নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩ আগস্ট, ২০২১ ২১:৩৫

মিরপুরে নাসুমদের হাতে অস্ট্রেলিয়া-বধ কাব্য

জৈব সুরক্ষা বলয়, নানা দাবিদাওয়া, বিধিনিষেধ- ম্যাচ শুরুর আগে এমনই ছিল আলোচনা। সবখানেই একপাক্ষিকভাবে অস্ট্রেলিয়ার দাবিদাওয়া, আর বাংলাদেশ যেন বসেছিল সফরকারীদের নানামুখী আবদার মেটাতে। মাঠের ক্রিকেটের আগে মাঠের বাইরের ক্রিকেটে কোণঠাসা বাংলাদেশ দিলো কি মোক্ষম জবাব! মাঠে নেমে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে শ্রেয়তর দল হিসেবে বাংলাদেশ বিজয়ী বেশে মাঠ ছাড়ল। আর এর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মত কোন টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জেতা হলো মাহমুদুল্লাহ অ্যান্ড কোংয়ের!

এরআগে অবশ্য ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ হারালেও আগে খেলা চার ম্যাচে শেষ হেসেছিল অস্ট্রেলিয়া। পঞ্চমবারের মত মুখোমুখি হওয়া ম্যাচে জিতল বাংলাদেশ। নাসুম-সাকিবদের হাতে লিখা হলো অস্ট্রেলিয়া-বধ কাব্য। সিলেটের নাসুম আহমদের বোলিংয়ে সফরকারী অস্ট্রেলিয়াকে ২৩ রানে পরাজিত করে টাইগাররা।

প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ১৩১। তবে এই মাঝারি সংগ্রহও পাড়ি দিতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের বোলিং দাপুটে তারা থেমে যায় ১০৮ রানে। এটা টি২০ তে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রথম জয়।

ক্যাঙ্গারুদের প্রথমবারের মতো পরাজিত করার এই লড়াইয়ে অগ্রণী সৈনিক ছিলেন সিলেটের তরুণ নাসুম আহমদ। তার ঘুর্ণিতেই কপোকাত হয়ে যায় অজিরা। নির্ধারিত ৪ ওভার বোলিং করে ১৯ রানের বিনিময়ে নাসুম তুলে নেন ৪ উইকেট। তার শেষ স্পেলটা ছিলো দারুণ, ২-০-৬-২!

মিরপুরের শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথমে টসে হেরে ব্যাটিংয়ে নামে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের বাহিনী। অভিজ্ঞ ও পরিক্ষীত তামিম, মুশফিক ও লিটনকে ছাড়াই ২২ গজে ব্যাটিংয়ের চ্যালেঞ্জে নেমে ১৩১ রান তোলে বাংলাদেশ।

শুরুতেই সৌম্যকে হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়া বাংলাদেশকে পথে রাখেন ওপেনার নাইম ও সাকিব আল হাসান। ২৯ বলে ৩০ রানের ইনিংস উপহার দিয়ে ফেরেন নাইম। আর ৩৩ বলে সাকিবের ৩৬ রানে রানের ধারা অব্যাহত রাখে টাইগাররা। পরে তার বিদায়ের পর ২০ বলে ২০ রান করে সাজঘরে ফেরেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ।

অল্প রানের পুঁজি নিয়েও ইনিংসের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার উপর চড়াও হন নাসুম, মেহেদী ও সাকিব। পরে মিশেল মার্শ প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের দাপটের কাছে পাত্তা পায়নি অস্ট্রেলিয়া। শুরুর দাপটটা ধরে রাখলেন নাসুম, মোস্তাফিজুর ও শরিফুল ইসলামরা। ছোট্ট পুঁজি নিয়েও মিরপুরে তারা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিয়েছে ২৩ রানে।

অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য মাত্র ১৩২ রানের। সফরকারী দলকে চাপে ফেলতে স্পিন দিয়ে আক্রমণ শুরু করেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। প্রথম বলেই সাফল্য এনে দেন মাহেদি হাসান, বোল্ড করেন অ্যালেক্স কারেকে (০)।

পরের ওভারে নাসুম আহমেদের ঘূর্ণি ডেলিভারি কিছুটা এগিয়ে খেলতে গিয়ে জশ ফিলিপ (৫ বলে ৯) হন স্ট্যাম্পিং। বল পেয়ে চোখের পলকে স্ট্যাম্প ভেঙে দেন নুরুল হাসান সোহান।

তৃতীয় ওভারে আরও এক উইকেট। এবার সাকিব আল হাসান নিজের প্রথম বলেই বোল্ড করেন ময়েসেজ হেনড্রিকসকে (১)। বাঁহাতি এই স্পিনারের বল সুইপ করতে গিয়ে নিজেই টেনে নিয়ে উইকেট হারান হেনড্রিকস। ১১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকে অস্ট্রেলিয়া।

বিপদ বুঝে খেলার ধরন পাল্টে ফেলেন ম্যাথু ওয়েড আর মিচেল মার্শ। ঝুঁকিপূর্ণ শট না খেলে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে থাকেন তারা, রানরেটের কথা না ভেবে।

শেষ পর্যন্ত তাদের ৪৫ বলে ৩৮ রানের জুটি ভেঙেছেন নাসুম। যদিও খুব ভালো বল ছিল না, পেছনের দিক দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল। বাজে সেই বলটিতে কি মনে করে ব্যাট লাগিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক ম্যাথু ওয়েড (২৩ বলে ১৩)। শর্ট ফাইন লেগে সহজ ক্যাচ নেন মোস্তাফিজুর রহমান।

এরপর নাসুমের আরও এক উইকেট, এবার অ্যাশটন অ্যাগার। সেই উইকেট পেতেও অবশ্য ভাগ্য কাজে দিয়েছে টাইগার বাঁহাতি স্পিনারের। বল পিছিয়ে খেলতে গিয়ে নিজের পায়েই স্ট্যাম্প মারিয়ে দেন অ্যাগার। হিট উইকেট হন ৭ করে।

দলের ব্যাটসম্যানদের এ আসা যাওয়ার মিছিলে একটা প্রান্ত ধরে ছিলেন মিচেল মার্শ। শেষ পর্যন্ত সেই কাঁটাও সরিয়েছেন দারুণ বোলিং করা নাসুম। স্লগ সুইপ করতে গিয়ে শরিফুলের দারুণ এক ক্যাচ হন মার্শ (৪৫ বলে ৪৫)। ৮৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছে তখনই।

১৯তম ওভারে এসে অ্যান্ড্রু টাই আর অ্যাডাম জাম্পাকে জোড়া শূন্যতে ফেরান শরিফুল। তার আগের ওভারে মোস্তাফিজ এক্সট্রা কভারে মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ বানিয়েছিলেন অ্যাশটন টার্নারকে (৮)। শেষ ওভারে স্টার্ককে বোল্ড করেছেন কাটার মাস্টার ফিজ, তাতেই অস্ট্রেলিয়া এক বল বাকি থাকতে অলআউট ১০৮ রানে।

অসিদের এই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটানোর মূল কারিগর নাসুম আহমেদ। ৪ ওভারে মাত্র ১৯ রান দিয়ে ৪টি উইকেট শিকার করেন এই বাঁহাতি স্পিনার। মোস্তাফিজ আর শরিফুলও নেন দুটি করে উইকেট।

এর আগে অসি বোলাররা সেভাবে হাত খুলে খেলতে দেননি বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদেরও। নাইম শেখ, সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদরা রান পেলেন বটে। কিন্তু সেটা ঠিক টি-টোয়েন্টি ধাঁচের ব্যাটিংয়ে নয়। শেষদিকে আফিফ হোসেন ধ্রুব কিছুটা চালিয়ে খেলে ৭ উইকেটে ১৩১ পর্যন্ত নিয়ে গেছেন দলকে।

টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই অসি বোলারদের চাপের মুখে ছিল বাংলাদেশ। আত্মঘাতী হয়ে সাজঘরে ফেরেন সৌম্য সরকার। রীতিমত হাসফাঁস করছিলেন উইকেটে, শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনেন বাঁহাতি এই ওপেনার।

জশ হ্যাজলেউডের বলটি বানিয়ে মারতে গিয়েছিলেন, কাট করে সেটি নিজের উইকেটেই টেনে আনেন। ইনিংসের চতুর্থ ওভারের তৃতীয় বলের ঘটনা। সৌম্য ৯ বলে করেন মাত্র ২ রান।

সৌম্য ফেরার পর নাইম শেখ মোটামুটি ভালো খেলছিলেন। মিচেল স্টার্ককে ফ্লিক করে বড় এক ছক্কাও হাঁকিয়েছিলেন। কিন্তু পরে আবার রানের গতি আটকে যায় নাইমের।

সেই চাপ থেকেই বোধ হয় অ্যাডাম জাম্পাকে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়েছিলেন সপ্তম ওভারের শেষ বলে। বলটি মিস করে হন পরিষ্কার বোল্ড, ২৯ বলে ২টি করে চার-ছক্কায় নাইম করেন ৩০ রান।

এরপর দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান সাকিব আল হাসান আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ মিলে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন কিছুটা। যদিও তেড়েফুরে খেলতে পারেননি তারাও। ৩২ বলের জুটিতে তারা যোগ করেন ৩৬ রান।

ডাউন দ্য উইকেটে তুলে মারতে গিয়ে আউট হন মাহমুদউল্লাহ। হ্যাজলউডের বলে দৌড়ে গিয়ে দারুণ এক ক্যাচ নেন ময়েচেস হেনড্রিকস। মাহমুদউল্লাহর ২০ বলে সমান রানের ইনিংসটিতে ছিল একটি ছক্কার মার।

এরপর নুরুল হাসান সোহানও উইকেটে টিকতে পারেননি। অ্যান্ড্রু টাইয়ের এক ডেলিভারি অনেকটা সামনে এগিয়ে গিয়ে ওয়াইডের কাছাকাছি জায়গা থেকে তুলে মারেন তিনি, ৪ বলে ৩ রান করে হন মিচেল মার্শের ক্যাচ।

৮৬ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১৪.৩ ওভারও পার হয়ে যায়। উইকেটে ভরসা হয়ে ছিলেন সাকিব। তিনিও অবশ্য টি-টোয়েন্টি মেজাজে খেলতে পারেননি। তবে স্লো উইকেটে তার ৩৩ বলে ৩ বাউন্ডারিতে গড়া ৩৬ রানের ইনিংসটিকে একেবারে খারাপ বলা যাবে না। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বোল্ড হন হ্যাজেলউডের এক স্লোয়ারে।

শামীম হোসেন পাটোয়ারী আন্তর্জাতিক আঙিনায় এবারই প্রথম কঠিন বোলিংয়ের মুখে পড়েন। স্টার্কের টানা দুই বলে দুই করে চার রান নিলেও পরে দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে পরাস্ত হন তরুণ এই ব্যাটসম্যান (৩ বলে ৪), ওপরে যায় লেগস্ট্যাম্প।

আফিফ হোসেন শেষ ওভারের শেষ বলে এসে আউট হয়েছেন সেই স্টার্কের বলেই। এবারও বোল্ড, ১৭ বলে ৩ বাউন্ডারিতে ২৩ রান করে ইনিংসের শেষ বলে উইকেট হারান আফিফ।

অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন হ্যাজলেউড। ৪ ওভারে মাত্র ২৪ রানে ৩টি উইকেট নেন এই পেসার। স্টার্কের শিকার ২টি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত