নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ মে, ২০২১ ২০:৫৯

এমন আনন্দের ঈদ আর আসেনি সুরুজা বিবির জীবনে

নিজের কোনো জায়গা জমি নেই। গ্রামের এ বাড়ি-ও বাড়িতে আশ্রিত হিসেবেই থাকতেন সুরুজা বিবি। এভাবেই কেটে গেছে ৫০ বছর। তবে এবার দীর্ঘ ৫০ বছরের ঠিকানাবিহীন জীবনের অবসান হতে যাচ্ছে সুরুজার।

নিজের একটা ভিটে হচ্ছে তার। ঈদের ঠিক আগ মূহূর্তেই পেয়েছেন এমন সুখবর। ফলে এবারের ঈদ বাড়তি আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে সুরুজার জন্য। সুরুজার ভাষায়- ‘জীবনে এইরকম আনন্দের ঈদ আর আইছে না’।

সুরুজা বিবি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের করমপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি ওই এলাকার মরহুম সিরাজ উদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয়ে থাকতেন। সম্প্রতি এই বাড়ি বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছেন সিরাজ উদ্দিনের উত্তরসূরীরা। তাই সুরুজা বিবিকে ঈদের পর বাড়ি ছাড়ার কথা বলেছেন তারা।

এ অবস্থায় আবার শঙ্কায় পড়েন সুরুজা বিবি। কোথায় গিয়ে আবার আশ্রয় নেবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। সুরুজার এই দুশ্চিন্তার কথা সামাজিক যোযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন এলাকার কিছু তরুন। বিষয়টি উঠে আসে কয়েকটি গণমাধ্যমেও। এতে বদলে যায় সুরুজার ভাগ্য।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে আসা সুরুজার দুঃখের কাহিনী নজরে আসে বড়লেখার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূসরাত লায়লা নীরার।

বুধবার বিকেলে (১২ মে) বড়লেখার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূসরাত লায়লা নীরা বৃদ্ধা সুরুজা বিবির অস্থায়ী বাড়িতে খাদ্যসাগ্রী ও শাড়ী নিয়ে হাজির হন। তিনি তার (সুরুজা) হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহারের দুই প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী ও নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঈদের উপহার হিসেবে একটি নতুন শাড়ী। এসময় তিনি ‘মুজিব শতবর্ষে’ প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে ভূমিহীন সুরজবা বিবি ও তার ছেলের পরিবারকে দুটি ঘর তৈরি করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

বিজ্ঞাপন



সুরুজার পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুরুজা বিবির স্বামী দিনমজুর ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের বছর খানেক আগে বর্তমান উত্তর শাহবাজপুর এলাকায় এসেছিলেন। এরপর থেকে এই গ্রামেই তাদের বাস। তিনি এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার। পরিবারের অসচ্ছলতায় কোনো বাড়ি করতে পারেননি। মানুষের বাড়ি বাড়ি ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকতে হয়েছে। একসময় স্বামী মারা যান। ছেলে বিয়ে করেন। ছেলের পক্ষের তিন মেয়ে ও ১ ছেলে। সংসারের অনটনের মধ্যে নিজের মাথাগোঁজার ঠাঁই করা হয়নি।

প্রায় ৯ বছর আগে মারা যান সুরুজার ছেলে আব্দুল মান্নান। এরপর দুর্দিন নেমে আসে সুরুজা বিবির পরিবারে। নিজে ও ছেলের বউসহ মানুষের সাহায্যে, কখনো বাড়ি বাড়ি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। করমপুর গ্রামের এবাড়ি-ওবাড়ি অস্থায়ী হিসাবে বসবাসের পর ঠাঁই হয় সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন চৌধুরীর পরিত্যক্ত বাড়িতে। প্রায় চার বছর থাকার পর সেই বাড়িও ছাড়ার তাগিদ আসে। সহায় সম্বলহীন সুরুজা বিবি কোথায় যাবেন, কি করবেন সেই চিন্তায় চোখে আঁধার দেখছিলেন। তখনই তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। প্রশাসন ওই এলাকায়ই তাদেরকে খাস ভূমিতে ঘর তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

সুরুজা বিবি বলেন, ‘জীবনটা মানুষের বাড়ি ঘরে থাকিয়া কাটি গেছে। শেষ বয়সে আইয়া সরকার আমরার কষ্টের কথা জানিয়া ঘর দিছইন। মনে কিছু শান্তি নিয়ে মরমু। সরকারি অফিসের স্যার আমরার লাগি ঈদের আগে খানি আনছইন (খাদ্যসামগ্রী)। ঈদের একটি নতুন শাড়ি দিছন। সবার লাগি দোয়া করমু। জীবনে কোনো ঈদো (ঈদে) ইরকম (এরকম) আনন্দ আইছে না। ইবার(এবার) খুব আনন্দ লাগের।’

সুরুজা বিবির ছেলে বউ (স্ত্রী) আফিয়া বেগম বলেন, ‘আমার শ্বশুর স্বাধীনতার বছর খানেক আগে আইছন এই এলাকাত। কোনো দিনও একটু নিজর মাটি আছিল না আমরার। মাইনষের (মানুষের) বাড়িত থাকিয়া আমরার জীবন পার অইগেছিল। মাইষের বাড়িত থাকিয়া আমার একটা মেয়ে বিয়েও দিছি। কোনো দিন আমরা নিজের জায়গা, পাকা ঘর করমু ইতা চিন্তা দূরে থাকুক স্বপ্নও দেখছি না। এবার ঈদের আগে আমরার কষ্টের কথা হুনিয়া এসিল্যান্ড স্যার আমরার লাগি খানি (খাদ্যসামগ্রী), আমার শ্বাশুড়ির জন্য একটি নতুন শাড়ী নিয়া আইছন। কইছন আমরারে নতুন পাকা ঘর বানাইয়া দিবা। মুখ দিয়া ভাষায় প্রকাশ করতাম পারতাম নায় কত আনন্দ লাগের। জীবনে কোনো দিন ঈদে মন খুলিয়া আনন্দ করছি না। পরার বাড়ি, পরার ঘরে আনন্দ থাকে না। জীবনে এইরকম আনন্দের ঈদ আর আইছে না।’

বড়লেখার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত লায়লা নীরা বৃহস্পতিবার (১৩ মে) বিকেলে বলেন, ‘ভূমিহীন বৃদ্ধা সুরুজা বিবির সংবাদ দেখে তাদের বাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যাই। ব্যক্তিগতভাবে একটি নতুন শাড়ী দিয়েছি। তাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর বরাদ্দের উদ্যোগ নেই। ঈদের পর ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। ওই এলাকায়ই সুরুজা বিবি ও তার ছেলের জন্য দুটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত