মারুফ আহমেদ

১১ জুন, ২০১৬ ২৩:০১

‘কানাদের বংশ’ বলে লোকে তাদের চেনে

পুরো এলাকায় এই বাড়িটি একটি বিশেষ কারণে পরিচিত। বাড়িটির মোট ২৫ সদস্যই অন্ধ। এরমধ্যে শতবর্ষী বৃদ্ধ থেকে শিশু পর্যন্ত রয়েছে। বংশানুক্রমিক অন্ধত্বের কারণে এলাকাবাসীর কাছে এই বাড়ির লোকজন 'কানাদের বংশ' নামে পরিচিত।

গ্রামের নাম পুটাপাড়া। উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ। সিলেটের সীমান্তবর্তী গ্রাম। পুটামারা গ্রামের এই অন্ধ পরিবারটির বংশানুক্রমিক পেশা মাছ ধরা। তবে পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই চোখে দেখতে না পারায় কাজের সক্ষমতাও হারিয়েছেন তারা। ফলে এখন অন্যের দয়ার উপরই নির্ভশীল তাদের জীবন।

এই বংশের প্রধান মুরব্বী খুরশিদ মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরার দু:খ কইয়া কিতা খরতাম। আমরাতো মানুষ নায়। এর লাগিতো খেউ কোনোদিন খোঁজ নেয় না। ফুরিরে (মেয়েকে) বিয়া দিছলাম, হেও কানা ওইগেছে। জামাইয়ে আরেক বিয়া কইরা, তারে ফিরত দিলাইছে। আমরার তিন ভাইওর পরিবারও ২৫ জন কানা। বুঝরাতো আমরা আর কিলা থাকমু।’

বয়সের ভারে নুজ্য খুরশিদ মিয়া। শতবর্ষ পেরিয়েছেন অনেক আগেই। তবু দুঃখ পেরোতে পারেন নি। খুরশিদ মিয়া জানান, তাদের পূর্বপুরুষও অন্ধ ছিলেন। তার মা শরবান বিবি ও বাবা আরজু মিয়াও যৌবন পাড়ি দিতে না দিতেই অন্ধ হয়ে যান। এখন তারা ৬ ভাইয়ের মধ্যে তিনিসহ ৩ জন অন্ধ। আর তিন ভাইয়ের ঘরে সন্তানদের মধ্যে বেশির ভাগই অন্ধত্ব বরণ করেছেন। এমনকি খুরশিদ মিয়াদের নাতি-নাতনীদের অনেকেই বংশের 'অভিশাপ' বয়ে বেড়াচ্ছেন।

৩ ছেলে ও ৩ মেয়ের জনক খুরশিদ মিয়া মানুষের ধারে ধারে ঘুরে টাকা সংগ্রহ করে এবং সম্পত্তি বিক্রি করে তার মেয়েদের বিয়ে দিয়েছিলেন। তার মধ্যে দু’জন স্বামীর সংসারে থাকলেও তার ছোট মেয়েকে ফিরে আসতে হয়েছে। বংশের ধারাবাহিকতায় অন্ধত্ব তাকে দুই মেয়ে নিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য করেছে।

এ বংশের যারা এখন সুস্থ রয়েছেন তারাও সঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। খুরশিদ মিয়ার ভাতিজা কামাল উদ্দিন ও নাতি আব্দুল মুমিন বলেন, পরিবারের যারা অন্ধ রয়েছেন তারা উপার্জন করেন না। সুস্থরাই কাজ করে পরিবার-পরিজনের আহার জোটান। তবে বংশের এ 'অভিশাপ' যদি তাদেরকেও পেয়ে বসে তাহলে সবাইকেই না খেয়ে মরতে হবে।

তারা বলেন, গত কয়েকদিন আগে ঝড়-তুফান তাদের ঘরের টিন উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এখন বৃষ্টি হলে তাদের কষ্টের আর সীমা থাকে না।

এ বিষয়ে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, প্রত্যেক মানুষের তার আত্মীয়-স্বজন কিংবা বংশের অন্যদের সাথে জেনেটিক মিল রয়েছে। যখন তারা নিজেদের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখনি এর প্রবণতা বেড়ে যায়। এই পরিবারটির ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে।

তিনি বলেন, প্রথমে তাদের ঘন ঘন মাথা ব্যথা হয়। তারপর ধীরে ধীরে চোখের নার্ভ শুকিয়ে তারা অন্ধ হয়ে যায়।

এই পরিবারটি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন জানিয়ে বলেন, তারা চাইলে সহযোগিতা করা হবে।

তবে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলমগীর কবির একটি পরিবারের অন্ধত্ব বরণ সম্বন্ধে কিছুই জানেন না বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি তাদের খোঁজ খবর নিব’।

ইছাকলস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুটি মিয়া বলেন, সীমন্তবর্তী উপজেলার সীমন্তে অবস্থান এ ইউনিয়নের। যার কারণে চরম অবহেলিত। আর অবহেলিত ইউনিয়নের সব অধিকার থেকে বঞ্চিত পুটামারা গ্রাম। যে গ্রামের মানুষ নৌকা ছাড়া চলাচল করতে পারে না। সেখানে অন্ধের বংশ কিভাবে ঠিকে থাকবে। তারপরও নিজ উদ্যোগে তাদের ১৫ জনকে কর্মসংস্থনের সুযোগ করে দিয়েছি। এখন চেয়ারম্যান হিসেবে ক’দিন হয়েছে দায়িত্ব পেয়েছি। তাদের চিকিৎসাসহ নাগরিক সকল অধিকার প্রদানে কাজ করব।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত