২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৫:৩৯
হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে নারী শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান রেখে চলছে মনতলা অপরুপা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যায়তন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে বিদ্যালয়টি আপন মহিমায় উদ্ভাসিত।
শিক্ষার আলো ছড়িয়ে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধির পাশাপাশি এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এলাকার কুসংস্কার দূরীকরণের ক্ষেত্রেও ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন আর সফলতার ধারা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মাধবপুর উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার পূর্বে মনতলা রেলওয়ে ষ্টেশনের দক্ষিণে মনতলা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পাশে সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা নির্মল পরিবেশে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে।
জানা যায়, ১৯৯৩ সালে এলাকার কয়েকজন সমাজ সচেতন শিক্ষানুরাগী একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সে সময় উপজেলার বহরা ইউনিয়নের ৪৩টি গ্রামের মধ্যে কোন বালিকা বিদ্যালয় ছিল না। আজও বহরা ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে অপরুপা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যায়তন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। নারী শিক্ষার ভাল প্রতিষ্ঠান না থাকায় সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েই মেয়েরা লেখাপড়ার ইতি টানছিল। সমগ্র বহরা ইউনিয়নে শিক্ষার হার ছিল তখন মাত্র ৪০ শতাংশ।
অনেকেই বহু কষ্ট করে উপজেলা সদরে প্রেমদাময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছিল, তবে সেই সংখ্যাটাও ছিল খুবই সীমিত। সেই সময়ে বহরা ইউনিয়নে নারী শিক্ষা ছিল বদ্ধ পানির মতো স্থিমিত। এমন পরিস্থিতিতে এই শিক্ষা বঞ্চিত বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার দ্যুতি ছড়িয়ে দিতে তরুণ শিক্ষিত সমাজ সেবক মোশাররফ হোসেন খান পলাশ, মজিবুর রহমান বাহার, ইউনুছ আলী মেম্বার, অবিনাশ চন্দ্র দেব প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ স্কুল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন।
বিদ্যালয়টি ২০১০ সালের ৩১ শে মার্চ এমপিওভুক্ত হয়। অপরুপা মাধ্যমিক বিদ্যায়তনটি জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত অবিশ্রান্তভাবে নারী শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে প্রজ্বলিত করার মহান দায়িত্ব পালন করে চলছে। প্রতিষ্ঠার পর হতেই ভালো ফলাফলের অর্জনের জন্য বিদ্যালয়টি সুনাম অর্জন করে আসছে। এসএসসি, জেএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়রে শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে। বিদ্যালয়টিতে ৩ কক্ষ বিশিষ্ট পাকা ভবনসহ ১টি সেমি পাকা টিনসেড ভবন রয়েছে। ভবনগুলো বিভিন্ন ফলজ ও বনজ বৃক্ষের ছায়ায় ঘেরা। ৭৮ শতাংশ জমির ওপর বর্তমানে বিদ্যালয়টি অবস্থিত।
বিদ্যালয়টি শুরু থেকে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আলহাজ্ব আবু ছায়েদ মোল্লা। শিক্ষকেরা ছাত্রীদের স্নেহ আর পরম আন্তরিকতার সাথে পাঠদান করায় প্রতিনিয়ত পরীক্ষার ফলাফলে সফলতা আসতে থাকে আশাতীত। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই অপরুপা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যায়তন নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে নিতে সক্ষম হয়। চারদিকে বিদ্যালয়টির সুনাম আর সুখ্যাতি খুব অল্প সময়েই ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি বছর পাসের হার ৯৮%-১০০% পর্যন্ত হয়ে থাকে।
অপরুপা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যায়তনটি প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে থেকে অদ্যাবধি মোশাররফ হোসেন খান পলাশ প্রধান শিক্ষক হিসাবে গুরু দায়িত্ব পালন করে চলছেন। তিনি এলাকাবাসীকে দায়বদ্ধতায় ফেলে দিয়েছেন আন্তরিকতার বন্ধনে আঁকড়ে ধরে। প্রধান শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতির সেবাধর্মী মানসিকতার কারণে বিদ্যালয়টি এগিয়ে চলছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে। ফলে ২০১০ সালে অপরুপা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যায়তনটি এমপিওভুক্ত হয়। দুঃখ-কষ্ট আর বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পান বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা আর কর্মচারীবৃন্দ। দীর্ঘ দিন নিজে না খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত কাজ করে তারা মহৎ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত থেকে শেষ পর্যন্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস গ্রহণ করেন। অবশ্যই প্রথম পর্যায়ে এমপিওভুক্ত না হওয়ায় কিছুটা হতাশ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যা অবশ্যই এখন নেই।
বর্তমানে ১০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা আর ২ জন কর্মচারী প্রায় ৫ শতাধিক ছাত্রীকে মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছেন। শিক্ষার মান ভালো থাকলেও দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বিদ্যালয়ের পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ও ভালো ভবন নেই। শিক্ষা সফর করাও সম্ভব হয় না। বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠান বাস্তবায়ন হলেও বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের চরম অভাব রয়েছে।তারপরও খেলাধুলায় বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গ্রাম্য পরিবেশে এক আবহে গোলাপি-সাদা সালোয়ার কামিজের নিজস্ব পোষাকে ছাত্রীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়। আধা-পাকা টিন শেড ভবনে অত্যন্ত কষ্টের মাঝে বিভিন্ন উৎসব/পার্বণ পালন করে থাকেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সদস্যরা আন্তরিক হওয়ার কারণে নিয়মিত সভা হয়ে থাকে।
মাধবপুর উপজেলার দক্ষিণ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম নারী শিক্ষা বিদ্যাপীঠ এ অপরুপা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নসহ সকল সমস্যার সমাধান করা খুবই জরুরি। আর সেটা করা সম্ভব হলেই মাধবপুর উপজেলার মধ্যে এক অনন্য সফলতা অর্জন এবং অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে বিদ্যালয়টি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু সু-দৃষ্টির অপক্ষো রয়েছে এলাকার সর্বস্তরের জনগণ।
অপরুপা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যায়তনের প্রধান শিক্ষক মোশাররফ হোসেন খান পলাশ জানান, প্রতিবছর এ বিদ্যালয় থেকে এক ঝাঁক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী নিজেকে বৃহত্তর জীবনের মুখোমুখি করার মিছিলে যুগ দিচ্ছে। এসব সবুজ মনের শিক্ষার্থীরা আগামীতে সম্পন্ন মানুষ হবে,আলোকিত মানুষ হবে এবং দেশে বিভিন্ন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে এই বিদ্যালয় ও জনপদের নাম উজ্জ্বল করবে এমন প্রত্যাশা আমাদের। বিদ্যালয়টির অনেক সমস্যা রয়েছে এ সকল সমস্যা সমাধানে সরকারের সু-দৃষ্টি কামনা করি।
আপনার মন্তব্য