হৃদয় শুভ, শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি

২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ১৫:১০

ড্যান্ডির নেশায় আসক্ত শ্রীমঙ্গলের পথশিশুরা

দল বেঁধে কাঁধে বস্তা আকৃতির ব্যাগ নিয়ে হাঁটছে কয়েক শিশু। এক হাতে ব্যাগ ধরে কাঁধের ওপর ফেলে রেখেছে, অন্য হাতে ধরা একটি পলিথিন। ফোলানো পলিথিনের মধ্যে মাঝে মাঝেই মুখ ঢুকিয়ে কিছু একটি শুঁকে নিচ্ছে তারা।

যারা বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত, তারা জানেন, ওই শিশুরা খেলাচ্ছলে পলিথিনের ব্যাগের ভেতর নাক-মুখ ঢোকাচ্ছে না। এই শিশুরা ভয়াবহ ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত। সারা দেশের মতো মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পথশিশুদের মধ্যে ড্যান্ডি আসক্তি দেখা গেছে।

শ্রীমঙ্গলে পথশিশুদের অনেককে সকাল থেকে রাত অবধি শহরের বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে বা হাঁটা অবস্থায় এই নেশা করতে দেখা যায়। কাজ আর ভিক্ষাবৃত্তির পাশাপাশি এই নেশা তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ড্যান্ডি একধরনের নেশা। তীব্র গন্ধ না থাকায় এই শিশুরা যে নেশা করছে, তা কেউ ধরতে পারেন না। অল্প খরচে এই নেশা করা যায় বলে পথশিশুরা ঝুঁকে পড়ছে এতে। একজনের কাছ থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে অন্যজনের কাছে। শ্রীমঙ্গল শহরতলির বিভিন্ন বস্তি ও কলোনির নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের মধ্যে সাধারণত এই আসক্তি দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো শিশু শপিং মলসহ বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে কিছু টাকা বাসায় নিয়ে যায়, বাকি টাকা দিয়ে ড্যান্ডি নেশার সামগ্রী কিনে।

কথা হয় জাহিদ (ছদ্মনাম) নামে এক পথশিশুর সঙ্গে। আগে প্রতিদিন সে এই নেশা করত। এখন ছেড়ে দিয়েছে। তবে তার সঙ্গী ১০-১৫ জন এখনো ড্যান্ডিতে আসক্ত বলে জানিয়েছে সে।

সুমন নামের আরেকজন জানায়, ৩০ থেকে ৪০ টাকায় একধরনের জুতার আঠা, সাইকেলের টায়ারের গাম কিনে শিশুরা। বিভিন্ন দোকানে এসব গাম পাওয়া যায়। পলিথিনের ব্যাগে আঠালো ওই পদার্থ নিয়ে কিছুক্ষণ ঝাঁকানো হয়। তারপর পলিথিন থেকে নাক বা মুখ দিয়ে বাতাস টেনে নেয়। এতে করে করে তাদের কোনো ধরনের ক্ষুধা অনুভব হয় না। মনে একধরনের আনন্দ অনুভব হয়।

এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী এস কে সুমন জানান, এই ড্যান্ডির প্রধান উপকরণ জুতার আঠা। পথশিশুদের কাছে বেশি মুনাফার আশায় এই আঠা বিক্রি করছেন একধরনের অসাধু ব্যবসায়ী। তাঁরা জেনে-বুঝেই শিশুদের কাছে এসব উপকরণ তুলে দিচ্ছেন সামান্য কয়েকটি টাকার জন্য। এই পথশিশুরা পরে জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

শ্রীমঙ্গলে পথশিশুদের জন্য গড়ে ওঠা মজার স্কুলের শিক্ষিকা রুনা পাল সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম কে বলেন, ‘এসব পথশিশুর কথা ভেবে আমরা মজার স্কুল নামে একটি স্কুল তৈরি করেছি। তাদের ভালো পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। ড্যান্ডি নেশা থেকে দূরে রাখতে পড়ালেখার পাশাপাশি গানবাজনা, খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা করছি।’

তিনি আরো বলেন, পথশিশুদের মজার স্কুলে এনে ড্যান্ডি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। সমাজের বিত্তবানেরা পথশিশুদের সাহায্যে এগিয়ে এলে এই শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. জয়নাল আবেদিন টিটু বলেন, ড্যান্ডি নেশায় যেসব সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, তাতে করে শ্বাসনালীতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়। এর ফলে স্থায়ী শ্বাসকষ্ট হয়, মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ নেশায় আসক্ত শিশুদের খাবারের রুচি কমে যায়, ক্ষুধা অনুভূত হয় না।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত