১০ জুলাই, ২০২৬ ১৫:১০
ভারতে নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি এবং তার দলের সিনিয়র নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন এবং দেশে ফিরে তারা আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তার এই পরিকল্পনার কথা জানান। রয়টার্সের এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কৃষ্ণা এন দাস।
২০২৪ সালে আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়ার পর এটিই সংবাদমাধ্যমে দেওয়া তার প্রথম কোনো সরাসরি সাক্ষাৎকার। এর আগে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় তিনি কেবল সংবাদমাধ্যমগুলোর লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী শাসক বলেছেন যে তিনি এবং তার দল আওয়ামী লীগের সদস্যরা দুই বছর আগে যে দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন, সেখানে স্বেচ্ছায় ফিরে যাবেন এবং আদালতে হাজির হবেন। তিনি বলছেন, তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাদের প্রতি কেমন আচরণ করেন, এটা তারা পরীক্ষা করতে চান।
“আমার ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি তারা আমাকে মেরেও ফেলতে পারে,” গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চলা প্রায় এক ঘণ্টার এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।
“তবুও আমাকে যেতে হবে,” তিনি বলেন। “আমার দলের নেতা ও কর্মীরা চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মৃত্যু যদি আসেও, তবু আমি চাই তা আমার নিজের মাটিতে আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছে।”
নির্বাসনের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন
২০২৪ সালে আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা তার একাধিক মেয়াদে ২০ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে যান। ছাত্র নেতৃত্বাধীন একটি আন্দোলনে প্রাণঘাতী দমনপীড়নের নির্দেশ দেওয়ার জন্য গত নভেম্বরে দেশটির যুদ্ধাপরাধ আদালত তার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। নির্বাসনে থেকে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পোশাক রপ্তানিকারক এই দেশটিতে তার প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করতে পারে, যেখানে ঢাকা সরকার দুই বছরের উথাল-পাথালের পর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, এটি ভারতের সাথে তৈরি হওয়া সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে পারে, যা নয়াদিল্লি তাকে আশ্রয় দেওয়ার পর মারাত্মক রূপ নিয়েছিল।
বাংলাদেশ বারবার ভারতকে তাকে প্রত্যর্পণ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
শেখ হাসিনা, যিনি নির্বাসনে থাকা অবস্থায় সংবাদমাধ্যমগুলোর লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও এর আগে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি, তিনি বলেছেন যে দেশে ফেরার বিষয়ে বা কবে ফিরবেন সে ব্যাপারে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সাথে পরামর্শ করেননি।
এটিই প্রথমবার যেখানে তিনি তার ফেরার একটি সময়সীমা নির্ধারণ করলেন, আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনার কথা জানালেন অথবা বললেন যে অন্যান্য নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারাও তা-ই করবেন। তাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। রয়টার্স দলের অন্য সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করতে বা তারা কোথায় আছেন তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
ঢাকার কর্তৃপক্ষ “আমাকে ফেরত নিয়ে যেতে চায়, তারা আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে বারবার চিঠি পাঠাচ্ছে,” তিনি বলেন। “আমি নিজেই চলে যাব।”
শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্ররা কোনো সাড়া দেননি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। গত এপ্রিলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে তারা শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করার বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ পরীক্ষা করে দেখছে এবং তারা “নতুন সরকারের সাথে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায়”।
একসময়ের গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ
একটি সামরিক অভ্যুত্থানে তার পিতা, যিনি স্বাধীনতার নেতা ছিলেন, এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পর স্পটলাইটে আসা শেখ হাসিনা অর্ধ শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী চরিত্র ছিলেন।
তিনি প্রথম জীবনে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন এবং ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশটির অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কৃতিত্ব তাকে দেওয়া হতো, কিন্তু তার দীর্ঘ শাসনকাল এই অভিযোগের জন্ম দেয় যে তার সরকার ভিন্নমত দমন করেছে এবং গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য ভেঙে ফেলেছে—যেসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, যে দমনপীড়নের ফলে তার পতন ঘটেছিল, তাতে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়।
দিল্লির নির্বাসনের নিবাস থেকে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে এবং অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি যে এবার আমি বাড়ি ফিরছি, এবং একদিন আপনাদের সবাইকে আসতে হবে। সবাই মিলে একসাথে আমরা আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”
তিনি তার ফেরার সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা ঠিক কখন এবং কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তা জানাতে চাননি।
“আমি বিচারে বিশ্বাস করি এবং আমি মনে করি যখন আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে, তখন মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক—আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।”
'জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন,' বললেন হাসিনা
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী গ্রেপ্তার, আইনি মামলা এবং শারীরিক হামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ফেরার পরিকল্পনার বিষয়ে ঢাকার সাথে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি। “গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার—এগুলো কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয়।”
তিনি বলেন যে তিনি জেলে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত নন এবং উল্লেখ করেন যে এর আগেও তিনি কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
১৯৭৫ সালে তার পিতার হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় তিনি বারবার আটক হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে একটি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে তিনি আবারও কারাবরণ করেন, এরপর মুক্তি পেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
এবার তার দেশ ছাড়ার পেছনে কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, মানুষ যখন তার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন তার জীবনের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, “যখন একটি সরকার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন ভুল হতে পারে—কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।”
শেখ হাসিনা জানান যে, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাদের সাথে অনলাইনে বৈঠক করেছেন।
তিনি বলেন, “তারা হয়তো আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত করা হবে? আমরা যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তবে জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন।”
আপনার মন্তব্য