মোসাইদ রাহাত, শাল্লা থেকে

১৯ মার্চ, ২০২১ ১৩:০৩

শাল্লায় স্ট্যাটাসদাতার শিশু সন্তানকে হত্যার হুমকি দেয় হামলাকারীরা

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার কারণে বিতর্কিত মাওলানা মামুনুল হকের সমালোচনা করে সুনামগঞ্জের শাল্লায় পোস্ট দেয়ার অভিযোগে আটক যুবকের ৬ মাসের শিশু সন্তানকে হত্যার হুমকি দেয় হামলাকারীরা। এর পরপরই শাল্লায় তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের অনুসারীরা।

শুক্রবার (১৯ মার্চ) সকালে সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিবেদকে এমনটাই জানান বুধবার মামুনুল হকের অনুসারীদের চালানো তাণ্ডবের শিকার ও পোস্টের জেরে আটক হওয়া যুবকের পরিবার।

সেই যুবকের স্ত্রী বলেন, ‘আমার স্বামী কী অপরাধ করছে তা আমরা জানি না। তবে যখন জানতে পেরেছি সে খারাপ কাজ করেছে এবং এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, তখন আমি নিজের উদ্যোগে এলাকাবাসীকে বলে দিয়েছি সে কোথায় আছে। যেখানে আমি আমার স্বামীকে পুলিশের হাতে তুলে দিছি সেখানে কেনো আমাদের উপর এমন হামলা চালানো হলো?’

পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত দুই মাস আগে সুনামগঞ্জ শহর থেকে পরিবার নিয়ে শাল্লা উপজেলায় আসেন সেই যুবক। শহরে একটি মার্কেটিং ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শাল্লায় কৃষি কাজ শুরু করেছেন তিনি। এই যুবক প্রায়ই বিভিন্ন বিশয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তার মত প্রকাশ করতেন বলেও জানান তার পরিবার। তবে এদিন তার মত প্রকাশের পর এমন তাণ্ডব তাদের দেখতে হবে এমনটা ভাবেননি তারা।

এ প্রতিবেদকের কাছে তার স্ত্রী বলেন, ‘হঠাৎ করে আমরা দেখতে পাই কয়েশ লোক আমাদের বাড়ির দিকে তেড়ে আসছেন। সাথে সাথে আমি আর আমার ননদ ঘরের ভিতর লুকাই। সাথে আমার ৬ মাসের শিশু সন্তান ছিলো। তারা আমাদের খুঁজে বের করে, আর আমার শিশু সন্তানরে মারার হুমকি দেয়। পরে তারা ঘরের জিনিসপত্র ভাঙতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা আমার একটা সোনার চেইন ও ঘরে থাকা নগদ ৪৩ হাজার টাকা নিয়া যায়। তাদের তাণ্ডব শেষে যাবার পথে কয়েকজন আমার হাতের ডান কাঁধে লাঠি দিয়ে আঘাত করে, এতে আমার হাত ভেঙে যায়।’

সেই যুবকের মা বলেন, ‘আমার ছেলে কি করেছে তা জানিনা। খালি শুনছি সে কি লিখালিখি করেছে। সেটার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজন শুরু হয়। আমরা উত্তেজনা থামাতে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিই। পরদিন সকালে যে এমন হামলা আমারদের উপর চালানো হবে সেটা ভাবিনি।

তিনি আরও বলেন, আমরা গরিব মানুষ। কৃষিকাজ করিয়া খাই। দুই ছেলের মধ্যে সে ছোট। আমরা তাকে খুব আদর করে বড় করেছি। আমি সরকারের কাছে হাত জোড় করে বলছি যে আমি নিজে তার দায়িত্ব নিবো। যেনো সে আর এমন কাজ না করে।’

এদিকে সেই যুবকের কাকা (চাচা) বলেন, ‘সে ভুল করছে। ভুলটা ক্ষমা করে দিলে সে তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারে। তার ছোট বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে সরকার যদি তারে ক্ষমা করে দেয় তাহলে আমরা সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।’

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার কারণে বিতর্কিত ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক গত ১৫ মার্চ দিরাইয়ে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে বক্তৃতা করেন। ওই সমাবেশে তার কিছু বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হন শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাও গ্রামের এক তরুণ। তিনি মামুনুলের সমালোচনা করে মঙ্গলবার ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এই পোস্টকে কেন্দ্র করে দিরাই ও শাল্লা উপজেলায় উত্তেজনা দেখা দেয়। হেফাজতে ইসলাম ও মামুনুল হক অনুসারীরা এমন পোস্টে বিক্ষুব্ধ  হয়ে ওঠেন। এই ঘটনায় বুধবার সকালে বিক্ষোভ মিছিল আহ্বান করে হেফাজতে ইসলাম।

তবে আগের রাতেই উত্তেজনা আঁচ করতে পেরে নোয়াগাও গ্রামবাসী ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত তরুণকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এই গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবারের প্রায় সবাই দরিদ্র হিন্দু। ফলে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের মানুষজনের মধ্যে।

তবে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আর আতঙ্ক সত্ত্বেও প্রশাসনের বাড়তি নজরদারি না থাকায় বুধবার সকালে নোয়াগাঁও গ্রামে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিছিল করে নির্বিঘ্নেই হিন্দু অধ্যুষিত এই গ্রামের সবগুলো বাড়িঘরই ভাঙচুর ও লুটপাট করে। গ্রামের প্রায় ৮০টি হিন্দু বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। এ সময় গ্রামের লোকজন পাশের হাওরে গিয়ে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করেন। এর পরেও শেষ রক্ষা হয়নি তাদের।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত