মাসুদ পারভেজ রূপাই

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ২২:৪৯

আমেরিকা বিশ্বকাপে মেসি; স্বপ্ন ও বাস্তবতা

কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে হওয়ায় আমেরিকা বিশ্বকাপ আয়োজন মনে হচ্ছে দ্রুততর সময়ে হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রথাগতভাবে চার বছরের অপেক্ষা ফুরিয়ে আসতেছে অপ্রত্যাশিত সময়ে। এ হিসাব আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ তাঁরা এখনও উৎসবের আমেজে আছে! কাতার বিশ্বকাপের আগে মেসি বলেছিল তার শেষ বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হতে যাচ্ছে এশিয়ায়। কিন্তু বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে দেওয়ার পরে মেসির উপভোগের মন্ত্রে ফুটবল আরও শিরোপা এনে দিয়েছে আর্জেন্টিনাকে। টানা দুই কোপা আমেরিকা জয়ের পরে দোরগোড়ায় কড়া নাড়তেছে আরও একটা বিশ্বকাপের দামামা। শিরোপা ধরে রাখার কঠিনতম মিশনে মেসি কি দলের অংশ হবে? কিংবা লায়োনেল স্কালোনি কি মেসিকে কেন্দ্র করে আমেরিকা অভিযানে যাবে? কিংবা ৩৯ বছর বয়সী মেসির আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ দলে ভূমিকা কেমন হবে?

এইসব সম্ভাব্য, আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচ্য লেখাটা ।

রাশিয়া বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে ম্যাচটায় চোখ বুলানো যাক। একটা পর্যায়ে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পরে আমার মনে হয়েছিল এতটা সহজে মেসিরা হারবে না। কিন্তু বেঞ্জামিন পার্ভাদের ঐ রকেটশটের পরে এক এমবাপ্পের কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। মাশচেরানোকে গতি ও স্কিলে পেছনে ফেলে আঠারো বছরের তরুণ কিলিয়ান এমবাপ্পে একাই শেষ করে দিয়েছিল আর্জেন্টিনার ১% সম্ভাবনাকে। এমবাপ্পের গতির কাছে পর্যুদস্ত হওয়া মাশচেরানোকে সেদিন আক্ষরিক অর্থেই অসহায় মনে হয়েছে। শেষের দিকে সার্জিও আগুয়েরোর হেড থেকে গোলের মাধ্যমে স্কোরলাইন ৩-৪ হলেও আর্জেন্টিনা সেই ম্যাচ জিতবে সেটা আর্জেন্টিনার সমর্থকরাই কল্পনা করেনি। তারপর দীর্ঘ খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনা তৃতীয় বিশ্বকাপ জিতেছে। মেসি অমরত্বের ছোঁয়া পেয়ে গেছে। বিশ্বকাপ শেষে আরও একটা কোপা আমেরিকা জিতেছে মেসি। এখন আরও একটা বিশ্বকাপের নয় মাস আগে ফিরে আসছে; আমেরিকা বিশ্বকাপে মেসি খেলবে কি না!

কাতার বিশ্বকাপের পরে মেসির পালাবদল হয়েছে। দলের ভূমিকা পরিবর্তন এসেছে। বাস্তবতা যেটাই হোক, বয়সের কারণে স্কিলে অদলবদল এসেছে। মেসি কী করতে পারে, তার সক্ষমতার পরিমাপ কতটুকু এইসব বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, মেসি একাই মিনিটের মধ্যে যা করতে পারে অন্য অনেকেই পুরো ম্যাচ খেলে তা করতে পারে না। ম্যাচের মোমেন্টাম পরিবর্তন করতে মেসির একটা মুহূর্তই যথেষ্ট। একটা ডিফেন্সচেরা পাস, একটা গতিপ্রকৃতি পাল্টে দেওয়া ভিশন কিংবা লাগাম নিজের দিকে টেনে এনে কয়েকটা প্লেয়ারকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখা, এইসব নিয়ে কারও দ্বিমত থাকবে না। কিন্তু ২০২৩-২০২৫ পর্যন্ত মেসি একের পর এক ইনজুরিতে পড়েছে। খেই হারিয়েছে, ম্যাচের পর ম্যাচ মিস করেছে। বিশ্রাম নিতে হয়েছে বেশুমার। সেখানে আমেরিকা বিশ্বকাপে মেসির উপর অতিমাত্রায় নির্ভর করাটা আর্জেন্টিনার জন্য কি সুইসাইডাল হবে নাকি হাতি মরলেও লাখ টাকা হিসাবে মেসিকে রেখেই আর্জেন্টিনা আমেরিকা অভিযানে যাবে তা দেখার অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব।

অন্যদিকে দেশের মাটিতে শেষ ম্যাচ খেলার আগে-পরে মেসি ঘুরেফিরে সেই আগের কথায় মনে করিয়ে দিয়েছে। এখনও কোন কিছুই নিশ্চিত না। ম্যাচ বাই ম্যাচ আগাতে চান। উপভোগের মন্ত্রে ফুটবল খেলতে চান কিন্তু এটাও উল্লেখ করেছে যে, বয়স একটা ফ্যাক্টর।

মেসির মতো ফুটবলারের জন্য আদতে বয়সের চেয়ে বড় ফ্যাক্টর ফিটনেস ধরে রাখা। ফিটনেস ধরে রাখতে পারলে বাকিগুলো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে মেসি টানা ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছে খুব কমই। একের পর ইনজুরির জন্য পারফর্ম্যান্সেও উঠানামা দেখা গেছে, যা মেসিসুলভ নয়। কিন্তু একই সময়ে বেশ কিছু ম্যাচ ইনজুরির কারণে না খেলেও মেসি আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মিয়ামির সেরা তারকা। যা মেসিময়তার ঐশ্বরিক প্রতিভা ও পরিশ্রমের ফসলের কথায় মনে করিয়ে দেয়। বাছাইপর্বে মেসি এবার লাতিন আমেরিকান অঞ্চলে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছে একইসাথে ইন্টার মিয়ামিরও সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা খেলোয়াড়। এইসব অনুমিত ব্যাপার মাথায় রেখে আর্জেন্টিনার হিসাবনিকাশ এবং বিশ্বকাপের মতো মহাকাব্যিক আসরে কেমন খেলবে তা বিবেচনায় নেওয়াটা খানিকটা মুশকিল! কারণ, বিশ্বকাপে সেরাদের সেরারা পারফর্ম করে, দলকে জেতায়, শিরোপা এনে দেয়। সেখানে কমতি/ঘাটতি থাকলে অর্জনের ঢালা গলায় পরিধান কড়া সম্ভব হয় না।

ইনজুরি ও বয়সের ছাপে পড়ে মেসি এখন অবধি প্রায় ৫০টার মত ম্যাচ মিস করেছে। দিনের হিসাবে যা বছরের অর্ধেক প্রায়। এই সময়ে আর্জেন্টিনা দলে মেসির পরিবর্তে যারা খেলছে তাঁরা আর্জেন্টিনাকে নির্ভরতা দিতে পারেনি। কোপা আমেরিকা-২০২৪ ফাইনালে সেকেন্ড হাফে মেসি মারাত্মক ফাউলের শিকার হয়ে মাঠ ছেড়ে যেতে বাধ্য হলেও সেখানে লাউতারো মার্টিনেজের দুরন্ত গোল আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতায়। মেসি মাঠে যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ খুব বেশি নির্ভরতা দিতে পারেনি সেই ম্যাচে। আবার কোপা আমেরিকার সেই আসরে মেসি ইনজুরির কারণে ম্যাচও মিস করেছিল। তারপর ক্লাব ফুটবলেও মিস করার সংখ্যা অনেক। জাতীয় দলে বাছাইপর্বেও মেসি বেশ কয়েকটা খেলেনি। ইনজুরি থেকে ফিরে একটা ম্যাচ খেলে পরে ধকল কমানো কিংবা লোড নেওয়ার সমীকরণে কিছু ম্যাচ খেলেনি। সবমিলিয়ে আগামী বছরের মেসি আশি ভাগ ফিট থেকেও বিশ্বকাপে খেলতে পারবে না, যদি সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্বকাপ খেলার।

এখানে প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে, মেসি নিজেই জানে এবং বুঝে তার শারীরিক সক্ষমতার এই বিষয়টা। ফলত: এখনও কনক্রিট কোন সিদ্ধান্তে আসেনি বা জানায়নি। বিশ্বকাপের দেরি নয় মাস। এরইমধ্যে বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনার ম্যাচ শেষ। আগামী মার্চে ফাইনালিসসিমা হতে যাচ্ছে। তারপর নিয়মিত বিরতিতে কিছু প্রীতি ম্যাচ কিংবা এই বছরের শেষের দিকে আরও কয়েকটা প্রীতি ম্যাচ, এইটুকুই। এই কয়েকটা ম্যাচে মেসির বিকল্প বের করা যাবে না। বিকল্প বলতে মোটের উপর নির্ভরতা দেওয়ার জন্য এখনও কেউ আসেনি বা কাউকে পায়নি। আর্জেন্টিনা দলীয় সমন্বয়ে খেললেও মেসি সেখানে এক্স-ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। ফলে, মেসি যদি নিজ থেকে সিদ্ধান্ত না নেয় তাহলে তাকে বাদ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াবে এমন, মেসির ভূমিকা কেমন হবে। মেসিনির্ভরতা নিয়ে গেলে একটা অশনিসংকেত কাজ করবে! কারণ, মেসির ইনজুরি হলে সেটা কোন প্লেয়ার সামাল দিবে।তখন দলীয় সমন্বয়ে স্কালোনি পরিবর্তন আনবে কিন্তু সেটাতে আর্জেন্টিনা ম্যাচ বের করে নিতে পারবে কি না!

সমর্থকেরা তো চায় মেসি আর্জেন্টিনা দলে আজীবন খেলুক। আরও খোলাসা করে বললে মেসি আজীবন ফুটবল খেলে যাক! কিন্তু সেটা তো সম্ভব না! তাহলে, স্কালোনি এবং মেসি উভয়েরই প্ল্যান আছে তাঁরা একে অপরকে কোন সমীকরণে মেলাবে। মেসিকে নিয়ে স্কালোনির নিশ্চয়ই আলাদা প্ল্যান আছে। কারণ স্কালোনি এবং মেসি উভয়ই নিজেদের ভালোভাবে জানে এবং বুঝে। দলের ভালোর জন্য তাঁরা একে অন্যকে অবশ্যই সহায়তা করবে। এখানেই প্রণিধানযোগ্য যে, মেসিকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা দল সাজাবে না স্কালোনি। মেসি প্ল্যানের অবিচ্ছেদ্য অংশ কিন্তু বিকল্পও থাকবে। সেখানে মেসি হয়তোবা ম্যাচ বাই ম্যাচ খেলার সিদ্ধান্ত নিবে। সেটা নির্ভর করবে মেসির শরীর ও মন কেমন সাঁয় দিচ্ছে তার উপর। আবার হতে পারে, ম্যাচের একটা নির্দিষ্ট সময়ে মেসিকে নামানো হবে, যাতে ইমপ্যাক্টটা ভালোভাবে রাখতে পারে। হতে পারে ম্যাচের অবস্থা বুঝে মেসিকে সেইফ রাখার অংশ হিসেবে স্কোরলাইনের উপর নির্ভর করে এগোবে। হতে পারে আমাদের চিন্তাভাবনার বাইরে দুইজনই ভিন্ন কোন প্ল্যানে আগাচ্ছে!

দলের ভালোর জন্য মেসি এবং স্কালোনি কেউই গোঁয়ার্তুমি করবে না এটা নিশ্চিত। মহাতারকা হিসাবে মেসি দলে থাকবেই এই সমীকরণে কোন পক্ষই আগাবে না, এটুকু বিশ্বাস আছে। ফলে, এখন পর্যন্ত কোন কিছুই নির্ধারিত হয়নি। কারণ, মেসি এখনও বলেনি তার সিদ্ধান্তের কথা। ম্যাচ বাই ম্যাচের হিসাবে, শারীরিক সক্ষমতার হিসাবে এবং ধকল সয়ে নেওয়ার সমীকরণে মেসি কতটা ফিটনেস ধরে রাখতে পারতেছে সেটাই মূল বিষয় হিসেবে প্রতিপাদ্য হবে।সেই প্রতিপাদ্য বুঝা যাবে আগামী বছরের মার্চে কিংবা তার খানিক আগে। ফুটবলে কোন কিছুই নিশ্চিত না, সেটা মেসির মতো গ্রেটেস্ট এভার ফুটবলার হলেও না!

  • মাসুদ পারভেজ রূপাই: মেসির অটোবায়োগ্রাফি ‘দ্য আর্ট অফ ফুটবল’ বইয়ের লেখক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত