ধারাবাহিক উপন্যাস: পিঞ্জিরা—১১

 প্রকাশিত: ২০২৬-০৩-১০ ০০:৩১:৩২

রিপন ঘোষ:

পর্ব ১১: মাটির ঋণ
লক্ষণশ্রীর দেওয়ান বাড়িতে এখন আর রাতভর বাঈজির নূপুরের শব্দ শোনা যায় না। তার বদলে শেষ রাতে শোনা যায় এক উদাস দোতরার সুর আর এক ভারী কণ্ঠের হাহাকার। হাছন রাজা এখন আগের চেয়েও বেশি চুপচাপ।

সকাল বেলা। হাছন রাজা বৈঠকখানায় বসে আছেন। সামনে নায়েব মশাই একগাদা খাতা নিয়ে হাজির। "হুজুর," নায়েব আমতা আমতা করে বললেন, "এবার তো হাওরে বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। প্রজারা খাজনা দিতে এসেছে। কিন্তু!"

"কিন্তু কী নায়েব মশাই?" হাছন রাজা দোতরা থেকে চোখ না তুলেই জিজ্ঞেস করলেন। "কিন্তু অনেকেই বলছে, গতবারের বন্যায় তাদের ক্ষতি হয়েছিল। তাই এবারের খাজনাটা যদি একটু মওকুফ করা যায়।"

আগের হাছন রাজা হলে হয়তো হুঙ্কার দিয়ে উঠতেন। হয়তো লাঠিয়াল পাঠাতেন। কিন্তু আজকের হাছন রাজা মুখ তুলে হাসলেন। "নায়েব মশাই, এই যে এত ধান, এত চাল, এত জমি, এসব কি আমাদের সাথে কবরে যাবে?" নায়েব চুপ করে রইলেন।
জমিদারের এ কেমন কথা! "প্রজাদের বলে দিন, যার যা খুশি তাই যেন দিয়ে যায়। জোরজুলুম চলবে না। মাটির ঋণ কি শুধু খাজনা দিয়ে শোধ হয়? মানুষের মনের ঋণ শোধ করতে হয় ভালোবাসা দিয়ে।"

নায়েব মশাই অবাক হয়ে চলে গেলেন। হাছন রাজা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি জানলার কাছে গিয়ে বাইরে তাকালেন। উঠোনে একদল প্রজার বাচ্চা ধুলোয় লুটোপুটি খেয়ে খেলছে। ওদের গায়ে ময়লা কাপড়, রোদপোড়া মুখ।

হাছন রাজার হঠাৎ মনে পড়ল নিজের ছেলেবেলার কথা। মনে পড়ল সেই দিনটার কথা, যেদিন আদালতে জজ সাহেবের ইংরেজি কথা বুঝতে না পেরে তাঁকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে হয়েছিল। তাঁর নিজের ছেলেরা তো বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি, ফারসি, বাংলা শিখছে। কিন্তু এই গরিব প্রজাদের সন্তানদের কী হবে? এরা কি সারাজীবন ওই ধুলোতেই লুটোপুটি খাবে?

সেদিন বিকেলে হাছন রাজা তাঁর বড় ছেলে গনিউর রাজাকে ডাকলেন। গনিউর এখন বেশ বড় হয়েছে, জমিদারি বোঝার চেষ্টা করছে। "গনিউর, এদিকে আয়।"

গনিউর বাবার সামনে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। বাবাকে সে যমের মতো ভয় পেলেও, ইদানীং বাবার এই শান্ত রূপ তাকে অবাক করে। "বল তো বাপ, আমাদের এই সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বড় অভাব কীসের?" হাছন রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

গনিউর একটু ভেবে বলল, "আব্বাজান, বোধহয় রাস্তার। বর্ষায় তো কোথাও যাওয়া যায় না।"

হাছন রাজা হাসলেন। "না রে বাপ। সবচেয়ে বড় অভাব হলো চোখের। আমাদের চোখ আছে, কিন্তু আমরা অন্ধ। আমরা লেখাপড়া জানি না। তুই তো তবু বাড়িতে মাস্টার রেখে পড়ছিস। কিন্তু ওই যে করিমের ছেলে, বা রামদাসের ছেলে, ওরা তো অক্ষরই চেনে না।" তিনি ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। "আমি চাই সুনামগঞ্জে এমন একটা স্কুল হোক, যেখানে হিন্দু, মুসলমান, উঁচু জাত, নিচু জাত, সবাই একসাথে পড়বে। যেখানে ইংরেজির পাশাপাশি আমাদের নিজেদের ভাষাও শেখানো হবে।"

গনিউর অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। দেওয়ান সাহেব স্কুল বানাবেন? তাও আবার সব জাতের জন্য? কথাটা অন্দরমহলেও পৌঁছাল। হুরমত জাহান বিবি খবরটা শুনে জায়নামাজে বসেই হাসলেন। "আমার হাছন পাগল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভালো পাগল হয়েছে। মানুষের চোখ খুলে দেওয়া তো সওয়াবের কাজ।"

সিদ্ধান্ত তো হলো, কিন্তু স্কুল প্রতিষ্ঠা করা তো মুখের কথা নয়। এর জন্য অনেক টাকা, জায়গা আর সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন। হাছন রাজা সুনামগঞ্জের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকলেন। তার বৈঠকখানায় আজ কোনো গানের আসর নয়, বসল শিক্ষার আসর।

শহরের নামকরা উকিল, ব্যবসায়ী আর অন্যান্য জমিদাররা এলেন। হাছন রাজা তাদের সামনে নিজের স্বপ্নের কথা বললেন। "আপনারা জানেন, আমি হাছন রাজা জীবনে অনেক টাকা উড়িয়েছি। নিজের শখের পেছনে, অহংকারের পেছনে। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, ওসবই ছিল ছাই ভস্ম। আমি চাই, আমাদের সুনামগঞ্জের ছেলেরা মানুষের মতো মানুষ হোক। তারা যেন ইংরেজদের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আমি স্কুলের জন্য জমি দেব, টাকা দেব। আপনারা শুধু আমার পাশে থাকুন।"

উপস্থিত সবাই হাছন রাজার এই কথায় মুগ্ধ হলেন। যে শর্মা বাবুরা একসময় তাঁকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, তারাও আজ তাঁর এই মহৎ উদ্যোগে বাধা দিতে পারল না।

স্কুলের জন্য জায়গা ঠিক হলো সুনামগঞ্জ শহরের মাঝখানে। ১৮৮৭ সালে মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালের সুবর্ণ জয়ন্তী (জুবিলী) উপলক্ষে সারা ভারতবর্ষেই নানা উৎসব হয়েছিল। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে এবং ব্রিটিশ সরকারের আনুকূল্য পেতে স্কুলের নাম রাখা হলো জুবিলী হাইস্কুল। স্কুল নির্মাণের কাজ শুরু হলো। হাছন রাজা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করতেন। তিনি নিজের তহবিল থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দান করলেন। শুধু তাই নয়, স্কুলের ছাত্রদের জন্য তিনি নিজে হাতে গাছ লাগালেন, খেলার মাঠের জায়গা ঠিক করে দিলেন।

যে হাছন রাজাকে মানুষ ভয় পেত, আজ তাকে দূর থেকে দেখে মানুষ দুহাত তুলে দোয়া করে। এককালের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী জমিদারের এই পরিবর্তন দেখে সাধারণ মানুষ হতবাক।

স্কুলের কাজ বেশ দ্রুত এগোচ্ছে। একদিন সন্ধ্যায় হাছন রাজা বাড়ি ফিরলেন বেশ পরিশ্রান্ত হয়ে। সারা শরীরে ধুলোবালি। পিরানী বিবি নিজের হাতে স্বামীর জন্য পানি নিয়ে এলেন।

"তুমি আজ সারাদিন রোদ মাথায় করে ওই ইটের ভাটায় দাঁড়িয়ে ছিলে?" পিরানী বিবি জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর গলায় মৃদু অনুযোগ।

হাছন রাজা পানি খেয়ে হাসলেন। "ইটের ভাটায় তো ইট পোড়ে বিবি, আর আমার তো বুকের ভেতরটা পোড়ে। ওই স্কুলটা যেদিন দাঁড়াবে, সেদিন হয়তো এই পোড়াটা একটু কমবে।"

পিরানী বিবি স্বামীর পাশে বসলেন। "তুমি বদলে গেছ দেওয়ান সাহেব। তুমি এখন আর আগের মতো রাগ করো না। তোমার এই বৈরাগ্য, এই মানুষের জন্য কাজ করা সবই ভালো। কিন্তু তুমি কি সংসার থেকে মন তুলে নিচ্ছ?"

হাছন রাজা জানলার বাইরে তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকালেন। "সংসার তো একটা পান্থশালা পিরানী। আমরা দুদিনের মুসাফির। আমি এতদিন শুধু নিজের জন্য ঘর বানিয়েছি। শূন্যের মাঝখানে ঘর বানালে তা টেকে না। তাই আমি এমন একটা ঘর বানাতে চাই, যা আমার মৃত্যুর পরও মানুষের কাজে লাগবে।"

তিনি পিরানী বিবির দিকে ফিরে তাকালেন। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। "আমি স্কুল বানাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার আসল পাঠশালা তো আমার বুকের ভেতর। সেখানে আমি রোজ নতুন করে পড়া শিখছি। শিখছি যে, রাজা হাছন চৌধুরীর চেয়ে ফকির হাছন অনেক বেশি স্বাধীন।"

সেদিন রাতে হাছন রাজার খাস কামরা থেকে দোতরার কোনো করুণ সুর ভেসে এল না। তিনি শান্তিতে ঘুমিয়েছিলেন। কারণ তিনি এখন আর নিজের জন্য বাঁচেন না, তিনি বাঁচতে শুরু করেছেন মানুষের জন্য।

কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব একটা হিসেব-নিকেশ আছে। মানুষ যখন ভাবে সে তার পিঞ্জিরাটা নতুন করে সাজাচ্ছে, তখনই মহাকাল অলক্ষ্যে হেসে ওঠে।
[চলবে...]

আপনার মন্তব্য