Advertise

শ্যামল কান্তি ধর

৩০ এপ্রিল, ২০২০ ০০:৪২

বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটক

করোনাকালীন অবকাশে গৃহবন্দী দর্শকদের জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশনে এক সময়ের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক "কোথাও কেউ নেই" এবং "বহুব্রীহি" প্রচারিত  হচ্ছে। এদুটো নাটক দেখতে বসে মন বার বার ফিরে যাচ্ছে সেইসব দিনের বিটিভির জনপ্রিয় নাটকের কাছে। এক এক করে যেন সব নাটকের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আহা! সেইসব ধারাবাহিক নাটক এইসব দিন রাত্রি, ঢাকায় থাকি, সংশপ্তক, শুকতারা, প্রতিশ্রুতি, সময় অসময়, জোনাকি জ্বলে, সকাল সন্ধ্যা, কোন কাননের ফুল, রূপনগর, অয়োময়, শঙ্খিত পদযাত্রা, আব্দুল্লাহ সহ আরো অনেক জনপ্রিয় নাটক।

এ সপ্তাহের নাটক, বিশ্বনাটক, হীরামন, কন্যা জায়া জননী- শিরোনামে যে নাটকগুলো প্রচারিত হত তা নির্মাণ ও মানের দিক দিয়ে ছিল উচ্চমানের। এইসব নাটক এক সময় বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে পশ্চিমবাংলা, ত্রিপুরা, আগরতলার বাংলাভাষীদের কাছেও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সাপ্তাহিক নাটকের মধ্যে  মনে পড়ছে দূরবীন দিয়ে দেখুন, বাবার কলম কোথায়, শেষ পৃষ্টায় দেখুন, বাঁচা, পারলে না রুমকি, কালো সুটকেস, এখন দুঃসময়, নিলয় না জানি, এখন জোয়ার, কি চাহ শঙ্খচিলসহ আরো অসংখ্য নাটক যার নাম লিখলে কয়েক পৃষ্ঠা হয়ে যাবে। প্রতিটি নাটকই ছিল সমান জনপ্রিয়। এইসব নাটকের কলাকুশলীরা ছিলেন মঞ্চনাটকের সাথে সংশ্লিষ্ট, তাই নাটক নির্মাণে ও অভিনয়ে ছিল মেধা ও যত্নের ছাপ। সিংহভাগ ইনডোর সেটে  নির্মিত সেইসব নাটকের প্রাণের কাছে বর্তমান কালের ফর্মুলা নাটকও নিস্প্রাণ, নিস্প্রভ। বর্তমান নাটকে ঝকঝকে ছবি আছে, আছে নিখুঁত বহিদৃশ্যায়ন কিন্তু গল্পটাই হারিয়ে গেছে। বিটিভির ইনডোর সেট কত যত্ন ও মেধার সমন্বয়ে করা হত তা আমরা প্রখ্যাত অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারের এক লেখাতে পেয়ে যাই।

ফেরদৌসী মজুমদার তার "অভিনয় জীবন আমার" বইতে এক জায়গায় লিখেছেন “ একটা টেবিলে "বরফ গলা নদীর" একটা মডেল সেট করা ছিল। মাঝে মধ্যে আমরা কলাকুশলীরা গভীর মনোযোগ দিয়ে সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম। আব্দুল্লাহ আল মামুনও শট নেওয়ার আগে একবার দেখতেন শটের খাতিরে– আর এখন? মডেল সেট তো দূরের কথা, কোন মহড়া নেই, নাট্যকারের প্রতি কোন সম্মান নেই, যার যা খুশী তাই বলে যাচ্ছে। আর নেপথ্যের কর্মীরা, আলো সেটের লোকেরা, সোজাসুজি কিছু না জেনেই ময়দানে নেমে পড়ছেন। কাজেই, মানসম্পন্ন নাটক দর্শক কী করে পাবেন!

বিজ্ঞাপন

”।

নব্বই দশকের আগ পর্যন্ত বিটিভির নাটকে গল্প ছিল, ছিল জীবনের নির্যাস। মধ্যবিত্ত সমাজ ড্রয়িংরুমের টেলিভিশন পর্দায় খুঁজে পেত তাদেরই জীবনের প্রতিফলন। গ্রামের মানুষ খুঁজে পেত তাদেরই জীবন কথা। কিন্তু এরপর রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক যে কারনেই হোক না কেন টেলিভিশন নাটকের মানে কিছুটা ভাটা পড়ে। হতাশ হয় দর্শক। তখনই শুরু হয় প্যাকেজ নাটকের যুগ। স্বাধীন নির্মাতারা তাদের মত করে গল্প বলার সুযোগ পান। আবার নির্মিত হয় উচ্চমানের কিছু নাটক। প্যাকেজ নাটকের কল্যানে দাঁড়িয়ে যায় অনেক প্রোডাকশন হাউজ। এদের মধ্যে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও ইনফ্রেম অন্যতম। অনেক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের প্রথম টেরিস্ট্রিয়াল টেলিভিশন একুশে টেলিভিশনের কল্যানেও আমরা পেয়ে যাই আরো কিছু মানসম্পন্ন নাটক। তার কারন একুশে টেলিভিশনের সাথে প্রথম থেকেই জড়িত ছিলেন কয়েকজন স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষ যারা বিটিভির স্বর্ণযুগের নাটক নির্মাণে জড়িত ছিলেন। একঝাঁক তরুণ পরিচালকের স্বপ্নচোখে নির্মিত হয় অসাধারন সব নাটক। এ ধারা অব্যাহত থাকে একুশে টেলিভিশন বন্ধ হবার আগ পর্যন্ত। তবে এনটিভি এবং তদপরবর্তী কয়েকটি চ্যানেলে প্রথম দিকে আরো কিছু ভালো, মানসম্মত নাটক প্রদর্শিত হয়। আমরা পেয়ে যাই কয়েকজন তরুন মেধাবী পরিচালক। সেই সময়ের কয়েকটা নাটকের নাম আমি উল্লেখ করতে চাই- গরম ভাত অথবা একটি নিছক ভুতের গল্প, তবু আঙ্গুরলতা নন্দকে ভালোবাসে, অপেক্ষায় বৃষ্টি কিংবা একটি গোল্ড ফিশের অপমৃত্যু, ঘোর, নাল পিরান, গহরগাছি, দ্বিচক্রযান ইত্যাদি। এই নামের তালিকাও দীর্ঘ করা যাবে। কিন্তু এই স্বল্প পরিসরে এটা সম্ভব না। আগামীতে এইসব নাটক নিয়ে আরো কিছু আলোচনার প্রয়াস থাকবে।

ধারাবাহিক নাটকের মধ্যে সেলিম আল দীন এবং মাসুম রেজার রচনায় এবং সালাউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় "রঙের মানুষ" ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। "রংমেহের" নামের এক গ্রামের সহজ সরল মানুষের জীবন নিয়ে নির্মিত এই নাটক গ্রামকেন্দ্রিক জীবন নিয়ে নাটক নির্মাণে আরেকটি নতুন ধারার সুচনা করে যা এখনো বহমান এবং নাটকের এই ধারাটি জনপ্রিয় হয়। আরো অনেকেই এগিয়ে আসেন একই ফর্মুলার নাটক নির্মাণে যদিও তা রঙের মানুষকে অতিক্রম করতে পারেনি। বৃন্দাবন দাস ও সালাউদ্দিন লাভলু জুটি বেশ কয়েকটি এই ধারার নাটক উপহার দেন যেখানে গ্রামের কিছু সমস্যার দিকে ঈঙ্গিত করা হয়েছে কিংবা তোলে ধরা হয়েছে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা কখনো হাস্যরসে, কখনো করুণ রসে। কখনো তোলে ধরা হয়েছে লুপ্ত হয়ে যাবার পথে কিছু গ্রামীন ঐতিহ্যের কথা। গাজীপুরের কয়েকটি গ্রাম এখন রীতিমতো সারা বছর ব্যস্ত থাকে এই রকম নাটকের শুটিঙে। তবে এক সময় দেখা গেল এই নাটকগুলোতেও আর চিরচেনা গ্রাম দেখা যায় না। অতিকথন ও অতিঅভিনয়, গল্প ও চিত্রনাট্যের দুর্বলতায় এই নাটকগুলোতেও একঘেয়েমি চলে এল। তবু একজন বৃন্দাবন দাসের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আরেকটি ধারাবাহিক নাটক "আলতা সুন্দরী"র কথাও বলা যায় যেখানে ধ্বংস হতে যাওয়া গ্রামের নিজস্ব সংস্কৃতির কথা সুনিপুনভাবে তোলে ধরা হয়েছে এবং এই নাটকটি দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন



মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে "ভাই বেরাদার" গ্রুপ নিয়ে আসে হাস্যরস নাটকের নতুন আরেক ধারা। "ছবিয়াল" এর ব্যানারে এই ধারার অধিকাংশ নাটক দেখলে মনের উপর হালকা প্রলেপ পড়ে, কিন্তু মনের গভীরে কোন দাগ ফেলে না। তবু এই ধরনের নাটক বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং একই সাথে সমালোচিত হয়। ফারুকীর নাটকের সংলাপে বাংলা ভাষার অপব্যাবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। বাংলাদেশের নাটকে প্রমিত বাংলা উচ্চারনের সংলাপে অভ্যস্ত দর্শক একটা ধাক্কা খায়। কিন্তু দর্শকরা এই ধাক্কা সামলে উঠেন এবং এক সময় অভ্যস্ত হয়ে যান এবং এই ধারার নাটক এখনো বহমান। ভুল কিংবা সঠিক যাই হোক, ফারুকীর দেখানো পথে এখন হাঁটছেন অনেকেই। একসময় ফারুকী মনোনিবেশ করলেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। আর "ভাই বেরাদার" নির্মাণ করতে লাগলেন তাদের নিজস্ব দর্শনের সব নাটক। এর মধ্যে কিছু ভালো নাটকও আমরা দেখতে পেলাম। কয়েকটির  নাম অবশ্যই বলতে হবে যেমন: টিনের তলোয়ার, উড়োজাহাজ,  স্পার্টাকাস ৭১, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, তালা, ঊন মানুষসহ আরো কয়েকটি ভালো মানের নাটক। ধারাবাহিক নাটকগুলোর মধ্যে ফারুকীর ৪২০ নাটকটি বেশ আলোচিত হয়। ৪২০ নাটকের মাধ্যামে ফারুকী ছোট পরিসরে বাংলদেশের রাজনীতিকদের উত্থান পতনের স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন এবং যথেষ্ট হাস্যরসের মাধ্যমে তিনি সফলও হয়েছেন।

এরপর বাড়তে থাকে আরো বেসরকারী টেলিভিশনের সংখ্যা। সাথে বাড়তে থাকে নাটকের সংখ্যা যার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে কমতে থাকে কিছু নাটকের মান। একসময় দর্শকরা ভারতীয় সিরিয়ালের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলো হারাতে থাকে দর্শক। ভারতীয় চ্যানেলে দেখা যায় বাংলাদেশের পন্যের বিজ্ঞাপন। নাটকের সাথে জড়িত কলাকুশলীরা পড়ে যান গভীর সংকটে। দর্শক ফেরাতে কয়েকটি টেলিভিশন আমদানি করে বাংলায় ডাবিংকৃত বিদেশী সিরিয়াল, নাটকের স্লট বিক্রি করে দেয় বিভিন্ন এজেন্সির কাছে। বংলাদেশের নাটক নিয়ে যেখানে আমরা গর্ব করতাম সেখানে ভারতীয় উদ্ভট সিরিয়ালের সাথে ক্রমশই হেরে যায় আমাদের প্রানের নাটক। এখন সন্ধ্যার পর প্রতি পরিবারে প্রায় আয়োজন করে সবাই দেখতে বসেন হিন্দি ও বাংলা সিরিয়াল। পারিবারিক কূটচাল যেসব নাটকের মুখ্য বিষয়। কিন্তু কেন এমন হলো?

কোন এক ঈদে দেখলাম একই সময়ে কয়েকটি চ্যানেলে একটি নাটকই প্রচারিত হচ্ছে। কি ব্যাপার? রাতারাতি কি এমন বিপ্লব ঘটে গেল! বুঝতে পারলাম, আসলে চ্যানেলগুলো এখন নাটকের চাঙ্ক বিক্রি করে দেয় এজেন্সির কাছে। অর্থাৎ নির্মাতারা আর সরাসরি চ্যানেলের কাছে নাটক দিতে পারবে না। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তা টেলিভিশনে প্রচারিত হবে। তাহলে টেলিভিশন চ্যানেলের স্বকীয়তা কোথায়? টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কি শুধুই একটা প্লাটফর্ম? এই ভাগ বাটোয়ারায় নির্মিত হতে থাকলো “রোমান্টিক কমেডি” নামের এক নতুন ধারা। যেখানে বাণিজ্যটাই প্রধান। ইউটিউব চ্যানেলে এইসব নাটকের লক্ষাধিক ভিউজ। চটুল প্রেম, অভিজাত পরিবার, নায়ক নায়িকার কমেডিয়ান বন্ধুর ভাঁড়ামো এইসব হচ্ছে মোটামুটি এই ধারার নাটকের কাহিনী। কোন নাটকে বারে বসে অবাধ মধ্যপান, সীসার সাদা ধোঁয়া, সুইমিং পুলের অবাধ সাঁতারের দৃশ্যেও দেখা যায়। নাটকের নামকরণের মধ্যেও নেই কোন শিল্প। এক্স, লোল, উগান্ডা, নাগর, ত্যাড়া এইসব বিশেষণ নাটকের নামের আগে পিছে লাগিয়ে বাড়ানো হয় ভিউজ!! একটা ফর্মুলার উপর দাঁড়িয়ে আছে এইসব রোমান্টিক কমেডি ধারার নাটক। এইসব নাটকের অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের এই ফর্মুলার নাটকের বাইরে কোন নাটকে দেখা যায় না। এখন কম বাজেটে তৈরী হয় সব ফরমায়েসী নাটক। মেধাবী পরিচালকরা এখন কিছুটা অসহায় ও সিস্টেমের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন বলে মনে হয়। হাসির নাটকের চাহিদা থাকায় নির্মিত হচ্ছে একের পর এক ভাঁড়ামোর নাটক যা মাঝে মাঝে অশ্লীলতার দোষেও দুষ্ট। এই সিস্টেমের চক্রের বাইরে কয়েকজন পরিচালক বেছে নিয়েছেন ওয়েব ভিত্তিক প্লাটফর্ম যেখানে অনেক ভালো ভালো নাটকও প্রচারিত হচ্ছে। গল্প ও নির্মাণের স্বাধীনতার জন্যও ভালো ভালো নির্মাতারা বেছে নিয়েছেন নতুন এই প্লাটফর্ম।

আমি লেখার প্রথমেই শুরু করেছিলাম "বহুব্রীহি"-এর কথা লিখে। বহুব্রীহি ছিল হাসির নাটক। একটি পরিবারের গল্প। মাসের দুই মঙ্গলবার রাত আটটার বাংলা সংবাদের পর প্রতি পরিবারের লোকজন বেশ আয়োজন করে বসতেন টিভি সেটের সামনে। আচ্ছা আমি বহুব্রীহিকে হাসির নাটক বললাম বটে, কিন্তু "বহুব্রীহি " কি নিছক হাসির নাটক? আসুন আমরা জেনে নেই এ সম্পর্কে নাটকটির রচয়িতা হুমায়ুন আহমেদের ভাবনার কথা। হুমায়ুন আহমেদ তার "এলেবেলে" নামক বইতে লিখেছেন- "মুল গল্প হাস্যরস প্রধান হলেও পাশাপাশি একটা করুণ স্রোত প্রবাহিত হবে। মাঝে মাঝে সেই স্রোত ব্যাবহার করা হবে। বিশেষ বিশেষ কিছু বক্তব্যও হাসি তামাসার ফাঁকেফাঁকে রাখা হবে। কিছু সত্যিকার সমস্যার প্রতিও ঈংগিত করা হবে। তবে সমস্যাগুলো নিয়ে বেশীদূর যাওয়া হবে না। সরকার প্রচারিত একটি মাধ্যমে সেই সুযোগও অবশ্যি নেই।" এবং হয়েছিলও তাই। হুমায়ুন আহমেদ টিয়াপাখির মুখ দিয়ে "তুই রাজাকার" বলিয়েছিলেন যখন বিটিভিতে "রাজাকার" শব্দটির উচ্চারণ প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল বলেই আমরা বহুব্রীহির শেষ পর্বের শেষ দৃশ্যে দেখতে পাই কেন্দ্রীয় চরিত্র সোবহান সাহেব (আবুল হায়াত) এমদাদ খোন্দকার (আবুল খায়ের) কে সাথে নিয়ে গ্রামে গ্রামে বেড়িয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা সংগ্রহের কাজে। আজকের এই "হাসির নাটক"এবং "রোমান্টিক কমেডির" যুগে বহুব্রীহি সব কলাকুশলীদের জন্য একটা ভাল রেফারেন্স। তবু এইসব সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেও কয়েকজন মেধাবী পরিচালক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। ফর্মুলা, ফরমায়েসী নাটকের ভেতর থেকেও তারা উপহার দিচ্ছেন কিছু ভালো নাটক। তাদের জন্য শুভ কামনা।

বিজ্ঞাপন



বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পও এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাড়িয়ে আছে। এভাবেই কি হারিয়ে যাবে বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকেরও ঐতিহ্য? প্রযোজক সমিতি, অভিনেতা অভিনেত্রীদের সংগঠন অভিনয় শিল্পী সংঘ, পরিচালকদের সংগঠন ডিরেকটরস গিল্ড প্রতিনিয়ত চিন্তা করে যাচ্ছেন সমস্যা থেকে উত্তরনের পথ। আমি টিভি নাটকের সামান্য একজন দর্শক হিসাবে নিম্মলিখিত কিছু বিষয়ের উপর আলোকপাত করতে চাই।

১)বাংলাদেশ নাটকের এই সংকটে রুচিসম্পন্ন নাটকের চিত্রনাট্যের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত স্বল্প পরিসরে অনুদান প্রথা চালু করার বিষয়টি চিন্তা করা যেতে পারে। যেহেতু ভালো নাটক নির্মানের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবকে নির্মাতারা একটা বড় প্রতিবন্ধকতা হিসাবে দেখছেন।

২) ভালো নাটকের প্রচারের জন্য বিটিভি হতে পারে একটি বড় প্লাটফর্ম। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বর্নযুগের নাট্য প্রযোজকদের নিয়ে একটি পরামর্শক বোর্ড গঠন করা যেতে পারে।

৩) শুধু নাটক প্রচারের জন্য একটা চ্যানেল চালু করা জরুরী। শুধু নাটকের চ্যানেল দিয়ে যদি পার্শবর্তী দেশের চ্যানেল এত জনপ্রিয় হয়। তাহলে আমাদের দেশে তা কেন সম্ভব নয়।

৪) নাটকের বাজেট ও বিপণন, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে।

৫)বাংলাদেশের মঞ্চ ও টেলিভিশনের প্রতিথযশা সিনিয়র নাট্যকার, পরিচালক, প্রযোজক, ও অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের সমন্বয়ে একটি  কমিটি গঠন করা যেতে পারে যারা বাংলাদেশ নাটকের সংকট ও উত্তরনের উপায় নিয়ে একটি সুপারিশ উপস্থাপন করবেন এবং এই সুপারিশ মালার আলোকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর/মন্ত্রনালয় নির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহন ও কার্যকর করবে। নাট্যজগতের অভিভাবকতুল্য গুনী নাট্যকার, অভিনেতা, পরিচালকদের মধ্যে থেকে খুব সহজেই এ কমিটি গঠন করা যায়।

৬) ভারতে আমাদের দেশের চ্যানেলগুলো প্রচারের ব্যবস্থা করা উচিত অন্তত বাংলাভাষী রাজ্যগুলোতে।

৭) বাংলা সাহিত্যের ছোট গল্প, উপন্যাস থেকে নাটক নির্মাণের উদ্যেগ নিতে হবে।

৮)বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক কেচ্ছা কাহিনী। এইসব কেচ্ছা কাহিনী থেকে খুব সহজেই নাটক নির্মাণ করা যেতে পারে। তাতে নাটকে বৈচিত্র্য আসবে। এইসব কেচ্ছা কাহিনী নিয়ে " ভাটির নাটক" শিরোনামে সিরিয়াল করা যেতে পারে। আমরা স্মরণ করতে পারি বিটিভির "হীরামনের " লোকনাটকগুলো।

৯)শিশু কিশোরের উপযোগী নাটক নির্মানে গুরুত্ব দিতে হবে।

১০) যেহেতু বাংলাদেশে টিভি নাটকের রয়েছে এক বিশাল বাজার এবং সামনে আরো কয়েকটি টিভি চ্যানেল আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই টিভি নাটকের জন্য একটা আলাদা ইন্সটিটিউট স্থাপন করতে হবে এবং টিভি নাটক নির্মানকে  ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে মুল্যায়িত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। কে জানে, এখন যেভাবে আমরা আমদানিকৃত বিদেশী সিরিয়াল প্রচার করছি একদিন হয়তো আমাদের দেশের নাটক বাইরের দেশে রপ্তানী করা যাবে।

১১)বিটিভির স্বর্ণযুগের নাটকগুলো বিটিভি সহ অন্যান্য বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারের ব্যবস্থা করা কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে কোন কোন নাটক পুণনির্মান করে নতুন প্রজন্মের জন্য প্রচার করা যেতে পারে।

গ্রামে গ্রামে এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। এখন খুব কম ঘর পাওয়া যাবে যেখানে টিভি সেট নেই। আমরা নাটক নির্মাণের সময় ভুলে যাই সেই কৃষকের কথা, যে সারাদিন খেত চাষ করে সন্ধ্যায় বসে তার নিজের বাড়ীর টিভি সেটের সামনে, কিংবা পাশের বাড়ীতে অথবা গ্রামের মুদির দোকানে। তিনিও আমাদের দর্শক। নাটকের দর্শক তো শুধু অভিজাত শ্রেণির তরুণ সমাজ নয়। সবকিছুর পর ঘুরেফির আসতে হবে দর্শকের কাছেই কারন দর্শকরাই নাটকের প্রাণ।

প্রিয় পাঠক, তাই আমি একজন দর্শক হিসাবে আপনাদের কাছে সবিনয় নিবেদন এই যে, অনুগ্রহ করে ভারতীয় সিরিয়ালের ফাঁকে ফাঁকে একবার ঘুরে আসেন আপ নার নিজের দেশের চ্যানেলে। হয়তো পেয়ে যাবেন আপনার কাঙ্খিত সেই নাটক। যা আপনার অবসর সময়কে রাঙিয়ে তুলবে, আপনাকে ভাবাবে। আমাদের ছিলেন, আছেন তুখোড় শক্তিমান সব অভিনেতা, অভিনেত্রী। আমাদের এখনো আছেন একজন মামুনুর রশীদ, আলী যাকের, ফেরদৌসী মজুমদার, আবুল হায়াত, ইনামুল হক, রাইসুল ইসলাম আসাদ, রামেন্দু মজুমদার, সারা যাকের, তারিক আনাম খান, লাকি ইনাম, ডলি জহুর, আফজাল হোসেন, সুবর্না মুস্তফা, সহ আরো অনেক সিনিয়র গুনী অভিনেতা/অভিনেত্রী যারা টেলিভিশন নাটককে একটা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছিলেন। আমাদের এখনো আছেন তৌকির আহমেদ, বিপাশা হায়াত, ফজলুর রহমান বাবু, শহিদুজ্জামান সেলিম সহ আরো অনেক তুখোড় অভিনেতা/অভিনেত্রী যারা শুধু জনপ্রিয়তার নিরিখে শিল্পী নয়, যাদের আছে নিজস্ব শিল্প ভাবনা, তারা ধারন করেন সামাজিক দায়বদ্ধতা তারা তাদের অগ্রজদের দেখিয়ে দেয়া পথ ধরে বাংলাদেশের টিভি নাটককে নিয়ে গিয়েছিলেন অনেকদূর। এই প্রজন্ম সেই পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারে না। বাংলাদেশ টিভি নাটকের সুদিন আবার আসবেই। নতুনদের জয়গান একদিন গাইবই।

পরিশেষে একটি কথা:

বর্তমানে করোনাকালীন সময়ে টিভি নাটকের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। দুই ঈদ উপলক্ষে অনেক নাটক নির্মাণ হয়। সৃষ্টি হয় বিশাল এক নাটকের বাজার কিন্তু করোনা ঘাতকের কারনে নাটক সংশ্লিষ্ট অনেক কলাকুশলী এখন বেকার হয়ে গেছেন। ডিরেক্টর গিল্ডস, অভিনয় শিল্পী সংঘ এ ব্যাপারে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যারা আমাদের অবসর সময়ের বিনোদন দেন, আমাদের হাসান, কাঁদান তাদের নীরব কান্না কি আমরা শুনতে পাচ্ছি?

শ্যামল কান্তি ধর: ব্যাংকার।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত