জাহিদুল ইসলাম সবুজ

২৪ এপ্রিল, ২০১৭ ২২:৫৬

মিঠুন চক্রবর্তী-রাইমা সেনকে নিয়ে নির্মিত হচ্ছে চলচ্চিত্র ‘হাসন রাজা’

“বিলেতের মুখ আমি দেখিয়াছি” (A Kind of English) পরিচালনা করে প্রথম আলোচনায় আসেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৃটিশ চলচিত্র নির্মাতা রুহুল আমিন। ১৯৮৬ সালে রুহুল আমিনের পরিচালনায় বাংলাদেশী যৌথ পরিবারের জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র সাড়া জাগায় বৃটেনের চলচিত্র অঙ্গনে।

বিবিসি এবং চ্যানেল ফোরের জন্য নির্মান করেন প্রায় ১৫ টি ডকুমেন্টারি এবং চলচ্চিত্র। তাঁর অনবদ্য চিত্রনাট্য আর অপূর্ব নির্মানশৈলী এনে দিয়েছে জগতজোড়া খ্যাতি। কিন্তু এসবের মাঝেও তাঁর শৈশবে ফেলে আসা বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার প্রতি তাঁর ভালোবাসা এতোটুকু ম্লান হয়নি। শেকড়ের টানে ফিরে এসেছেন বার বার। সিলেটে শৈশব কাটানো এই চিত্র নির্মাতা তাঁর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে চান অনন্য উচ্চতায়।

সেই অদম্য বাসনা থেকেই রুহুল আমিন নির্মান করছেন উপমহাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান মরমী কবি ও বাউল সাধক হাছন রাজার জীবনী নিয়ে বড় বাজেটের ছবি “হাসন রাজা”। যেখানে হাসন রাজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন উপমহাদেশের কিংবদন্তী অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী। অন্যান্য চরিত্রে আছেন বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাইমা সেন, বাংলাদেশের খ্যাতিমান অভিনেতা মামুনুর রশীদ, অভিনেত্রী শম্পা রেজা সহ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন শিল্পী।

তাঁর প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র ‘হাসন রাজা’ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম এর ।

-    বৃটেন বেড়ে ওঠা, চলিচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন দীর্ঘদিন। হঠাৎ করে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মানের ইচ্ছা হলো কেনো?

-    আমার জন্ম এদেশেই, শৈশব কেটেছে সিলেট নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায়। নাড়ির টানটা সবসময়ই ছিল। যদিও বৃটেনে বেড়ে ওঠা এবং জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছি তবুও শেকড়ের টান উপেক্ষা করে ছিলাম না। বারবার ছুটে এসেছি। আমার ভাষা, আমার সংস্কৃতি, আমার দেশ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছাটাও দীর্ঘদিনের, কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে হয়ে ওঠেনি।

-    প্রথম বাণিজ্যিক ছবি; হাসন রাজার জীবনী নিয়ে কেনো? মানে বাণিজ্যিক ছবি হিসেবে সাধরনত আমরা যেসব দেখি, সেদিকে না গিয়ে একদম বায়োপিক।

-    না না, এটা ঠিক এমন নয়। ‘হাসন রাজা’ নাম শুনেই যেমনটি মনে হয় আসলে এটা তেমন কোনো বায়োপিক নয়। এটা একটি নিখাদ প্রেমের গল্প। একটি মেয়ের প্রেমে জমিদার হাসন রাজা কিভাবে প্রেমিক হাসন হয়ে ওঠেন, সেই গল্প নিয়েই মূলত এই ছবি। মরমী সাধক হাসন রাজার জীবনী নিয়ে ছবি করতে গেলে সেটা একটা বা দুটো ছবিতে হবে না। হাসন রাজার জীবন ছিল বৈচিত্রময়; তাঁর জীবন দর্শন অনেক সমৃদ্ধ। ‘হাসন রাজা’ সিনেমায় আমি শুধু প্রেমিক হাসন রাজাকে তুলে ধরেছি। হাসন রাজা সম্পর্কে কিছু গল্প প্রচলিত আছে যার বাস্তবে আসলে কোনো ভিত্তিই নেই, হাসন রাজাকে সাধারন মানুষের কাছে এক অত্যাচারী, লম্পট জমিদার হিসেবে প্রচার করা হয়েছে কোনো উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ ছাড়াই। আমি দীর্ঘদিন হাসন রাজা সম্পর্কে পড়াশোনা করেছি, দেশী বিদেশি বিভিন্ন গবেষকদের লেখায় সত্যিই এমন কিছু পাইনি। যেটা ছিল সেটা খুবই স্বাভাবিক, যেমন-নৌকায় গান বাজনার আসর করা, বিভিন্ন গানের দল নিয়ে নৌবিহার ইত্যাদি। হাসন রাজা ছিলেন খুবই উঁচু মানের দার্শনিক, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হাসন রাজার দর্শনের প্রশংসা করে গেছেন।

-    চলচ্চিত্র নির্মাণে এলেন কি করে?
-    ছেলেবেলায় আমার মামারা যখন ছুটিতে আসতেন তখন প্রায়ই পরিবারের সবাইকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতেন, সিনেমা কি সেটা মোটেই বুঝতাম না। থিয়েটারের সাথে পরিচিত ছিলাম, একটা দৃশ্যের পর আরেকটা দৃশ্য মঞ্চায়ন এর মাঝখানে হল অন্ধকার করে মঞ্চ প্রস্তুত করতে হয়। কিন্তু সিনেমায় এমনটি নয়, আমি কৌতুহল ভরে দেখতাম কি করে একজন মানুষ গান গাইছে আবার পরক্ষণেই দেখা যায় মাঠে গরু চরাচ্ছে, এতো বড় বিশাল মাঠ একটি পর্দায় কিভাবে চলে আসে এসব নিয়ে ভাবতাম খুব। মামাদের জিজ্ঞেস করায় মামা দেখালেন পেছনের দিকে আলো আসছে, এটা থেকেই এই সিনেমা। কিন্তু আমার মাথায় ঢুকতো না, আমি ভাবতাম এটা যাদু। আর ইচ্ছে করতো আমিও এই যাদু শিখবো। সেই ইচ্ছেটাই বৃটেনে এসে বাস্তবে রুপ নিয়েছে। পড়াশোনাটাও করেছি ফিল্ম নিয়ে, তারপর প্রথম নির্মান করি ‘বিলেতের মুখ আমি দেখিয়াছি’ (A Kind of English)।

-    আবারো ‘হাসন রাজা’ নিয়ে কথা বলি, হাসন রাজার চরিত্রে মিঠুন চক্রবর্তী অভিনয় করেছেন।

-    আমি মিঠুন দা’র অভিনয়ের খুব ভক্ত। হাসন রাজার জীবনের যে অংশটি নিয়ে আমি ছবিটি নির্মাণ করেছি আমার মনে হয়েছে এই চরিত্রে মিঠুন দা ছাড়া আর কাউকে মানাবেনা। বরং মিঠুন দা’র মত একজন কিংবদন্তী শিল্পী হাসন রাজা চরিত্রে অভিনয় করছেন এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। দর্শকরা ছবিটি দেখলেই বুঝতে পারবেন, কি অপুর্ব অভিনয় শৈলীতে হাসন রাজাকে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।

-    ‘হাসন রাজা’ ছবিতে যে গানগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে একটু বলুন।

-    ‘হাসন রাজা’-তে সংগীত পরিচালনা করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত ব্যক্তিত্ত্ব বাপ্পি লাহিড়ী। মোট এগারোটি গান নেয়া হয়েছে এই ছবিতে, গান গেয়েছেন কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অলকা ইয়াগনিক, শান, কুমার শানু, অভিজিৎ, পান্থ কানাইসহ প্রমুখ। এই সিনেমায় সংগীত একক অনন্য মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন ব্যবহৃত হয়েছে উচ্চ প্রযুক্তি, তেমনি ব্যবহার হয়েছে মৌলিক যন্ত্রানুসঙ্গ। বাপ্পি দা বলেন তাঁর জীবনে অন্যতম সেরা মিউজিক কম্পোজিশন হচ্ছে ‘হাসন রাজা’।

-    ‘হাসন রাজা’ চিত্রনাট্য কার লেখা?

-    বাংলাদেশের প্রখ্যাত নাট্যকার সেলিম আল দ্বীন এবং অধ্যাপক মঞ্জুরুল ইসলাম এর বিভিন্ন গবেষণা পত্রের সমন্বয়ে ‘হাসন রাজা’-র জীবনের একটি বিশেষ সময়ের গল্প নিয়ে তৈরি করা হয়েছে চলচ্চিত্র। এককভাবে চিত্রনাট্যকার কেউ নেই।

-    এই চলচ্চিত্র নির্মাণে দীর্ঘদিন সময় ব্যয় করার কারণ কি?

-    ছবির গল্প নিয়ে দীর্ঘদিন আটকে ছিলাম এটার অন্যতম প্রধান কারণ অর্থ সংকট, এই গল্প দেখলেই অনেকে লগ্নি করতে চান নি। আমি ঢাকাতে অনেক বড় বড় প্রযোজকদের সাথে কথা বলেছি কিন্তু কেউ ঠিক সাড়া দেন নি, সবাই নিরাপদ অর্থ লগ্নি নিশ্চিত করতে চায়। ‘হাসন রাজা’ শুনেই অনেকে বলে দিলেন এসবতো আর্ট ফিল্ম, পুরস্কার পাওয়া যায় কিন্তু বাণিজ্যিক ছবি হিসেবে এসব চলেনা। এক কথায় সবাই আমাকে নিরুৎসাহিত করতে লাগলেন। তারপর আমার বন্ধুদের সহযোগিতায় আমি এই ছবি নির্মাণ করি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই ছবি মুক্তির পর মানুষের ধারণা পাল্টাবে। নব্বইয়ের দশক থেকে আমাদের দেশি চলচ্চিত্রের যে জীর্ণ দশা, সেখানে ‘হাসন রাজা’ একটি মাইল ফলক হিসেবে থাকবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত