০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:২২
গ্রাম পর্যায়ে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হলেও জটিল রোগের ক্ষেত্রে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। দিন দিন সীমান্তে রোগীদের লাইন বেড়েই চলছে। কঠিন রোগ হলে এবং আর্থিক ভাবে একটু সচ্ছল হলেই সবাই চিকিৎসার জন্য ভারত ছুটছেন।
বিদেশগামী রোগী ও তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা, চিকিৎসার নামে বাণিজ্য, সঠিক রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থতা, চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, অযথা রোগ নির্ণয় পরীক্ষার পরামর্শ ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষার উচ্চমূল্যসহ নানা কারণে স্বচ্ছল রোগীরা এখন দেশের চাইতে ভারতে চিকিৎসা করাতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
জানা গেছে, বিদেশগামী রোগীদের ৮০ শতাংশই যান ভারতে। অন্যরা যান থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে। তাদের মধ্যে অনেকেই ভ্রমণ ভিসা নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান ।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ও চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর কেন্দ্রীয় মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী মনে করেন তিন কারণে বাংলাদেশ থেকে রোগীরা ভারত যাচ্ছেন বলে জানান। মানুষের আয় বৃদ্ধি, দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সঙ্কট এবং জটিল রোগের ক্ষেত্রে রোগি ও পরিবারের অস্থিতরতার কারণে বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসার জন্য ভারত যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের আয় বেড়েছে তাই সামান্য কিছু হলেই ভারত যেতে চায়। এছাড়া দেশের এক জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিপরীতে রোগী থাকে একশ', যার কারণে তারা রোগীদের সময় দিতে পারে না, কিন্তু ভারতে প্রচুর বিশেষজ্ঞ থাকায় রোগীকে প্রচুর সময় দেয়। এবং হার্ট বা ক্যন্সারের রোগী হলে পরিবারের সবাই অস্থির হয়ে যায় কোন ডাক্তার রেখে কোন ডাক্তার দেখাবে তাই তারা কয়দিন দেশীয় ডাক্তার দেখানোর পরেই ভারত যাচ্ছে নিজেদের অস্থিরতা থেকে। তিনি আরো জানান, হার্টের চিকিৎসায় বাংলাদেশ অনেক ভাল করছে।
ডা. দুলাল বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে আমরা ভারত থেকে এগিয়ে আছি। উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে আমাদের চিকিৎসা সেবা ভারত থেকে অনেক ভালো। তবে উচ্চ পর্যায়ে ভারত এগিয়ে তাদের প্রচুর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে অনেক ভাল যন্ত্রপাতি আছে।
তথ্যমতে, গত বছরে (২০১৭) মোট দুই লাখ ২১ হাজার ৭৫১ জন বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য মেডিকেল ভিসা নিয়ে ভারত গেছেন। তবে বাস্তবে এর সংখ্যা আরও বেশী কারণ যারা ভ্রমণ ভিসা নিচ্ছেন তাদের ৩০ ভাগ ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশী পর্যটকের সংখ্যা ৯ লাখ যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশী। ইমিগ্রেশন পুলিশের মতে, শুধু বেনাপোল বর্ডার দিয়েই প্রতি দিন যত লোক চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে তার পরিমাণ বছর শেষে দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ।
রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায় , বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া দেশের জন্য তাদের জন্য গৌরবের বিষয় নয়। কিন্তু জীবনের বড় কিছু নেই তাই যাচ্ছেন। দেশে বড় বড় প্রতিষ্ঠান থাকলেও প্রায়ই অনিয়ম এবং ভুল চিকিৎসা জন্য পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই এ ধরনের অনিয়মের সংবাদ প্রকাশিত হয়। ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর কারণে আত্মীয়-স্বজনদের হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
তাসনিম বিনতে আজিজ মৌলভীবাজার সরকারী কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সে প্রাইমারী স্কুলে থাকা অবস্থায় হঠাৎ তার স্মৃতি শক্তি কমতে শুরু করে। তার বাবা মৌলভীবাজার, সিলেট ও ঢাকায় মেয়ের চিকিৎসার পেছনে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচে করে নিঃস্ব হন, কিন্তু মেয়ে ভাল হয়নি। ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম বুলু জানান, আমার মেয়ের জন্য অনেক ডাক্তারের কাছে ছুটেছি শেষ পর্যন্ত ঢাকায় একজন ডাক্তার জানান অপারেশন করলে কমে যাবে আমি অপারেশন করাই এতে নতুন যন্ত্রণার শুরু হয় সব সময় মেয়ের কানে ব্যথা লেগেই থাকত । মেয়ের কষ্ট দেখে আমি তারে নিয়ে কলকাতা যাই সেখানে ডাক্তার কিছু টেস্ট করান। টেস্টের রিপোর্ট দেখে ডা: অঞ্জন মৃদু হাসেন এবং আমার মেয়ের সমস্যার জন্য কোন ওষধ না দিয়ে একটা ব্যায়াম শিখিয়ে দেন এবং কলকাতায় থেকে নিয়মিত সে ব্যয়াম করে তিন দিন পর দেখা করতে বলেন। তিন দিন পর মেয়ে অনেকটা ভাল হয়ে গেলো। পরে মেয়েকে নিয়ে দেখা ডাক্তারের সাথে দেখা করলে তিনি দেশে পাঠিয়ে দেন এবং একমাস এই ব্যায়াম করতে বলেন। সে সময় চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া আমার সে মেয়ে এখন অনার্সে পড়ে এখন পর্যন্ত আর সমস্যা হয়নি। তিনি জানান, আমি এর পর থেকে অনেক রোগীকে ভারত পাঠিয়েছি। নিজের দেশ থাকতে ভারতে পাঠাতে অবশ্যই আমার লজ্জা হয় তবে জীবন বাঁচানোর চেয়ে বড় কিছু নাই।
হবিগজ্ঞ জেলার নবীগঞ্জ পৌর এলাকার বাবুল দেব পেশায় একজন ফার্মাসিস্ট, তার বড় ভাই মারা গেছেন হৃদরোগে। তিনিও প্রায় ৪ বছর আগে তার বুকে ব্যথা অনুভব করেন । ব্যথা বাড়তে থাকায় ডাক্তারের কাছে যান কিন্তু ভাল হবার কোন লক্ষণ নেই ২টি বছর সিলেট, ঢাকার নামকরা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখান । সব ডাক্তারের একই মত হার্টে সমস্যা। নিয়মিত হার্টের ওষধ খেয়েও বুকের ব্যথা না কমে উল্টো তার শ্বাস কষ্ট দেখা দেয়।
পরে কলকাতা ডা. দেবী শেঠীর হাসপাতালে (নারায়না ইন্সটিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়িন্সেস) সেখানে ডা. কুন্তুল তার কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানালেন হার্টে কোন সমস্যা নাই তবে বুকে অন্য সমস্যা আছে। তিনি ১৩০ রুপির ওষধ দিলেন।
বাবুল দেব বলেন, আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ অথচ এর আগে আমি লাখ লাখ টাকা খরচ করেছি এবং আমার চ্ন্তিায় পরিবার ঘুমায়নি রাতের পর রাত কারণ ইতিমধ্যে হার্টের রোগে আমার বড় ভাই মারা গেছেন।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বাঘ-বাড়ী এলাকার বিশ্বজিৎ দে জানান, প্রায় ১০ বছর আগে আমার কাকার বিজয় কৃষ্ণ দের শরীর খারাপ হলে আমরা অনেক ডাক্তার দেখাই। শেষ পর্যন্ত একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার যক্ষ্মা হয়েছে জানিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন প্রায় ৩ মাস। যক্ষ্মার ওষুধ খাওয়ার পর যখন উনার শরীরের আরও অবনতি হয় আমরা উনাকে ভারতের সিএমএইচ হাসপাতালে পাঠাই সেখানে ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করে জানান উনার গ্যাসের সমস্যা, যক্ষ্মা নেই। যক্ষ্মার ওষুধ খাওয়ার কারণে শরীরের যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য ওষুধ দেন। তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন। ২ বছর আগে তার বুকে ব্যথা শুরু হলে ডাক্তার এনজিও গ্রাম করানোর কথা বলেন। ঢাকা গিয়ে এনজিওগ্রাম করাই এনজিওগ্রাম করা অবস্থায় ডাক্তার জানান হার্টে সমস্যা এখই হার্টে রিং লাগাতে হবে নয়ত বাঁচানো যাবে না। আমরা বাধ্য হয়ে সাথে টাকা জোগাড় করে ২ টি রিং লাগাই। রিং লাগানোর একমাসের ভিতরে তিনি মারা যান। আমার বিশ্বাস সঠিক চিকিৎসা আমরা পাইনি। যদিও আগের ঘটনা থেকেই দেশের চিকিৎসার উপর আস্থা হারিয়েছি ।
সিলেট পুলিশ লাইনে কর্মরত ছিলেন বীরেন্দ্র দে। একদিন অফিসে হঠাৎ বমি করতে করতে পড়েযান , সহকর্মীরা মিলে নিয়ে যায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে বলা হয় গ্যাষ্টিকের সমস্যা, বাসায় নিয়ে আসার পর আবারো বমি হয়। আবারো ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে আবারো বলা হয় গ্যাসের সমস্যা। এরপর বছরখানেক সিলেটের আরো কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হলো। কেউ বলল গ্যাস্টিক, কেউ ডায়াবেটিকস। এক বছর ধরা পড়ে ব্রেইন টিউমার। এরপর একজন নিউরো সার্জনের কাছে গেলে তিনি জানান, টিউমার ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। এখন চিকিৎসা করে আর লাভ হবেনা । এর কিছু দিন পর উনি মারা যান।
বীরেন্দ্র দে'র ভাতিজা শিপলু জানান, এ সব হয়েছে আমার সামনেই এর পর থেকে দেশের ডাক্তারদরে প্রতি আমার আস্থা নেই । রোগ ধরতেই এক বছর চলে গেলো।
সিলেটের তামাবিল সীমান্তের ইমিগ্রেশন পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) রমজান মিয়া জানান, মেঘালয়ে ভাল কোন হাসপাতাল না থাকায় এই বর্ডার দিয়ে সব চেয়ে কম রোগী ভারত যায় তবে অনান্য বর্ডার দিয়ে বেশী যাচ্ছে। এ দিক দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০/১৫ জন যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি রোগী ভারত যান বেনাপোল স্থল বন্দর। বেনাপোল ইমগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার মানুষ ভারত যাচ্ছে মেডিকেল ভিসা এবং ভ্রমন ভিসা নিয়ে। এর মধ্যে গড়ে ১ হাজারের উপরে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। ২০% মানুষ মেডিকেল ভিসা নিলেও বেশীর ভাগ ভ্রমণ ভিসায় গিয়েও চিকিৎসা করাচ্ছেন।
আপনার মন্তব্য