নিজস্ব প্রতিবেদক

১০ জুন, ২০১৬ ০১:১৪

কানাডিয়ান বধূর প্রতারণা, টাকা আত্মসাতের পর স্বামীর প্রাণনাশের চেষ্টা

বিয়ে করে বরের সাথে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে কানাডা প্রবাসী এক তরুণীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বিয়ের পর কানাডায় বসবাসের প্রলোভন দেখিয়ে সিলেটের যুবক সায়েকের কাছ খেকে অর্থ আত্মসাৎ ও তাকে হত্যার চেষ্টা করেন কানাডিয়ান তরুণী সিলারা।

জানা যায়, সায়েক আহমদ খান সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার মছকাপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিন দুবাই প্রবাসী ছিলেন। আর সিলারা বেগম কানাডা প্রবাসী। থাকেন ওখানকার মন্ট্রিয়ল শহরে। বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার তেরাদল কাকরদি গ্রামে।

কয়েক বছর আগে এক আত্মীয়কে বিয়ে করে কানাডা পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পূর্বের দাম্পত্য কলহে স্বামীর কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা গ্রহণ করে ডিভোর্স দেন সিলারা।  এরপর থেকে সিলারা বসবাস করছিলেন মন্টিল শহরে এক আত্মীয়ের বাসায়।

গত বছরের মে মাসে নিজের বাড়ি বিয়ানীবাজারে আসেন সিলারা। এ সময় আত্মীয়রা তার জন্য নতুন করে বর খোঁজা শুরু করেন। এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সায়েকের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়। পারিবারিকভাবে বিয়ের মোহরানা নির্ধারণ করা হয় ১০ লাখ টাকা এবং মোহরানা বিয়ের পরপরই দিতে হবে জানিয়ে দেন সিলারা।

বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পর ২০১৫ সালের ১১ই জুন বিয়ানীবাজারের সুপ্রিম সেন্টারে সিলারা ও সায়েকের বিয়ে হয়। মহাধুমধামে আয়োজিত বিয়েতে ছিলেন উভয়পক্ষের আত্মীয়স্বজন। বিয়ের পরপরই কথা মতো মোহরানা প্রদান করেন সায়েক।   কিন্তু বিয়ের অল্পদিনের মাথায় সিলারা জরুরি কাজ আছে বলে জানিয়ে স্বামীকে দেশে রেখেই চলে যান কানাডায়। এর কিছু দিন পর ভিসা বাতিল করতে দুবাই চলে যান সায়েকও।

স্বামী-স্ত্রী দুজন দুই দেশে থাকলেও তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এদিকে, সিলারা কানাডা যাওয়ার পর স্বামী সায়েককে দেশ থেকে আবেদন করার প্রস্তুতি নিতে জানিয়ে দেন। এর ফলে সায়েক ভিসা বাতিল করে দুবাই থেকে চলে আসেন সিলেটে। উপশহরের একটি ল’ ফার্মের মাধ্যমে কানাডায় আবেদনের প্রস্তুতি শুরু করেন।

ওদিকে, কানাডা আবেদনের জন্য সিলারার পূর্বের স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্সের কাগজপত্রের প্রয়োজন পড়ে। এ কারণে সায়েক সিলারার কাছে ওই কাগজ চান। কিন্তু সিলারা কাগজ দিতে গড়িমসি করতে থাকে্ন। একপর্যায়ে জানান, তিনি ওই কাগজ দিতে পারবেন না। এ নিয়ে সিলারার সঙ্গে সায়েক ও তার পরিবারের বিরোধ বাঁধে।

বিরোধের একপর্যায়ে কানাডার আত্মীয়ের মাধ্যমে সায়েকের পরিবার খবর পান সিলারা কানাডায় গোলাপগঞ্জের তাজউদ্দিন নামের এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেছেন।

আর এ বিষয়টি জানার পর সায়েকের পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তারা দেশে থাকা সিলারার আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কাকরদি এলাকায় এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়। লন্ডন থেকে কয়েক বার যোগাযোগ করা হয় সিলারার সঙ্গে।  কিন্তু সিলারা কাউকেই পাত্তা দেননি। প্রায় দুই মাস আগে দিলারা আত্মীয়স্বজনদের মাধ্যমে জানিয়ে দে্ন তিনি আর সায়েকের সঙ্গে সংসার করবেন না। আর সিলারার এই ঘোষণায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন সায়েক ও তার পরিবার।

তারা জানিয়েছেন, বিয়েতে মোহরানাসহ প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এদিকে, সর্বশেষ গেলো এক মাস ধরে সায়েক সিলারার বোন জামাই নগরীর বাগবাড়ীর চৌধুরী মঞ্জিলের বাসিন্দা আব্দুল আহাদ ও লামাবাজারের ছায়ানীড়-৫ এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলামের কাছে বিয়ের মোহরানার টাকা দাবি করেন।  একই সঙ্গে তার সঙ্গে সিলারার বিচার দাবি করেন। আর এ নিয়ে সম্পর্কিত ভায়রা ভাই আহাদ ও নজরুল সিলারার স্বামী সায়েকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।

এভাবেই চলছিল ঘটনা। একপর্যায়ে সায়েকের পরিবারও আহাদ ও নজরুলের কাছে মোহরানার টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হন আহাদ ও নজরুল। তারা সায়েককে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক গত ৩০শে মে আহাদ ও নজরুল ফোনের মাধ্যমে সায়েককে মেডিকেল এলাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে আসতে বলেন।

সেখানে যাবার পর ওই তিন যুবক অনেকটা জোরপূর্বক সায়েককে সিএনজিতে তুলে নগরের অচেনা একটি স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে একটি কক্ষে আটকে রেখে চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সায়েকের শরীরের বিভিন্ন স্থানের মাংস তুলে নেয়। রড দিয়ে আঘাত করে হাত ও পায়ের গোড়ালি ফাটিয়ে দেয়। হাঁটুর হাড্ডিও ভেঙে দেয়। একপর্যায়ে তাদের নির্যাতনের মুখে তিনটি একশ টাকার স্ট্যাম্পে সাক্ষর দিতে বাধ্য হন সায়েক। এরপর সায়েকের মাথায় রড দিয়ে আঘাত করা হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

রাতে সায়েককে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের ফটকে তাকে ফেলা রাখা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন সায়েককে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে সায়েকের বড় ভাই লায়েকসহ আত্মীয়স্বজনরা ওসমানীতে আসেন। এদিকে, ঘটনার দুদিন পর জ্ঞান ফিরে সায়েকের। এখনও তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।

আর নির্মম এ ঘটনাটি নজরে আসে সিলেটের ডিসি ফয়সল মাহমুদের। এরপর গত শনিবার রাতে সিলেটের কোতোয়ালি থানায় বাগবাড়ীর আহাদ ও লামাবাজারের নজরুলসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন সায়েকের বড় ভাই লায়েক আহমদ খান।

এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে মামলার আসামি নজরুলকে গ্রেপ্তার করলেও স্ত্রীসহ পালিয়েছে আহাদ। তাকে ধরতে পুলিশের অভিযান চলছে। আর গতকাল সিলেটের আদালতে হাজির করে নজরুলকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, নজরুলকে জিজ্ঞাসাবাদের পর নির্যাতনকারী তিন যুবকের খোঁজ পাওয়া যাবে।

মামলার বাড়ি লায়েক আহমদ খান জানান, সায়েক এখনও আশঙ্কামুক্ত নয়। নির্যাতনের ফলে মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েছে সে।

তিনি বলেন, ‘ওরা মানুষ নয়, পশু। ওদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই আমরা।

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত