বালাগঞ্জ প্রতিনিধি

১৪ জুন, ২০১৬ ১৬:৫২

আজ বালাগঞ্জের আদিত্যপুরে গণহত্যা দিবস

সেদিন ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশেষ পার্বণের দিন। কর্মপুরুষের ব্রত। গ্রামীণ মেয়েরা কর্মপুরুষের আশীষ পেতে সকাল থেকেই ব্যস্ত ফুল-দূর্বা সংগ্রহে। সকাল ৬টার মতো হবে। পুরুষরা তখনো শয্যা ছেড়ে উঠেনি। বাচ্চারা পূজোর আনন্দে মত্ত। হঠাৎ করেই সূর্যের আলো ঢেকে গেল মেঘে। এরপর...

৪/৫টি সাজোঁয়া যান, বন্দুক হাতে মিলিটারী, রাজাকার... আর কথা বলতে পারেননি রমলা দেবী। ১৯৭১ সালের ১৪ই জুন সন্ধ্যায় বালাগঞ্জের বড়ভাগা নদী ডিঙ্গিয়ে স্বামীসহ দেশ ছাড়ার পর আর এ মুখো হননি। বর্তমানে ভারতে ২ পুত্র, পুত্রবধু, নাতি-নাতনি নিয়ে বাড়ন্ত সংসার রমলা দেবীর। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে ভেঙ্গে পড়েন প্রবল কান্নায়। আসামের শিলচরে আলাপকালে তিনি একটি কাঁচের বোতলে রাখা মাটি দেখিয়ে বারবার বলতে থাকেন, ‘এ আমার দেশের মাটি। বাংলার মাটি। বাপ-দাদার মাটি... শেখ মুজিবের মাটি...জয় বাংলার মাটি...।’ শেষ পর্যন্ত তার কান্না জড়ানো কথাগুলো প্রলাপের মতো শোনায়।

১৪ই জুন বালাগঞ্জের আদিত্যপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে আদিত্যপুর ও এর পার্শ্ববর্তী গ্রামের ৬৩জন সাধারণ মানুষ পাকবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন আদিত্যপুর স্কুল মাঠে। রাজাকার বাহিনীর হাতে সতিত্ব হারান প্রায় ২০ মহিলা। রমলা দেবী তাদেরই একজন। মানুষরূপী পাক হায়েনা আর এদেশীয় একশ্রেণীর কুকুর যখন তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন তিনি সদ্য বিবাহিতা।

সকাল আটটার দিকে ৪টি সাঁজোয়া জিপ নিয়ে ২৫-৩০ জন পাকিস্তানী সেনা এসে হাজির হলো আদিত্যপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। একান-ওকান ঘুরে গ্রামের প্রতিটা মানুষের কাছে পৌঁছে গেল শকুনের আগমনী খবর। ভয়ে রক্তশূন্য হয়ে পড়া মহিলারা সতিত্ব রক্ষার্থে দিক-বেদিক ছুটাছুটি শুরু করলেন। বালাগঞ্জ থানা রাজাকার কমান্ডার আব্দুল আহাদ চৌধুরী (ছাদ মিয়া), লতিবপুরের লাল মোল্লা, মসরু মিয়া, রুস্তম আলী কয়েকজন গ্রামে এসে জানালো ভয় নেই। এরা মারতে আসেনি বরং বাঁচার পথ দেখাতে এসেছে। সবাইকে নিয়ে স্কুল মাঠে মিটিং হবে। কার্ড দেওয়া হবে। শান্তি কমিটির কার্ড।

তারপরও কিছুদিন আগে বালাগঞ্জে ঘটে যাওয়া একাধিক হত্যাকাণ্ডে আস্থা রাখতে পারে না মানুষ। কেউ লুকিয়ে পড়লো খাটের নীচে কেউ বা বাড়ীর পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে। রাজাকাররা প্রায় ৫ঘন্টা রাধাকোনা, আদিত্যপুর, সত্যপুর, নারায়নপুর গ্রাম তছনছ করে পুরুষদের ধরে এনে আদিত্যপুর প্রাইমারী স্কুল মাঠে জড়ো করে। পাকবাহিনী শান্তি কার্ড দেওয়ার ঘোষণাকে প্রহসনে পরিণত করে ৬৫ জন পুরুষকে রশি দিয়ে লাইনে নির্বিচারে গুলি চালায়। বাঁচাও বাচাঁও শব্দে কেঁদে উঠলো পুরো গ্রাম। রাজাকার বাহিনীর হাত থেকে সম্ভ্রম বাঁচাতে গ্রামের মহিলারা তখন গ্রামের পূর্বদিক দিয়ে পালানোর সুযোগ খুঁজছে। তবু এ দেশীয় হায়নার কবলে সতিত্ব বিসর্জন দেয় প্রায় ২০মহিলা, শতাধিক বাড়িতে লুন্ঠন চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় ৭ঘন্টা অবস্থান করে গুলিতে আহতদের মৃত্যু নিশ্চিত করে পাকবাহিনী আদিত্যপুর ত্যাগ করে। যাওয়ার সময় এক ষোড়শীকে ধরে নিয়ে যায় চকের বাজার রাজাকার ক্যাম্পে। পানি পানি করতে করতে স্কুল মাঠে শহীদ হন ৬৩জন। গুলিতে মরার ভান করে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান শিব প্রসাদ সেন ও সুকময় দেব। তারা আজীবন তাদের শরীরের একাধিক জায়গায় গুলির চিহ্ন নিয়ে বেঁচেছিলেন।

এতো বড় অঘটনের পর এলাকা ছেড়ে পালালো আদিত্যপুর ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন। অন্যদিকে লাশের পঁচা গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। ১৭ই জুন রাজকাররা আবার এলো আদিত্যপুরে। এবার লুন্ঠন বা হত্যা নয়। সংবাদ গণমাধ্যম থেকে আড়াল করতে কোন রকম ধর্মীয় বিধান ছাড়াই তারা লাশগুলো স্কুল মাঠে মাটি চাঁপা দেয়।

২২শে জুন  মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানীর উপস্থিতিতে মাটি খুঁড়ে লাশ বের করা হয়। তারপর পোস্টমর্টেমের জন্য প্রেরণ করা হয় সিলেট সদর হাসপাতালে। সেখানে দেশী ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনে লাশের সংখ্যা গণনা করা হয়। তারপর লাশগুলো আবার আদিত্যপুর এনে বর্তমান গণকবরে সমাহিত করা হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত