১১ জুলাই, ২০২৬ ০০:৫৪
শুক্রবার হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে দর্শনার্থীদের ভিড়
৭০০ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো আজ শনিবার সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হবে। আজ দুপুর ১২ টায় মাজার প্রাঙ্গণে এ টাকা গণনা করা হবে।
বৃহস্পতিবার সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন মাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত কমিটির প্রথম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা নির্ধারণে গঠিত কমিটির ব্যবস্থাপনায় এবার দানের টাকা গণনা করা হবে। এতে সহযোগীতা করবে শাহজালাল (রহ.) মাজার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা।
এরফলে প্রথমবার গণনার ১৯ দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো প্রকাশ্যে গণনা করা হবে এই মাজারের টাকা।
এর আগে গত ১২ জুন সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.) এর মাজার পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসেবে গত ১৮ জুন বিকালে মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দানের অর্থ রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেক ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়।
এরপর গত ২২ জুন ৭শ বছরের প্রথা ভেঙে মাজারের ঐতিহাসিক ডেক ও দানবাক্স খোলা হয়েছিল। সেদিন গণনা শেষে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া যায়, যা সোনালি ব্যাংকের একটি নতুন অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হয়।
এদিকে, এ ঘটনার পর জেলা প্রশাসকের পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। কেউ জেলা প্রশাসকের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেন। আবার প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপনের বিষয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ রকম আলোচনা-সমালোচনা চলাকালেই সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। যদিও সরকারের একাধিক মন্ত্রী জেলা প্রশাসক বদলির ঘটনাকে ‘রুটিন ওয়ার্ক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এরপর গত ২৬ জুন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। কমিটিকে এক মাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক ও কার্যকর কাঠামোর সুপারিশ প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে প্রধান করে গঠিত কমিটির অপর সদস্যরা হলেন- সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসক রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম, সিলেটের ডিআইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, মাজারের মতোয়াল্লি পরিবারের দুই সদস্য, মাজার মাদ্রাসা ও মসজিদের দুই প্রতিনিধি। এই কমিটির সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন জেলা প্রশাসক।
মাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সৃষ্ট আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহারের পর এবার নতুন গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে ফের এই গণনা ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হতে যাচ্ছে। এবারের গণনাকৃত অর্থও জেলা প্রশাসকের সোনালী ব্যাংকের সেই নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হবে।
মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গঠিত কমিটি বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউসে প্রথম বৈঠকে বসে।এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সদস্য ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
সভায় মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসা পরিচালনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিভিন্ন বিষয়ে কয়েকটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও সেগুলো আগামী সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, কমিটির আহ্বায়ক রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে সভায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং মাজারের সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী বৃহস্পতিবার কমিটির দ্বিতীয় সভা একই স্থানে অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় মাজারের ভবিষ্যৎ আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশ-বিদেশে অবস্থানরত হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর ভক্ত-অনুরাগীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কমিটির ওপর আস্থা রাখুন। আমরা সবার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে মাজারের স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কাজ করছি।
সিসিক প্রশাসক আরও জানান, শনিবার (১১ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে মাজারের দানবাক্সের অর্থ গণনা শুরু হবে। কমিটির সদস্য, মাজার কর্তৃপক্ষ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। গণনাকারীরা কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্ধারিত স্থান ত্যাগ করতে পারবেন না।
তিনি বলেন, গণনা শেষে সংগৃহীত অর্থ জেলা প্রশাসকের নামে নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে।
কমিটির সদস্য ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, দরগাহ, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং মাজারকেন্দ্রিক কার্যক্রমে কীভাবে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সভায় ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিক কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবারের সভায় সেগুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী, সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, কমিটির সদস্যসচিব ও সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক, শাহজালাল (রহ.) দরগাহ শরীফের সরেকওম ফতেহ উল্লাহ আল আমান ও খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না, দরগাহ জামে মসজিদের সেক্রেটারি মুফতি এম এ হাসান ও জামেয়া কাসিমুল উলুম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মওলানা মাসুক উদ্দিন।
আপনার মন্তব্য