২২ এপ্রিল, ২০১৬ ০৯:১৪
ভেজাল ও নিুমানের ওষুধ তৈরির দায়ে প্রস্তুতকারী ২০ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আরও ৩৮ কোম্পানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সাজার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যেই ওষুধ কোম্পানির সনদ বাতিলসংক্রান্ত কাজ শেষ হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গণমাধ্যমে জানান, ২০টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভেজাল ও নিুমানের ওষুধ তৈরি করে এমন প্রতিষ্ঠানের ওষুধ উৎপাদন করার কোনো অধিকার নেই। এছাড়া সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অন্যান্য ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অবিলম্বে এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি।
দেশে তৈরি ওষুধের মান পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একটি বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করে ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। এর সদস্যরা ৮৪টি ওষুধ কোম্পানির কারখানা সরেজমিন পরিদর্শন শেষে সংসদীয় কমিটির কাছে রিপোর্ট পেশ করেন।
এতে উল্লেখ করা হয়, ২০টি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ওষুধে নিুমানের কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়। উৎপাদন প্রক্রিয়াও মানসম্পন্ন নয়। এর আগে দু’দফা এসব কোম্পানিকে সতর্ক করা হয়। কিন্তু তারা মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়।
সংসদীয় কমিটি এ রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নমান ও ভেজাল ওষুধ তৈরির সঙ্গে জড়িত ২০ প্রতিষ্ঠানের সনদ বাতিলের সুপারিশ করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ সুপারিশের ভিত্তিতেই লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- এক্সিম ফার্মাসিউটিক্যাল, এভার্ট ফার্মা, বিকল্প ফার্মাসিউটিক্যাল, ডলফিন ফার্মাসিউটিক্যাল, ড্রাগল্যান্ড, গ্লোব ল্যাবরেটরিজ, জলপা ল্যাবরেটরিজ, কাফিনা ফার্মাসিউটিক্যাল, মেডিকো ফার্মাসিউটিক্যাল, ন্যাশনাল ড্রাগ, নর্থ বেঙ্গল ফার্মাসিউটিক্যাল, রিমো কেমিক্যাল, রিদ ফার্মাসিউটিক্যাল, স্কাইল্যাব ফার্মাসিউটিক্যাল, স্পার্ক ফার্মাসিউটিক্যাল, স্টার ফার্মাসিউটিক্যাল, সুনিপুণ ফার্মাসিউটিক্যাল, টুডে ফার্মাসিউটিক্যাল, ট্রপিক্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল এবং ইউনিভার্সেল ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড।
এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কেউ কেউ ভেজাল ও নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে ক্যান্সারের মতো মরণঘাতী রোগের ওষুধ তৈরির পর বাজারজাত করেছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (জনস্বাস্থ্য ও বিশ্ব স্বাস্থ্য) রুকসানা কাদের বলেন, আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে ২০ প্রতিষ্ঠানের সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। এছাড়া আরও ৩৮টি কোম্পানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সাজার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে। তিনি বলেন, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর যথাসময়ে ওই ২০টি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মন্ত্রণালয়কে নিশ্চিত করবে।
জানা গেছে, ওই ৩৮টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন করতে পারবে না। ২২টি প্রতিষ্ঠান পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন করতে পারবে না। এছাড়া দুটি কোম্পানি মানবদেহে বাহ্যিকভাবে ব্যবহৃত ওষুধ তৈরি করতে পারবে না। এ ৩৮টি কোম্পানির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংসদীয় কমিটি সুপারিশ করে।
নন-পেনিসিলিন, পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপের ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করা ১৪টি কোম্পানি হচ্ছে- আদ-দ্বীন ফার্মাসিউটিক্যাল, আলকাদ ল্যাবরেটরিজ, বেলসেন ফার্মাসিউটিক্যাল, বেঙ্গল ড্রাগস, ব্রিস্টল ফার্মা, ক্রাইস্ট্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যাল, মিল্লাত ফার্মাসিউটিক্যাল, এমএসটি ফার্মা, অরবিট ফার্মাসিউটিক্যাল, ফার্মিক ল্যাবরেটরিজ, পনিক্স কেমিক্যাল, রাসা ফার্মাসিউটিক্যাল এবং সেভ ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড।
এছাড়া পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন গ্রুপের ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করা ২২টি কোম্পানি হচ্ছে- আমিকো ফার্মাসিউটিক্যাল, অ্যাজটেক ফার্মাসিউটিক্যাল, বেঙ্গল টেকনো ফার্মা, বেনহাম ফার্মাসিউটিক্যাল, সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যাল, ডিসেন্ট ফার্মা, ড. টিআইএম’স ল্যাবরেটরিজ, গোবেক্স ফার্মাসিউটিক্যাল, গ্রিনল্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল, ইনোভা ফার্মাসিউটিক্যাল, মাকস ড্রাগস, মেডিম্যাট ল্যাবরেটরিজ, মডার্ন ফার্মাসিউটিক্যাল, মাইস্টিক ফার্মাসিউটিক্যাল, ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিজ, অর্গানিক হেলথ কেয়ার, ওয়েস্টার ফার্মা, প্রিমিয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল, প্রাইম ফার্মাসিউটিক্যাল, সীমা ফার্মাসিউটিক্যাল, ইউনাইটেড কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল এবং হোয়াইট হর্স ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড।
বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি এ ৩৮টিসহ ৮৪টি প্রতিষ্ঠান একাধিকবার সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তাদের রিপোর্টে। এতে বলা হয়, বাইরে থেকে দরজা তালাবদ্ধ করে রেখে কারখানার ভেতরে ভেজাল ওষুধ উৎপাদন করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধও এভাবেই তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
এ রিপোর্টে আরও বলা হয়, ডব্লিউএইচওর ‘উত্তম উৎপাদন কৌশল’ অনুসরণ না করে ওষুধ উৎপাদন করলে সেগুলো অবশ্যই নিুমানের হবে। এসব ভেজাল ও নিুমানের ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ সেবন করলে রোগ না সেরে উল্টো বাড়তে পারে। মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক হতে পারে। এমনকি হঠাৎ কিডনি বিকল হয়ে রোগীর মৃত্যু ঘটারও আশংকা থাকে।
নব্বই দশকজুড়ে ভেজাল ও বিষাক্ত প্যারাসিটামল সেবনের ফলে কয়েক হাজার শিশু কিডনি বিকল হয়ে মারা গিয়েছিল। নামসর্বস্ব কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এসব প্যারাসিটামল উৎপাদন করেছিল। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট দেখেই সরকার ভেজাল ও নিুমানের ওষুধ তৈরির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনুয়ারুল ইসলাম বলেন, যারা খারাপ ওষুধ তৈরি করে জনগণকে ধ্বংস করছে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম যত দ্রুত বন্ধ করা যায় ততই মঙ্গল। তিনি বলেন, এসব কোম্পানির উৎপাদিত যেসব ওষুধ এখনও বাজারে আছে সেগুলো অবিলম্বে উঠিয়ে নিতে হবে। এজন্য অধিদফতরকে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অধ্যাপক আনুয়ারুল ইসলাম বলেন, শুধু এ ২০টি কোম্পানি বন্ধ করলেই হবে না। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে কেউ করতে না পারে সেজন্য একটি স্বাধীন কমিটি বা কমিশন রাখতে হবে। দেশে মানসম্পন্ন ওষুধ নিশ্চিতে এটা একটা ফার্মাসিটিক্যাল প্রসেস। এটা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।
আপনার মন্তব্য