০৮ মার্চ, ২০২৬ ১৮:১৯
রক্ষণশীল সিলেটে গত দুই দশকে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে সিলেটে নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরু করলেও এখনো সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে লড়াই করতে হচ্ছে। পাশাপাশি নারীদের সিম্বোলিক ব্যবসার (পোশাক, পার্লার, টেইলার্স) বাইরে অন্য ধরনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলেই আসে প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া ব্যবসায়িক কাজ ও সংসারের কাজের ভারসাম্য বজায় রাখার অতিরিক্ত চাপ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ব্যবসা করতে নারী হওয়াই যেন প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ব নারী দিবেসে আজ আমরা জানবো সিলেটের ব্যবসায়ী জান্নাতুল ফেরদৌস ও শামছুন্নাহার সোমার কথা।
সিলেট নগরীর নবাব রোড এলাকার বাসিন্দা জান্নাতুল ফেরদৌস । আইন বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করেও পেশা হিসেবে রন্ধন শিল্পকে বেছে নিয়েছেন। কারণ রান্না করে তিনি আনন্দ পান। সমাজের গরীব দুঃখী মানুষকে ভাল খাবার খাওয়াতে তিনি ভালবাসেন। তাই দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজের হাতে রান্না করে সিলেটের বিভিন্ন কলোনিতে গিয়ে খাবার বিতরণ করতেন। বন্যার সময় সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে পানিবন্দি মানুষকে খাবার বিতরণ করে আসছেন। তার এই সেচ্চাসেবী কার্যক্রম চলমান রাখতেই তিনি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করার কথা চিন্তা করেন।
রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করার জন্য প্রফেশনাল শেফ কোর্সও করেন। এবং সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসায়ের প্রতিমাসের লভ্যাংশের ২% সমাজের অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করবেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেট পূর্ব জিন্দাবাজারে কাজী এসপ্যারাগাস ফুডকোর্টে শুরু করে ‘হাঁড়িকাব্য’ নামক রেস্তোরার যাত্রা শুরু করেন জান্নাত। কম টাকায় ভাল মানের দেশীয় খাবারের সমাহারে ভালই চলছিল রেস্তোরা। কিন্তু রেস্তোরার এই ভাল চলাটা ফুডকোর্টে থাকা কয়েকজন ব্যবসায়ী ভালভাবে নেননি। তাই তারা নানা ভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে থাকেন। পেইড কাস্টমার পাঠান রেস্তোরায় ভেজাল করার জন্য। এসবের মধ্যেও সংসারের কাজ সেরে, স্বামী ও তিন সন্তানের ফরমায়েশ পূরণ করে ভালভাবেই চালু রাখেন রেস্তোরার কাজ। এরপর সিলেট নগরীর নাইওরপুল এলাকায় চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘হাঁড়িকাব্য’ রেস্তোরার দ্বিতীয় শাখা খুলেন। সেখানে তিনি যেকোনো মানুষের জন্য ১০০ টাকায় ভাত খাবার ব্যবস্থাও রাখেন।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, মানুষকে কমদামে ভাল মানের খাবার খাওয়াতে এবং সমাজের অসহায় মানুষকে আমার সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য করতে আমি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেছে। কিন্তু ব্যবসা শুরু করার পর মনে হয়েছে নারী হয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করাটা সমাজের অনেক মানুষ সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। বিশেষ করে অন্য পুরুষ রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা এটা মেনে নিতে পারছেন না। আমি আমার রেস্টুরেন্টের নতুন শাখায় ভাত, মাছের মাথা দিয়ে লাউ তরকারি, বিভিন্ন ভর্তা-ভাজি, ডালসহ একটি প্যাকেজ দিয়েছি ১০০ টাকায়। কারণ আমি চাই সকল শ্রেণীর মানুষ যেন সুন্দর পরিবেশে খাবার খাওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম রেস্টুরেন্টে মাঝে মাঝে কয়েকজন এমন মানুষ আসেন যারা ইচ্ছে করেই নানা কটু কথা বলেন।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সেদিন আরেক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী আসলেন আমার রেস্টুরেন্টে খেতে। এসে নিজেকে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী পরিচয়ও দিলেন। তারপর তার সাথে আসা লোকদের বলতে লাগলেন ‘ ১০০ টাকা দিয়ে বেডি ভাত কেমনে খাওয়াবে মানুষকে। লাউয়ের সাথে মাছের মাথা দিবে না নিজের মাথা দিয়ে রান্না করে খাওয়াবে।’ আমার সামনেই তারা এধরনের হাসি ট্টাটা করতে লাগলো। তখন আমার মনে হয়েছে এখানে যদি এখন পুরুষ ব্যবসায়ী হতো তারা কখনো এমনভাবে কথা বলতো না। নারী বলেই যে যা ইচ্ছে বলে যায়। তাছাড়া ব্যবসায়ে সময় দিলেও সংসারের কাজে আমার ছুটি নেই। যেখানে পুরুষরা শুধু নিজেদের পেশাগত কাজ শেষ করেই দায়িত্ব শেষ করেন সেখানে আমরা নারীরা কোনো দায়িত্ব থেকেই ছাড় পাই না। তাই নিজের স্বপ্নকে সাথে নিয়ে নারী হয়ে এই সমাজ সংসারে টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সিলেট নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা শামছুন্নাহার সোমা। ‘এমএস স্মার্ট শপ’ নামে একটি বুটিক শপ ও টেইলার্স পরিচালনা করেন তিনি। ২০১৬ সালে প্রথমে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেন সোমা। অনলাইনে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনার পর ২০২১ সালে নগরীর উপশহরে এমএস স্মার্ট শপের আউটলেট শুরু করেন।
শামছুন্নাহার সোমা বলেন, আমি মনে করি যে নারীরা বিভিন্ন ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত আছেন তাদের মূল প্রতিবন্ধকতা হলো পুরুষ ব্যবসায়ীরা। কারণ পুরুষ ব্যবসায়ীরা মূল কম্পিটেটর। তারা যখন দেখে একজন নারী ভালভাবে ব্যবসা করছেন তখন বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। যাতে ওই জায়গায় আপনি ব্যবসা করে টিকতে না পারেন। আমি নিজে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছি। দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্রে মেয়াদ থাকার পরও আমাকে দুইবার দোকান ছাড়তে হয়েছে। কারণ আশপাশের বিভিন্ন পুরুষ ব্যবসায়ীরা নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে। উপশহর ই ব্লকে যার কাছ থেকে আমি দোকান ভাড়া নেই তার সাথে আমার ২০২৭ পর্যন্ত চুক্তি আছে। কিন্তু মাস ছয়েক আগে হঠাৎ করে সে বলে আমি জায়গা বিক্রি করে দিয়েছি। কিন্তু আমি খবর নিয়ে দেখেছি তিনি আমাকে জায়গা বিক্রির তথ্যটি ভুয়া। মূলত আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখান থেকে সরাতে এটা করা হয়েছে। অথচ আমার পাশের আরেকটি টেইলার্স শপ একজন কর্মচারী নিয়ে দীর্ঘ বছর ধরে চলছে। তাকে কেউ কোনো সমস্যা করেননি কারণ তিনি পুরুষ ব্যবসায়ী। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানে একজন থেকে কর্মচারী পাঁচজন হয়ে গেছে সেটা দেখে তাদের গাত্রদাহ শুরু হয়ে গেছে। আমি ভাল ব্যবসা করছি তাই তারা প্ল্যান করে আমাকে সরিয়ে দিয়েছে। এরপর আমি জিন্দাবাজারে একটি মার্কেটে এডভান্স দিয়ে একটি দোকান ভাড়া নেই। ৫ ফেব্রুয়ারি মার্কেট কর্তৃপক্ষের কাছে বাকি টাকা পরিশোধ করে ছাবি নিয়ে আসার কথা। এখন ৫ তারিখ সকালেই আমাকে ওই মার্কেটের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন, আমি বেশি টাকা দিয়ে দোকানটি অন্যজনকে দিয়ে দিয়েছি। এটা কি হতে পারে। তিনি এটা করতে পেরেছেন আমি নারী বলে। কারণ তিনি জানেন আমি এটা নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি করবো না। এখানে একজন ব্যবসায়ীর সাথে কিন্তু এটা করতে পারতে না।
ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নারীদের বহুমুখী লড়াই করতে হয় উল্লেখ করে সোমা বলেন, নারীদের ব্যবসা করতে সর্বক্ষেত্রে লড়াই করতে হয়। আমি ব্যবসা বড় করার জন্য ৬ লাখ টাকার লোণ নিয়েছিলাম ব্যাংক থেকে। আমি সঠিক সময়ে ৬ লাখ টাকা লোণ পরিশোধ করেছি। যেহেতু আমি লোণ সঠিকভাবে লোণ পরিশোধ করেছি তাই পরেরবারতো আমাকে আরও বেশি লোণ দেওয়ার কথা ব্যাংকের। কিন্তু না ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাকে বললো গত দুই বছরে অন্য নারী উদ্যোক্তারা লোণ নিয়ে ফেরত দেননি। এইজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বলে দিয়েছে বেশি লোণ দেওয়া যাবে না। অন্য নারীরা লোণ ফেরত দেয়নি সেটার ভুক্তভোগীও নারীদের হতে হচ্ছে। কিন্তু পুরুষ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ব্যাক এমন সিদ্ধান্ত নেয় না। বাংলাদেশে কি ব্যাংক ঋণ খেলাপি পুরুষ ব্যবসায়ী নেই। ওই ঋণ খেলাপি পুরুষ ব্যবসায়ীদের জন্য কি অন্য পুরুষদের কম লোণ দেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। না তারা সেটা করে না। শুধু নারীদের জন্যই নিয়মের বেড়াজাল সৃষ্টি করা হয়।
আপনার মন্তব্য