২৫ এপ্রিল, ২০১৭ ১০:৪৯
৪৭ জনের বহর নিয়ে যখন টকিজের সদর ছিটকে মূল সড়কে পা রাখলাম তখন সড়ক বাতিগুলো আপন মহিমায় রাতের জানান দিচ্ছে। টার্গেট ছিলো ৫০-এর, সে অনুযায়ী বুকিংও ছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৩ বনিআদমকে ‘ক্ষমা’ করে দিয়ে ৫০ এর কোটায় ৪৭ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। সামনের সারির ঠিক মাঝামাঝি আসনগুলোর বামে পাওলি দাম, ডানে শাকিব খান আর মাঝখানে হাসিবুর রেজা কল্লোল! পাওলি দামের পাশের আসনটিই আমার! যেহেতু আয়োজনটি আমার তাই এই সুযোগটা নিলাম স্বৈরশাসকের মতোই! অবাক হচ্ছেন? নাহ, অবাক হবার কিছু নেই! এটি নিতান্তই একটি গল্প, আর গল্পটি প্রায় আড়াই সপ্তাহ আগের। আড়াই সপ্তাহ পর গল্পটি আপনাদের সামনে উগড়ে দিচ্ছি কারণ, ওই আড়াই সপ্তাহ আমি ক্লিনিকবাসী ছিলাম।
নন্দিতাকে পেছনে ফেলে ডানে মোড় নিয়ে কদম কয়েক এগিয়ে বায়ের রেস্টুরেন্টে বসলাম। বহর দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওয়েটাররা ছুটে এলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের আশার মুখে ছাই দিয়ে আমার পাশের বন্ধু বেশ ভাব নিয়ে ‘হুকুম’ করলেন, ‘৪৭ বালতি চা লাগাও’! চায়ের কাপে ঠোঁট পোড়াতে পোড়াতে বন্ধুদের মুখগুলো একবার করে দেখে নেয়ার চেষ্টা করলাম। নাহ, আতঙ্কের কিছু নেই, সবার চেহারায় বেশ তৃপ্তিই হামাগুড়ি দিচ্ছে।
আমার পাশে বসা অনুজপ্রতিম কাওসারের কাছে জানতে চাইলাম, কেমন হলো? ‘দারুণ বড় ভাই, এক কথায় জোশ!’ ছোকরা পোলা, ভরসা রাখতে পারলাম না! পাওলি দামই তাঁর কাছে জোস হয়ে গেলো কিনা কে জানে! ডানে চায়ে মগ্ন তোফায়েল ভাইয়ের উপর প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলাম, তোফায়েল ভাই, কি দেখলেন? কিছু বলুন! ‘আর বলিস নে ভাই, ম্যালা কষ্টে সিনেমা দেখার অভ্যাসটা ছেড়েছিলাম, তুই আবার সেটায় ফিরিয়ে আনলি’! ভরসা পাইনা, বয়স্ক মানুষ! পাশের টেবিলে বন্ধু সজল, গলা বাড়িয়ে জানতে চাইলাম, কেমন দেখলি? ‘আরে শালা, তুই তো ব্রিটিশ! ওই সাদা চামড়াওয়ালারা যেমন বিনে পয়সায় চা খাইয়ে অভ্যাসে পরিণত করেছিলো, তুইও তো তাই করলি!’ জবাবে আমার পোড়া বুকটা ফুলতে শুরু করলো! ভাগ্যিস, টিশার্টে বোতাম ছিলোনা, থাকলে ওগুলো ছিঁড়ে যাবার আশঙ্কা ছিলো!
আপনারা কি ভাবছেন? কি নিয়ে এতো ভণিতা? না, ভণিতা না! গল্প বলছি। ব্যাপারটি কি ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে? তাহলে এখানেই দাড়ি টানি! তবে গল্পটা বলি।
বলছিলাম একজন হাসিবুর রেজা কল্লোল ও তাঁর ‘সত্তা’র কথা। হ্যাঁ, পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র ‘সত্তা’র কথাই বলছি। ‘সত্তা’র মুক্তির আগেই আমার কমিটমেন্ট ছিলো, সিলেটের বন্ধুরা ‘সত্তা’ দেখবেন আমার সাথে। কথা রাখতেই আদমবহর নিয়ে বসেছিলাম নন্দিতায়। যোগাযোগের শেষ পর্যায়ে ধারণা ছিলো ৫০-এর, শেষ পর্যন্ত ৪৭ জন নিয়েই বসলাম ৫০-এর আসনে। শুরুতেই বলেছি- বামে পাওলি দাম, ডানে শাকিব খান আর মাঝখানে হাসিবুর রেজা কল্লোল! ওটা ছিলো নেহায়েতই কল্পনা! এই মফস্বল শহরে ‘তিনাদের’ পা পড়েনা!
‘সত্তা’ হাসিবুর রেজা কল্লোলের বেশ আলোচিত সিনেমা। মুক্তির আগেই আলোচনায় উঠে আসা এই সিনেমা নিয়ে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ‘সত্তা’ পর্দায় আসবেতো? ‘সত্তা’ এলো, এবং জয় করলো দর্শক হৃদয়। ঢাকাই সিনেমার এই মন্দাকালে পরিচালক কল্লোল প্রযোজকের লগ্নি করা টাকা উঠিয়ে আনতে পারবেন কিনা-অনেকের মতো আমারও এমন সংশয় ছিলো। আবার ভরসাও ছিলো। লগ্নি করা টাকা উঠে এসেছে, জানিয়েছেন খোদ পরিচালক। আমার ভরসার যায়গাটা ছিলো পরিচালক কেন্দ্রিক।
‘সত্তা’র পরিচালক হাসিবুর রেজা কল্লোলকে জানি এক যুগেরও বেশি সময় থেকে। তাঁর-আমার মাঝে হৃদ্যতার কোন কমতি নেই। মানুষ হিসেবে যেমন অসাধারণ, শিল্প নির্মাতা হিসেবেও তেমন। ‘সত্তা’ পর্দায় আসার আগে ঢাকার এক সিনিয়র সাংবাদিকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ‘সত্তা’র সাফল্য নিয়ে। তাঁর জবাব ছিলো এরকম, ‘আপনি কল্লোলকে চিনেন না?’ কল্লোলের প্রতি তাঁর এই আস্থা আমাকে আপ্লুত করেছিলো। কল্লোল পারবেন, এ বিশ্বাসটা আমার মর্মে বদ্ধমূল ছিলো। হাসিবুর রেজা কল্লোলকে আমি যতোটা দেখেছি, তিনি আপাদমস্তক একজন শিল্পিত মানুষ। তাঁর আচার-ব্যবহার যেমন মার্জিত এবং নন্দিত, তেমনি তাঁর ভেতরটাও শিল্প শৈলীতে শিল্পিত আর প্রতিটি কাজ নান্দনিক। ঢাকাই সিনেমার বিরান প্রান্তরে কল্লোল তাঁর ‘সত্তা’ দিয়ে এক পশলা বৃষ্টি নামিয়েছেন- এ কথা অনায়াসেই বলা যায়।
‘সত্তা’র পর্দা কুশীলবদের অভিনয় নিয়ে পর্যালোচনা করার দুঃসাহস আমার নেই। তবে একজন মঞ্চকর্মী হিসেবে ছোট করে এ কথা বলতে পারি, আলোজ্বলমল রূপালী পর্দা যারা মাতিয়ে রাখেন তারা প্রত্যেকেই ‘সত্তা’য় নিজের শিল্পসত্তা উজাড় করে দিয়েছেন। সাহস করে আরেকটু গলা বাড়িয়ে বললে বলতে হবে, ‘সত্তা’র পরিচালক প্রতিজন কুশীলবদের ভেতরের সেরাটা আদায় করে নিয়েছেন আপন দক্ষতায়। ওপারের পাওলি দাম আর এপারের শাকিব খান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখেন।
‘সত্তা’র চরিত্র নির্বাচনে পরিচালক অসামান্য বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন বলেই আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। বাংলা চলচ্চিত্র পাড়ার দুই পাড়ের মাঝখানে ‘সত্তা’ স্বাপ্নিক সেতু হয়ে নতুন এক মেলবন্ধন ঘটিয়েছে, এ কথা বললে অত্যুক্তি হবেনা।
‘সত্তা’র প্রযোজক ও কাহিনীকার সোহানী হোসেনকে একজন কবি বলেই এতোদিন জেনে এসেছি। হালে তাঁকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের একজন সাহসী প্রযোজক বলেই আমি মনে করি। যখন ছায়াবাণীর বাজার দেশে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে, একে একে দ্বার বন্ধ করছে টকিজগুলো তখন মোটা অঙ্কের অর্থলগ্নি কোন সাধারণ ব্যাপার নয়। এ ক্ষেত্রে প্রযোজক হিসেবে সোহানী হোসেন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। একইভাবে কাহিনীকার হিসেবেও তিনি উৎরে গেছেন। বোধবুদ্ধি সম্পন্ন কাহিনীকার হিসেবে কোন চরিত্র বা বিষয়কে যেমন দর্শকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেননি, তেমনি বুদ্ধিমত্তার সাথে অশ্লীলতাকেও এড়িয়ে গেছেন। গল্পের প্রয়োজনে প্রধান নারী চরিত্রকে যখন ‘হটকেক’র মতো ব্যবহার করার সুযোগ ছিলো তখন কাহিনীকার এবং নির্মাতা সেই সুযোগকে পাশ কাটিয়ে তাঁর ভেতরের শিল্পীসত্তাকে শৈল্পিক ভাবে দর্শকদের সামনে উপহার দিয়েছেন।
কাহিনীকার সমাজের দৈনন্দিন বিষয়বস্তুকে এমনভাবে তুলে এনেছেন, যা প্রতিজন দর্শকের প্রতিদিনের গল্পের মতোই। দর্শক হলে বসে তাঁর নৈমিত্তিক বিষয়গুলোকেই পর্দায় দেখতে পেয়েছেন। বাংলা সিনেমা যখন পুরোই শরীরনির্ভর এবং দর্শক যখন নারী চরিত্রের দৈহিক সৌন্দর্যের হিল্লোল দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে টকিজ বিমুখ হয়েছেন, তখন ‘সত্তা’ নারীসত্তার অন্তর্গত সৌন্দর্যকে নিপুণভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করেছে। আর এর মাধ্যমে ‘সত্তা’ প্রমাণ করেছে, দর্শক দেহনির্ভর চলচ্চিত্র নয়, গল্পনির্ভর চলচ্চিত্রই পছন্দ করেন।
প্রতিদিনকার সমাজ ব্যবস্থা, সমকালীন বক্তব্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, মাদকসহ চলমান বিষয়গুলো চরিত্রানুযায়ী পর্দায় তুলে আনা হয়েছে সাদা চোখে দেখা মতোই। বিশেষত: খানিকটা সুচতুর দর্শক ‘টক শো’ কালচারকে ভিন্ন আমেজের বিনোদন (!?) হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কালকেউটের যে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, দর্শক তা অনুভব করেছেন পর্দার সামনে বসে। এ ক্ষেত্রে কোন চরিত্র বা বিষয়ই দর্শকের উপর আরোপ করা হয়নি।
‘সত্তা’র পরিচালককে কৌশলী বা সুচতুর বললে বোধ করি তা নিন্দিত হবেনা! একটি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের আদলে একটি মৌলিক চলচ্চিত্র, অথবা উল্টো করে বলা যায় মৌলিক চলচ্চিত্রের মোড়কে একটি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র কিভাবে দর্শকদের সামনে তুলে আনা যায়, তার একটি অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছেন পরিচালক! এবং এ পরীক্ষায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উৎরে গেছেন। শিল্পপারঙ্গম এই পরিচালক হালের চলচ্চিত্র দর্শকদের কাছে যেমন নিজেই তারকা হয়ে গেছেন, তেমনি আমাদের চলচ্চিত্র জগতে একটি ‘মাইলস্টোন’ হয়ে থাকবেন বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
‘সত্তা’ দর্শকসত্তায় তাঁর আপন ব্যঞ্জনায় নিনাদিত হবে, এমন বিশ্বাস আমি মর্মে ধারণ করি।
আপনার মন্তব্য