সিলেটটুডে ডেস্ক

০১ নভেম্বর, ২০১৭ ১৭:০০

বোমা মেশিনের তাণ্ডব থেকে জাফলং রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি

বোমা মেশিনের তাণ্ডব থেকে জাফলংকে রক্ষার জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।  প্রধানমন্ত্রীর সরেজমিন পরিদর্শনও প্রত্যাশা করেছে সংগঠন দুটি।

বুধবার (১ নভেম্বর) বেলা ১১টায় সিলেটের জেলা প্রশাসক কার্যালয় চত্বরে পরিবেশ উন্নয়ন ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণ কমিটি এবং জাফলং পর্যটন উন্নয়ন পরিষদ নামের জৈন্তা-গোয়াইনঘাট কেন্দ্রিক দুটি সংগঠন এ মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে।

জৈন্তা-গোয়াইনঘাট থেকে অংশ নেয়া প্রায় তিন শতাধিক স্থানীয় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শহিদুল ইসলাম চৌধুরী এ স্মারকলিপি গ্রহণ করেন ।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সিলেটের জাফলং । জাফলং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেশের নানা প্রান্তের পর্যটকেরা সিলেট বেড়াতে আসেন । কিন্তু বিগত দুই দশক ধরে বোমা মেশিন নামক যন্ত্র দানবের তাণ্ডবে জাফলং-এর নির্মল প্রকৃতিকে নির্মমভাবে লণ্ডভণ্ড করা হয়েছে । ভয়াবহভাবে বিপন্ন করা হয়েছে পরিবেশ-প্রতিবেশ, যা জাফলং পরিদর্শনে আসা পর্যটকেরা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। দেশের সংবাদ মাধ্যমে বিরামহীন ভাবে সচিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যকলাপের সংবাদ। সচেতন নাগরিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রকৃতি ধ্বংসের এ নির্মমতা বন্ধে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন।

স্থানীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন গ্রাম, চা বাগান ও খাসিয়া পুঞ্জির মানুষেরা এ তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে নালিশ জানিয়েছেন। কিন্তু এই অপকর্ম থামানো যায়নি। এ অবস্থায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত মেশিনের সাহায্যে পাথর উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ প্রদান করে। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করেও পাথর উত্তোলন চলতে থাকে। এ অবস্থায় প্রকৃতিকন্যা জাফলংকে সুরক্ষা করার জন্য ডাউকি ও পিয়াইন নদীভুক্ত এ এলাকাকে 'পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' ঘোষণার দাবি ওঠে। শেষ পর্যন্ত আপনার ঐকান্তিক সদিচ্ছায় জাফলংকে ধ্বংসরে হাত থেকে রক্ষা করতে ২০১২ সালে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ ঘোষণা করা হয়, যা ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গেজেটভুক্ত হয় ।  

জাফলংকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া ঘোষণার গেজেটভুক্তির প্রায় আড়াই বছর অতিবাহিত হয়েছে। সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার পর যেখানে জাফলংকে শুশ্রূষা করার প্রয়োজন ছিল সেখানে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম লাগাতারভাবে চলছে। পাহাড়-টিলা ধ্বংস, নদী বিনষ্ট এবং একের পর এক শ্রমিক ও পর্যটকের মৃত্যুতে জাফলং এখন শুধু পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা নয়, মানুষের জন্যও বিপদজনক এলাকায় পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি। গত দুই দশক ধরে মেশিনের সাহায্যে পাথর উত্তোলন শুরুর পর সিলেটের সীমান্ত এলাকার এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নির্দয়ভাবে ধ্বংস করা শুরু হয়। কোটি কোটি টাকার পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে এক সময়ের সবুজ ও নির্মল জাফলংকে ধূসর মরুময় করা হয়। বোমা মেশিনের শব্দ, বালির স্তূপ, পাথর কোয়ারী নামের বিশাল বিশাল গর্ত, শত শত ট্রাকের গোঁ গোঁ শব্দে এখানে প্রকৃতির কোন নির্মলতা নেই। এখানে যা আছে তা প্রকৃতির সাথে মানুষের নির্মমতার চিহ্ন।

এ অবস্থায় সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য লীলাভূমি জাফলং সুরক্ষায় সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি। সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি সহ বোমা মেশিনের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাসমূহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টার থেকে পরিদর্শন করলেই বাস্তবচিত্র উপলব্ধি করতে পারবেন। আর আমরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি, সোনার বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিনষ্টের এ চিত্র প্রত্যক্ষ করে জাফলংসহ সিলেটের প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রগুলো সুরক্ষায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে প্রশাসনকে বাধ্য করবেন।
 
স্মারকলিপি গ্রহণকালে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বোমা মেশিন বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু দুষ্কৃতিকারীরা গোপনে মেশিন চালায়, গভীর রাতেও মেশিন চালানোর কথা জেনেছি। বোমা মেশিনের বিরুদ্ধে অবস্থান শক্ত। এখন স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
 
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সৈয়দ আমিনুর রহমান বলেন, অভিযান পরিচালনাকালে স্থানীয় মানুষের কোন সহযোগিতা পাওয়া যায় না। স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধ গড়ে উঠলেই বোমা মেশিন বন্ধ করা যাবে ।

পর্যটন উন্নয়ন ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ফয়েজ আহমদ বাবুল-এর সঞ্চালনায় ও জাফলং পর্যটন উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি আতাউর রহমান বাবুলের সভাপতিত্বে মানববন্ধন চলাকালীন সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য প্রদানকালে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, মানুষের নির্মমতায় প্রকৃতির নির্মলতা আজ ধ্বংস। জাফলং বাঁচাতে পরিবেশ আন্দোলন দীর্ঘদিন থেকে লড়াই করছে। কিন্তু স্থানীয় মানুষের বোধোদয় না হওয়ায় জাফলং-এ চলা পরিবেশ বিধ্বংসী অপকর্ম থামানো সম্ভব হয়নি। আজকে যদি স্থানীয়রা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাকে রক্ষায় এগিয়ে আসে তবে তা রক্ষা করা সম্ভবপর হবে।

তিনি বিভিন্ন সময়ে বোমা মেশিন ব্যাবহার করে জাফলংকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিচার দাবি করেন।

সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলি, জাফলং চা বাগানের ব্যবস্থাপক এস এম একরামুল কবির, জাফলং পর্যটন উন্নয়ন পরিষদের  সাধারণ সম্পাদক আধাপক মো খায়রুল ইসলাম, সারি বাচাও আন্দোলনের সভাপতি আব্দুল হাই আল হাদি, জাফলং পর্যটন উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. উমর ফারুক, এস এম একরামুল কবির, জাফলং বাচাও সামাজিক যোগাযোগ গ্রুপের এডমিন জেড জাহাঙ্গীর, স্থানীয় পরিবেশ ও পর্যটন উন্নয়ন সংগঠক হানিফ, মোহাম্মদ, হানিফ আহমদ, ইমাম উদ্দিন, তাজ উদ্দিন, আনোয়ার হোসেন, ইমরান আহমেদ দুলাল, আব্দুল মান্নান, আব্দুল কাইয়ুম, মতিউর মুন্না প্রমুখ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত