর আর হাজার হাজার জনতা দখল করে নেয় সিলেট শহর। কারাগার ভেঙ্গে তাঁরা মুক্ত করে দেন সব বন্দীদের। পাকিস্তান আর্মি শহর ছেড়ে আশ্রয় নেয় বিমান বন্দরে। তামাবিলের দিক থেকে ক্যাপ্টেন মোতালিব এগিয়ে এসে এয়ারপোর্টে মর্টার শেলিং করেন পাকিস্তান আর্মির উপর।

বিজ্ঞাপন



এ এক অসাধারন যুদ্ধ গাঁথা।

৮/৯ তারিখে সিআর দত্ত ভারতের শিলচর যান ভারতীয় বাহিনীর কাছ থেকে আরো অস্ত্র আনতে, সেখানে ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী। ফেরার সময় গাড়ি দূর্ঘটনায় আহত হন মেজর।

পাকিস্তান আর্মি বিমানযোগে রি-ইনফোর্স করে, এরপর সিলেট শহর ও মুক্তিবাহিনীর সকল অবস্থানের উপর শুরু করে একটানা বিমান আক্রমন। আহত হন ক্যাপ্টেন আজিজ। এক পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সিলেট আবার দখল করে নেয় পাক বাহিনী।

তবু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে শেরপুর যুদ্ধ, সিলেট প্রথম বার মুক্ত করার যুদ্ধ। এইসব যুদ্ধের মহা নায়ক- একজন সিআর দত্ত।

২৭ মার্চে হবিগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া প্রতিরোধ যুদ্ধ কী করে শেষ হলো ১৬ ডিসেম্বর, অগনিত ভারতীয় সৈনিক বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধা আর মুজিব বাহিনীর গেরিলা শহরের প্রিয় সন্তান সুলেমানের রক্তে কী করে মুক্ত হলো সিলেট- এ নিয়ে বিস্তারিত কাজের বাসনা পোষন করি। এই কাজে আপনি থাকবেন অন্যতম চরিত্র।

এই মাটি আপনাকে ভুলবে না।

আরো অনেক সেক্টর কমান্ডারের মতো আপনি ষড়যন্ত্রে জড়াননি, নিজের ও দেশের ক্ষতি করেননি, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন আজীবন।

স্যালুট আপনাকে স্যার চিত্ত রঞ্জন দত্ত, মুক্তিযোদ্ধা।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহিত)
হাসান মোরশেদ : লেখক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত