জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া

২০ অক্টোবর, ২০২৫ ২১:৩৪

আগামী পাঁচ বছরে আমরা কোথায় যাচ্ছি?

প্রথম অংশ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জন্য ছিল একটি যুগ-সন্ধিক্ষণ মুহূর্ত। ওই দিন দীর্ঘ টানা পনেরো বছরের এক ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন হয় এবং জনতার বিপ্লবী জোয়ারে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সিভিল প্রশাসনসহ পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে। জুনে শুরু হওয়া কোটা বিরোধী সংস্কার আন্দোলন দ্রুতই সর্বগ্রাসী বিস্ফোরণে রূপ নেয় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুরনো ফ্যাসিবাদী কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলে। ঘটনাটির আকস্মিকতা বিপ্লবী শক্তি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ সবাইকে বিস্মিত করে। এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭১-এ, যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রেখে যাওয়া পূর্ব পাকিস্তানের ধ্বংসস্তূপ থেকে ‘বাংলাদেশ’ আবির্ভূত হয়েছিল।

৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর ও আধুনিকায়নের একটি সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। বর্তমানে কিছু কমিশন কর্তৃক যেসব টুকরো-টাকরা সংস্কারের কাজ চলছে, তার বদলে ফরাসি বিপ্লবের স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব—এই তিন আদর্শকে ভিত্তি করে সার্বিক সামাজিক পুনর্গঠনের দ্বার উন্মুক্ত হয়। বিশৃঙ্খল গণতন্ত্র থেকে বেরিয়ে বংশতন্ত্রমুক্ত একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়। জাতীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তির সম্ভাবনা প্রবল হয়ে দেখা দেয়। সকল নাগরিকের সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথ খুলে যায়। সেই সাথে ছদ্ম ‘ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে চলা বৈষম্য দূর করে প্রকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সম্ভাবনা জোরালো হয়।

দুঃখজনকভাবে, দেশটি ভিন্ন পথে গেল। সুযোগ গ্রহণের বদলে দ্রুত পরাজিত দলের রেখে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করে পুরনো কাঠামোকেই আবার জোড়া লাগানো হলো। পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সিভিল প্রশাসন—সবই দলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে গেল; গুরুত্বপূর্ণ পদ হঠাৎ করে দখল হলো; এবং জুলাই বিপ্লবের দোষীদেরকে শাস্তি দেওয়ার আগেই সরকারি নিয়ম ভেঙে দ্রুত পদোন্নতি ঘটতে থাকলো। আগের শাসকগোষ্ঠীর সম্পদ ও ব্যবসা হাতবদল হলো এবং বেআইনি চাঁদাবাজি চলতে থাকলো। দেশের সর্বত্র বিভিন্ন পোস্টারে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবির বদলে নতুন মুখমণ্ডল শোভা পেতে লাগল। মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে নির্মিত বিভিন্ন তোরণে বিএনপি নেতৃবৃন্দের ছবি আমাদের স্পষ্টতই বুঝিয়ে দিল যে পুরনো চর্চাই অব্যাহত থাকবে। সারকথা,পুরাতন শিকারির দলকে একটি নূতন শিকারির দল প্রতিস্থাপন করল।

বিপ্লবের অবক্ষয় শুরু হয় অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন থেকেই। প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধানের তত্ত্বাবধানে আসিফ নজরুল, ছাত্রনেতারা ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সদস্য বাছাই করেন। নতুন দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা আছে কি না, সে বিচার না করেই সবাই নিজ দলের লোক ঢুকাতে তৎপর হন। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. (মুহাম্মদ) ইউনুসকে নিয়োগ দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হলেও, অন্য সদস্যদের রাষ্ট্রপরিচালনার প্রাজ্ঞতা কম ছিল। তারা তাদের পৃষ্ঠপোষক দলের নির্দেশমুখী ছিলেন—ফলে শুরু থেকেই সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে।

ড. ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা করা নিঃসন্দেহে একটি ভাল সিদ্ধান্ত ছিল। বিপ্লবের পর তিনি জাতীয় ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। তাঁর বৈশ্বিক সুনাম ভারতের ‘ইসলামী মৌলবাদ’ ও ‘সংখ্যালঘু’ কার্ডকে অকার্যকর করে দেয় এবং বাংলাদেশকে পশ্চিমা বলয়ের সঙ্গে নতুনভাবে সংযুক্ত করে। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দেশের অর্থনীতিকে মুক্তপতন থেকে ঘুরিয়ে স্থিতাবস্থায় আনে।

তবে, ইতিবাচক গুণাবলী থাকা স্বত্বেও ড. ইউনুস রাষ্ট্র পরিচালনার কাদাজলে নামার মতো নির্মম বাস্তববাদী নন। তাঁর বয়সও বাড়ছে দ্রুত। তবুও দেশটির তাকে প্রয়োজন ছিল সঙ্কটকালের দিশারি হিসেবে। অন্যদিকে সরকার প্রতিটি পদক্ষেপে হোঁচট খেতে থাকে কেননা রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিএনপি নির্বাচনের নামে যত দ্রুত সম্ভব তাদের জায়গা নেওয়ার জন্য অবিরাম চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।

উপদেষ্টা নিয়োগে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় বিএনপি। তারা পছন্দের উপদেষ্টাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিপদে বসাতে এবং আলী ইমাম মজুমদারকে ড. ইউনুসের বিশেষ সহকারী হিসাবে নিয়োগ দিতে সমর্থ হয়। এই সেতুবন্ধ দিয়ে তারা পুলিশ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজেদের পছন্দের লোক নিয়োগ করে। ফলশ্রুতিতে দেশে চারটি পৃথক ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি হয়—একটি ড. ইউনুসের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকার, একটি বিএনপির অধীনে, একটি সেনাবাহিনীর অধীনে ও একটি ছাত্রদের অধীনে। বর্তমানে এই চারটি ক্ষমতাকেন্দ্র চারটি সমান্তরাল প্রশাসন চালাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই, এদের স্বার্থগুলো প্রায়শই সাংঘর্ষিক হয় এবং সরকারের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে।

ছাত্রবিপ্লবীদের ভুল ছিল - নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে সামনে এগোনোর বদলে বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোয় যোগ দিয়ে নিজেদের দল গঠন করা। জুলাই ঘোষণার বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত—এ দুটিই তাদেরকে পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোতে ঠেলে দেয়। অভিজ্ঞতা ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে তারা বিএনপি ও অন্যান্য দলের প্রভাবে দল গঠন করে, যার ফলে তাদের বিপ্লব-পরবর্তী আধিপত্য ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে দেশকে ঢালাও পুনর্গঠনে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে পুরোপুরি সমর্থন দিতে তারা ব্যর্থ হয়। যে পুরনো সিস্টেমকে ভেঙে তারা নতুন একটি সিস্টেম গড়তে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তারই ফাঁদে তারা আটকা পড়ে। ফলে দুর্বল ও পর্যাপ্ত জনসমর্থনহীন অন্তর্বর্তী সরকারকে সেইসব গোষ্ঠী চাপে রাখে, যারা আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনে কখনও ছিল না, কিন্তু বিপ্লবের ফসল কুড়াতে ও ক্ষমতায় আসার জন্য উন্মুখ ছিল। এভাবেই আমরা আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার বিরল সুযোগ হাতছাড়া করে ফেলি।

দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের দ্বারা নিপীড়িত বিএনপি এখন এক প্রতি-বিপ্লবী শক্তি। তারা ফ্যাসিবাদী শাসকদল ও তার ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধকরণ, প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন, সংবিধান বাতিল, গভীর কাঠামোগত সংস্কার—এসব বিপ্লবী পদক্ষেপের ক্রমাগত বিরোধিতা করে যাচ্ছে। বিএনপি স্থিতাবস্থার (status quo) পক্ষপাতী, কেননা দ্বি-দলীয় রাজনীতিতে তাদের পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রায় অনুপস্থিত যা তাদেরকে সহজেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ছাত্রশক্তি তাদের কাছে একটি বিরাট ধাঁধা। এ কারণে আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত করে ছাত্রশক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করতে তারা অনাগ্রহী। তাদের ধারণা এই নতুন রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হলে নতুন নতুন মাত্রা (dimension) সৃষ্টি করবে যা তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার যে সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা নষ্ট করে দেবে। বরঞ্চ ছাত্রশক্তিকে যদি পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তবে তা একসময় ‘নাগরিক ঐক্য’র মতোই ক্ষয়ে যাবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ পরস্পরবিরোধী স্বার্থ ও মতাদর্শের এক জটিল জালে আবদ্ধ। কেয়ারটেকার সরকার না জাতীয় ঐক্য সরকার; সুষ্ঠু নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি সম্ভব না; আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রসংগঠন থাকবে কি থাকবে না; সংস্কার আগে না নির্বাচন আগে; পুরনো সংবিধান না নতুন সংবিধান—এমন বহু প্রশ্নে তর্ক চললেও কোনো ঐক্যমত দেখা যাচ্ছে না। বরঞ্চ ব্যক্তিবিশেষ ও রাজনৈতিক দলসমূহ নিজেদের সম্পদ ও প্রভাব খাটিয়ে প্রাধান্য অর্জনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।


ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং এ কারণে আমরা কোন দিকে ধাবিত হচ্ছি তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন। তবে দেশি-বিদেশি শক্তির ভূমিকা, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, রাষ্ট্রের আচরণের ঐতিহাসিক ধারা, শাসনের গুণমান এবং বর্তমান সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করলে সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ধারণা করা যায়।

রাষ্ট্রের আচরণ নির্দিষ্ট সময়সীমায় পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন; তবে স্বল্পমেয়াদি—ধরা যাক আগামী পাঁচ বছর—তুলনামূলকভাবে অনুমানযোগ্য। তাই বর্তমান বিশৃঙ্খল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে এক বিশ্লেষণ প্রয়াস নেওয়া হলো।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই সময়কাল মিলে যাচ্ছে

ট্রাম্প, শি জিনপিং, নরেন্দ্র মোদি ও মিয়ানমার জান্তার শাসনপর্বের সাথে। এ সময়কালে সম্ভবত রোহিঙ্গা সংকট বহাল থাকবে; আরাকান আর্মি (AA) হয়তো কিছু এলাকা দখল বাড়াবে, কিন্তু পুরো রাখাইন মুক্ত করতে পারবে না।

‘চার শক্তি’—ভারত, সেনাবাহিনী, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—নিজ নিজ স্বার্থে দ্রুত নির্বাচনের জন্য চাপ দেবে। ছাত্রসমাজ ও জামায়াতে ইসলাম—দল হিসেবে হোক বা আলাদা শক্তি হিসেবে হোক—শক্ত প্রতিরোধ গড়ার সক্ষমতা বজায় রাখবে। অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচন, সংস্কার, সুশাসন, এবং আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধকরণের মতো ইস্যুতে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলের চাপে থাকবে।

এই উপাদানগুলো বিবেচনায় রেখে—সম্ভাব্য ফলাফল ও তার প্রভাব বিশ্লেষণ করা যাক।

ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক-নিরাপত্তা সমীকরণে সবসময়ই একটি প্রভাবশালী পক্ষ। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়, এরশাদ আমল, এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভারতের প্রভাব ছিল প্রবল। ভারত সচেতনভাবেই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে সরিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনে ঠেলে দেয় এবং নিজেদের স্বার্থে আওয়ামী লীগের এই শাসনতান্ত্রিক চরিত্র পরিবর্তনকে কাজে লাগায়। বিনিময়ে প্রতিটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের পর ভারত আওয়ামী লীগ সরকারকে বৈধতা দেয় এবং তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আদায় করে নেয়। ৫ আগস্ট ভারতের ১৭ বছরের আধিপত্য কয়েক দিনের মধ্যে ধ্বসে পড়ে যা সাউথ ব্লকের সবাইকে হতভম্ব করে দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতিকর্মী, গণমাধ্যম, আমলাতন্ত্র, ফ্যাশন হাউস—সব জায়গায় ভারতের ‘সফট পাওয়ার’ বিপর্যস্ত হয় এবং ‘ইসলামি মৌলবাদ’ ও ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’ এর মতো পুরনো কার্ডগুলো ভোঁতা অস্ত্রে পরিণত হয়। ভারতের জন্য এটি ছিল ‘টুইন টাওয়ার’ বিধ্বস্ত হওয়ার মতো ঘটনা। এটা এখন স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে ভারতকে আবার শূন্য থেকে সবকিছু গড়ে তুলতে হবে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের নৈকট্যের কারণে বাংলাদেশ ভারতের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অরুণাচল প্রদেশের উপর চীনের দাবী, এলাকায় বহুজাতির সমাহার এবং তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা—এসব বিবেচনায় ভারতের আশঙ্কা যে এ অঞ্চল যেকোনো সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। শিলিগুড়ি করিডোরে চীনা হামলা হলে রাজ্যগুলো মূলভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তখন বাংলাদেশের মাধ্যমে ট্রানজিটই হবে উত্তর-পূর্বে যাতায়াতের একমাত্র পথ। এছাড়া এলাকাটির উন্নয়ন ও সম্পদ ব্যবহারের জন্যও ট্রানজিট অপরিহার্য। ভারত আশা করে যে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কয়েকটি করিডর সৃষ্টির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করে সেখান থেকে আসাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, অরুণাচল, ত্রিপুরা, মিজোরামে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করবে। শেখ হাসিনার সময়ে ভারত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারসহ ট্রানজিট সুবিধা পাকাপোক্ত করে। কিন্তু তাঁর অপসারণের পর অন্তর্বর্তী সরকার তা বাস্তবায়নে ইতস্তত করছে যা ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ। পিনাকী ভট্টাচার্যের ‘বয়কট ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি ও ভিসা-নিষেধাজ্ঞা ইস্যু এই টানাপড়েনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ভারতীয় প্রবাসী পেশাজীবীরা বাংলাদেশে কাজ করা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। দিল্লি কীভাবে এই জট ছাড়াবে—তা অস্পষ্ট।

অনেকে ভেবেছিল মোদি ‘অলিভ ব্রাঞ্চ’ বাড়িয়ে ড. ইউনুসের সাথে সম্পর্ক মেরামত করবেন। বাস্তবে ভারত নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে অনাগ্রহী। ভারত শেখ হাসিনা ও তাঁর কর্মীদের আশ্রয় দিয়েছে এবং সীমানার ভেতর থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে কোন বাধা দিচ্ছে না। ড. ইউনুসের সাথে সাক্ষাৎ প্রত্যাখ্যান, বাংলাদেশি চিকিৎসা-প্রত্যাশীদের ভিসায় বিধিনিষেধ, বিপ্লব ও অন্তর্বর্তী সরকারবিরোধী প্রচার—সবই মোদির বিরূপ মনোভাবের ইঙ্গিত। ভারত বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহকে মেনে নেয়নি বরং পুরনো স্থিতাবস্থা (status quo) ফিরিয়ে আনতেই অনড়।

ঐতিহাসিক বাজি ও দ্রুত নির্বাচনের চাপ
ভারত দীর্ঘদিন একটি দলের (আওয়ামী লীগ) উপর সর্বস্ব বাজি ধরেছিল। কিন্তু বাজির ফল উল্টে গেলে বর্তমানে তাদের একমাত্র পথ হচ্ছে দলটিকে নতুন করে জোড়া লাগিয়ে শেখ হাসিনাকে আবার শীর্ষে বসানো। সে লক্ষ্যে তারা দ্রুত নির্বাচনের জন্য চাপ দেবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার থাকলে আওয়ামী লীগের পক্ষে ক্ষমতায় ফেরা কঠিন। তাদের ধারণা এই নির্বাচন তিন লক্ষ্য সাধন করবে: (১) ড. ইউনুসকে সরানো, (২) ছাত্রবিপ্লবীদের দাবীকৃত সংস্কার থামানো যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূদৃশ্য পাল্টে দিতে পারে, (৩) দুর্বল রাজনৈতিক সরকার ফিরিয়ে আনা—যার ফাঁক দিয়ে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান সম্ভব।

লক্ষ্য অর্জনে ভারতের দুই পথ
প্রথম পথ—বিএনপিকে সঙ্গে নেওয়া। তাৎক্ষণিক ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষায় বিএনপি ভারতের অঙ্কের সঙ্গে মিলে যায়। ভারত প্রথমে বিএনপির সাথে বোঝাপড়া পাকাপোক্ত করবে (যদি এখনও না হয়ে থাকে) এবং সেই অংশীদারিত্বকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে ইউনুস সরকারকে দ্রুত নির্বাচনে ঠেলে দেবে। এতে বিএনপির ছায়ায় আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান সহজ হবে। তবে বিএনপি পূর্ণমেয়াদ পাবে নাকি পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগ মেয়াদ শেষ করার পূর্বেই তাদের সরিয়ে দেবে—সেটি অনিশ্চিত।

ভারত তাড়াহুড়ো করছে। শেখ হাসিনার বয়স এগিয়েছে, বিকল্প নেতৃত্ব দুর্লভ। তাই ভারত দ্রুত এগোবে বলেই ধারণা। ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় পথ—সশস্ত্র বাহিনীকে বেছে নেবে। আইন-শৃঙ্খলা অবনত হলে সামরিক হস্তক্ষেপে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করবে। কয়েক বছর পর নিরাপদ প্রস্থানের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জয় নিশ্চিত করতে সামরিক বাহিনীকে উৎসাহিত করবে। তবে গত একবছরের উপর মাঠে দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে সেনাবাহিনী ক্লান্ত। এ ধরনের প্রলোভনে তারা কতটা প্রলুব্ধ হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবুও ভারত চাইবে সেনাবাহিনী যেন দ্রুত নির্বাচনের জন্য ইউনুস সরকারকে চাপের মুখে রাখে।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প-ফ্যাক্টর
ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে। বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক তাই অনিশ্চিত। কেউ কেউ বলেন, ড. ইউনুসের ডেমোক্র্যাট-সম্পর্ক বাধা হতে পারে; কিন্তু ট্রাম্পের বাস্তববাদী ভঙ্গি তার সম্ভাবনা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতি সর্বদাই ভারতমুখী; পাকিস্তান-বাংলাদেশ প্রান্তিকেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কতটা ভারতের লেন্সে দেখবে তা শিগগিরই পরিষ্কার হবে। মোদির সঙ্গে বাংলাদেশের বিষয়ে আলাপকালে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া এবং বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক ট্যারিফ ঘোষণা দুজনের আন্তর্জাতিক এজেন্ডার পার্থক্যকেই নির্দেশ করে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি আগাম বলা কঠিন; তবে আক্রমণাত্মক ধারা, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং আমেরিকা-বান্ধব শুল্ক নীতি অব্যাহত থাকবে। ‘ট্রাম্পীয় বাস্তবতা’ আমাদের টেক্সটাইল খাতে কী প্রভাব ফেলবে—তাই নির্ধারণ করবে আমাদের আন্তর্জাতিক অবস্থান। দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে মীমাংসিত হতে দিতে তিনি আগ্রহী। তবে এখানকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তিনি নাক গলাতে নারাজ। ফলে ভারতের ‘মৌলবাদ’ ও ‘সংখ্যালঘু’ কার্ড দিয়ে বাংলাদেশকে চাপে রাখার সুযোগ কমবে। পরবর্তী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য-নিষেধ বা বড় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

ইন্দো-প্যাসিফিক ও বাংলাদেশ
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বাংলাদেশে প্রভাব ফেলেছিল; দ্বিতীয়বার কতদূর ঠেলেন, তার ওপর চীনের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ নির্ভর করবে। চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে ভর করে, মার্কিন ও ভারতীয় স্বার্থের ক্ষতি হয় এই যুক্তিতে ভারত তিস্তা ও বিআরআই প্রকল্প আটকে দিতে চাইবে। ভারত শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত ট্রানজিট চুক্তি বাস্তবায়নে চাপ দেবে এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামী চর্চা দমনের চেষ্টা করবে। ড. ইউনুসের ব্যক্তিত্ব ও বৈশ্বিক যোগাযোগ এসব প্রতিরোধ করতে পারে; কিন্তু বিএনপি বা অন্য কোনো নির্বাচিত সরকারের সেই কূটনৈতিক সক্ষমতা থাকবে কি না—সন্দেহ থাকে। কূটনৈতিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী পাঁচ বছর কঠিন হবে।

চীন: সুযোগ ও দুশ্চিন্তা
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন চীনের জন্য যেমন সুযোগ এনেছে তেমনি চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। ভারতের সফট পাওয়ার দুর্বল হওয়ার কারণে চীনের জন্য প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি হয়। তবে আগের বিনিয়োগ ও শেখ হাসিনার মতো স্বচ্ছন্দ ব্যবসায়িক অংশীদার হারানোর শঙ্কা থেকে যায়। ২০১৯ থেকে চীনের বিনিয়োগ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার; বর্তমানে ১০ বিলিয়ন ডলারের ১৪টি প্রকল্প চলছে। জুলাইয়ে বেইজিং সফরে ২০টির বেশি চুক্তি সই হয় যার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ভারতের চাপে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ও তিস্তা প্রকল্প না পেলেও চীন ‘অপরচুনিজম’ ও ‘প্র্যাগমাটিজম’ নীতিতে হাসিনার সঙ্গে সৌহার্দ্য সম্পর্ক বজায় রাখে। হঠাৎ শেখ হাসিনার পতনে চীন বিভ্রান্ত হলেও দ্রুত বিনিয়োগ ও চুক্তি রক্ষায় ভেক্টর বদলায়। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি প্রো-চায়না হলেও আওয়ামী লীগের প্রতি চীনের নমনীয়তার (২০১৯-এর পরপর চীনা রাষ্ট্রদূতের অভিনন্দন স্মরণীয়) কারণে তারা ক্ষুব্ধ ছিল। এ জন্য চীন আগের মতোই ‘অনুকূলতা’ ও ‘বাস্তববাদ’-এর দ্বৈত নীতিতে উত্তেজনা কমাতে চাইবে এবং বিপ্লবী শক্তি ও পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন সমীকরণ ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

মিয়ানমার: স্থায়ী চাপ
মিয়ানমারের ভূরাজনীতি ঢাকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রবণতা বহাল থাকতে পারে। বামার জাতি অধ্যুষিত এলাকায় সরকারপন্থীরা এখনও প্রভাবশালী। “ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট”-এর সশস্ত্র শাখা “পিপলস ডিফেন্স ফোর্স” জাতিগত সংঘাতে গতি হারাচ্ছে। বাংলাদেশের সীমানা ঘেঁষা চিন ও রাখাইন এখন চীনাপন্থী উপজাতীয় সশস্ত্রগোষ্ঠী, বিশেষত “চিন ন্যাশনাল আর্মি” ও “আরাকান আর্মি”-র দখলে। ঢাকার সঙ্গে এদের সরাসরি কোনো যোগাযোগ নেই; বেইজিং তা করে দিতে পারে। এ ছাড়া “কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট” (KNF)-এর মতো বিদ্রোহীগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম-ভিত্তিক হলেও মিয়ানমারে প্রশিক্ষণ নেয় ও আশ্রয় পায়। রোহিঙ্গা সংকটও এখানেই জড়িয়ে। মিয়ানমার জান্তা যখন আরাকান আর্মির কাছে জমি হারায়—বিশেষত রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উত্তর ও মধ্য রাখাইনে — তখন বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছাপ্রত্যাবর্তন আরাকান আর্মির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। ঢাকার সঙ্গে অবশ্য আরাকান আর্মির ইতিমধ্যে ড. খলিলুর রহমানের উদ্যোগে সীমিত যোগাযোগ হয়েছে। তবে বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতির কারণে আগামী পাঁচ বছরে এসব ব্যাপারে কতটা অগ্রগতি হবে তা অনেকটাই অনিশ্চিত।


বাংলাদেশের পথচলা: চলমান অন্তর্বর্তী সরকার নাকি নির্বাচন
বাংলাদেশের গতিপথ নির্ভর করছে অন্তর্বর্তী সরকারই চলবে, নাকি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার এসে সংস্কার শুরু করবে। ইতিহাস বলছে—দলগুলো সংস্কারে ধারাবাহিক নয়। বিএনপি নির্বাচনের পূর্বে প্রতিশ্রুতি দিয়েও ক্ষমতায় এসে সেকশন ৫৪ বাতিল করার মতো সহজ সংস্কারটিও করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ অবশ্য অনেক সংস্কার করেছে তবে সেগুলোর সিংহভাগই ছিল নেতিবাচক উদ্দেশ্যে। অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়—ইতিবাচক সংস্কার একমাত্র নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষেই সম্ভব; কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে নয়।

বিএনপি জাতীয় সরকারের কথা বলে; কিন্তু তা কিভাবে হবে তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। ধরা যায়, বিএনপি হয়তো সমস্ত বড় রাজনৈতিক দলকে তাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার সুযোগ দেবে। কিন্তু এখানে বিএনপির ৩১ দফা ও অন্তর্বর্তী সরকার দ্বারা গঠিত কমিশনগুলোর প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর সাংঘর্ষিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ড. ইউনুস আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে বিপুল কাজ বাকি। সময়সীমা অসম্ভবের কাছাকাছি। জনাব নাসেরের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন সক্ষম হলেও, বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দুর্বলতা আছে। বিএনপি-প্রভাবিত বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা ভঙ্গুর; দীর্ঘ মোতায়েনে সেনাবাহিনীর ‘ডিটারেন্স’ কমে গেছে; থানাগুলো থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ফেরত আসেনি; এবং আইন-শৃঙ্খলা দুর্বল। বিএনপি পরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করাতে চাইলে ছাত্রদের তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে পারে। আওয়ামী নেতৃত্ব যারা বর্তমানে আত্মগোপনে আছে, তাদের পুনরুত্থানও অনিশ্চিত। ‘সংস্কার কে করবে—অন্তর্বর্তী, না নির্বাচিত?’—এই বিতর্ক অবিরামভাবে চলছে। “প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন” নিয়ে মতভেদ এখনও অব্যাহত। সংবিধান বদলের বিষয়টি এখনো নিচু স্বরে আলাপ হচ্ছে, তবে তা যেকোনো সময় ভয়ঙ্কর গর্জনে পরিণত হতে পারে। তেমন হলে গণপরিষদ গঠন, খসড়া সংবিধান প্রণয়ন এবং গণভোট গ্রহণের সময়সাপেক্ষ পথ ধরতে হবে।

সম্ভাব্য কিছু দৃশ্যপট
দৃশ্যপট-১: ঘোষিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন।
ইসির সামনে বর্তমানে ছাত্রদের আপত্তি—(ক) আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ, (খ) জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কারের আগে ভোট গ্রহণ, (গ) এবং পুরানো সংবিধানের অধীনে ভোট গ্রহণ। শেষ দুটিতে ছাত্ররা আপোষ করলেও প্রথমটিতে প্রতিরোধ জোরালো থাকার সম্ভাবনা বেশি। জামায়াতে ইসলামের “প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন” এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। যদি “ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি” এবং জামায়াতে ইসলামি নির্বাচনে বিএনপিকে মোকাবেলা করার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত মনে না করে তবে তারা সংঘাতমূলক ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে সময় ক্ষেপণের চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং নিজেদেরকে আরও সুসংগঠিত করার জন্য সচেষ্ট হবে।

সব বিরোধ মিটলেও পরের চ্যালেঞ্জ হবে মুক্ত, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। ১৯৯১/১৯৯৬/২০০১-এর উৎসবমুখর নির্বাচনের মতো একটি ইনক্লুসিভ নির্বাচন দুর্বল অন্তর্বর্তী সরকার দ্বারা নড়বড়ে আইন-শৃঙ্খলার মাঝে সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি অন্তর্ভুক্তিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। ভারত দ্রুত নির্বাচন চায়; তবে সেটিকে ২০১৪/২০১৯/২০২৪-এর চেয়েও খারাপ দেখানোর জন্য তার প্রচেষ্টার অন্ত থাকবে না। এটি সে করবে, ভবিষ্যতে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে তাকে অস্বচ্ছ নির্বাচন ও বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। পাশাপাশি, আওয়ামী ক্যাডারদের দ্বারা কারচুপি-সহিংসতা-খুন—সম্ভাব্য। বিদ্রোহী ও ডামি প্রার্থীদের মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুষ্ঠু ভোট সম্ভব না হলে এক বছর পিছাতে পারে—কিন্তু এতে নির্বাচনের মান বাড়বে না। বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা পুনর্গঠিত না হলে আর আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি না হলে বিশ্বাসযোগ্য ভোট দুর্লভই থেকে যাবে। অতিরিক্ত এক বছর শুধু অসন্তোষই দীর্ঘায়িত করবে।

দৃশ্যপট-২: সংস্কার আগে, নির্বাচন পরে।
ছাত্রসমাজ ও সামাজিক মিডিয়ার সমর্থনপুষ্ট সরকার যদি সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়, ২–৩ বছরের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব; বিশেষত: যদি মন্ত্রিসভা তরুণ-উদ্যমী নেতৃত্ব দ্বারা পুনর্বিন্যস্ত হয়। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্বাচনপন্থী দলগুলো প্রবলভাবে প্রতিরোধ করবে।

নির্বাচনমুখী পক্ষগুলোর চার উদ্বেগ: (১) জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার,# রাজনৈতিক-সামাজিক দৃশ্যপট বদলে দেবে যা তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে বিঘ্নিত করবে; (২) ছাত্ররা শক্তিশালী বিরোধী শক্তিতে পরিণত হবে যা নতুন সরকারের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাবে; (৩) পুরনো পদ্ধতিতে শাসন করা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে; (৪) এবং ড. ইউনুসের মেয়াদ যত দীর্ঘ হবে তত তার ইমেজ বাড়বে যেটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ফলে সংস্কার-পক্ষ এবং নির্বাচন-পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ—অরাজকতা অবশ্যম্ভাবী।

দৃশ্যপট-৩: পুরনো সংবিধান ভেঙে নতুন সংবিধান।
এটি আমূল রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তনের একমাত্র পথ। বিএনপির পাল্টা-বিপ্লবী পদক্ষেপের কারণে এটি এখন কম সম্ভাব্য। তরুণ প্রজন্মে এখনও যে উত্তাপ আছে তাতে অবশ্য এর আবেদন ফিরতেও পারে। বিপ্লব-পরবর্তী তুচ্ছ ইস্যুর কোলাহলে এ পথটি হারিয়ে গেছে। তবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য সেটিই ছিল শ্রেষ্ঠ। আমাদের বিপ্লব-পরবর্তী নেতৃত্ব ৫ আগস্টের আত্মাকে লালন করে শান্তি-সমৃদ্ধির পথে সমাজকে নিতে পারেনি। ৫ আগস্টের আগের ও পরের বাংলাদেশ যে ভিন্ন—এ বাস্তবতা তারা ধারণ করতে পারেনি, যেমন আমাদের পূর্বসূরিরা ২৬ মার্চের আগের ও ১৬ ডিসেম্বরের পরের বাংলাদেশের ভিন্নতা উপলব্ধি করতে পারেননি। এই ভিন্নতার অনুভবটি চিরতরে হারিয়ে গেছে, না আবার পুনরুজ্জীবিত হবে—তা বলা মুশকিল। তবে তা ফিরে আসলে প্রচণ্ড অস্থিরতা তৈরি হবে এবং বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ এক হয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করবে। সেক্ষেত্রে ভারতীয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


বিএনপি ক্ষমতায় এলে—সম্ভাব্য চিত্র
নির্বাচন হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি-জামায়াত-ছাত্রশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। জামায়াত সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হলেও পুরনো ইশতেহারের কারণে জনগ্রাহ্যতা কিছুটা কম। তবে ১৯৯১-এর মতো দুর্ঘটনা ঘটানোর মতো শক্তি তারা এখনও অর্জন করেনি। তারা বেশ কিছু আসন পেতে পারে বিএনপি-বিরোধী তরঙ্গ ভর করে। তবে সেগুলো ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হবে। অন্যদিকে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নির্বাচনজ্ঞান ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হওয়ায় তাদের জয়ের সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম।

বিএনপি সরকার চালাতে পারবে কি না—সন্দেহ আছে। একসাথে বহু ফ্রন্টে কাজ লাগবে। দলের কর্মীরা প্রভাবশালী পদ দখল ও দুর্নীতিতে ঝুঁকতে পারে—যেটি আওয়ামী আমলের পুনরাবৃত্তি। বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা পুনর্নির্মাণ—বিরাট কাজ; অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় এগুলো এখনো ভঙ্গুর। উপদেষ্টা-প্রভাবে বসানো অনুগত নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এর মধ্যে ভারত ট্রানজিট, তিস্তা, চট্টগ্রাম-মোংলা বন্দর, রামপাল, আদানি বিদ্যুৎ আমদানি এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলে রাডার স্থাপন ইস্যুতে চাপ বাড়াবে। ভারতের দাবিতে রাজি না হলে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক বৈরী হবে; অন্যদিকে ছাড় দিলে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি ও জামায়াতে ইসলামের সহিংস আন্দোলনের মুখে পড়বে। সে সঙ্গে দাবিগুলো না মানলে ভারত তার পুরনো ‘মৌলবাদ-সংখ্যালঘু’ কার্ড খেলবে এবং আওয়ামী ক্যাডার ও আন্তর্জাতিক চাপ দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। সে সঙ্গে দুর্বল অর্থনীতি আরও খারাপ হলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের পথ প্রশস্ত হবে। গত ১৫ বছরের আওয়ামী ব্যর্থতা বিএনপির ২০০১–২০০৬-এর ‘দুষ্টুমি’ মুছে দেয়নি; অনেকেই সন্দিহান—বিএনপি নেতৃত্ব ভারতীয় চাপ সামলে দেশের অবস্থান উন্নত করতে পারবে কি না।

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ বাড়ার সম্ভাবনা
সংস্কার আগে হলে বা সংবিধান সংশোধনের চাপ তীব্র হলে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ বাড়তে পারে। তবে এতে বর্তমান স্থবিরতার কোনো পরিবর্তন হবে না। যদি সরকারকে জাগাতেই হয় তবে মন্ত্রিসভায় নতুন তরুণ মেধাবী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। না হলে ড. ইউনুসকে প্রেসিডেন্ট করে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করা যেতে পারে। নির্বাচন থেকে সংস্কার, নতুন সংবিধান—সবকিছুতেই মেধাবী মানুষ শনাক্ত ও সংযুক্ত করা জরুরি। দলগুলোকে আনুগত্যের বদলে যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। না হলে গোষ্ঠীস্বার্থ সরকারকে ভেতর থেকে দুর্বল করবে। মন্ত্রিসভাকে অবশ্যই বাইরের-ভিতরের ধাক্কা সামলে মিশন শেষ করতে সক্ষম হতে হবে।

ফরাসি বিপ্লব নেপোলিয়নের উত্থান ঘটিয়েছিল—যেখানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আমিই বিপ্লব।” বাংলাদেশে তেমন কিছু সম্ভব? সম্ভবত না। বর্তমান সামরিক নেতৃত্বের চরিত্র ও সামরিকবাহিনীর মাঠে দীর্ঘ মোতায়েনের কারণে ক্লান্তি সেদিকে নির্দেশ করে না। ‘সংস্কার-বিপ্লবে ক্লান্ত সৈনিকেরা ব্যারাকে ফিরতে উদগ্রীব।

কিন্তু যদি নির্বাচন কর্মসূচি ব্যর্থ হয়, পুলিশ বাহিনী অকার্যকরই থাকে, বা নতুন সরকার মাঠে সেনা-উপস্থিতি বজায় রাখতে চায়, তাহলে কী হবে? যদি নির্বাচনপূর্ব সংস্কার বা নতুন সংবিধান প্রণয়ন শুরু হয়—তাহলে সেনারা কি মাঠে থাকবে?

আমার মতে, সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফিরে যাওয়া বাঞ্ছনীয়—নির্বাচনের ফল যাই হোক। সেনাসদস্যরা মাঠে থাকলে পুলিশ কখনোই কার্যকরী হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারকে এই ‘অলস ঘোড়াকে’ চাবুক মেরে দৌড়ে নামাতে হবে।

আগস্ট বিপ্লবে পুলিশই ছিল প্রধান অভিযুক্ত। তবু বিচার হওয়ার আগেই তাদের পদোন্নতি হলো। প্রতিশোধের ভয়ে দায়িত্ব না নেওয়া—এটা কি গ্রহণযোগ্য? পদোন্নতির ভয় না থাকলে প্রতিশোধের ‘ভয়’কে কি কখনও কর্মবিমুখতার অজুহাত হিসাবে মেনে নেওয়া যায়?


ছাত্রসমাজ: যে শক্তি জাগালো দেশকে
জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব মূলত ছাত্ররাই দেয়। পরে সমাজের অন্যান্য অংশ যোগ দেয় যা মহানগর পেরিয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। কোটা-বিরোধী আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা ভেতরে জমে থাকা শ্রেণিচেতনা, সম্পদের বৈষম্য ও ‘রাজনৈতিক শ্রেণি’র অসংবেদনশীলতায় তীব্রভাবে ফেটে পড়ে। আন্দোলন ছিল অহিংস এবং নেতৃত্বহীন। পরবর্তীতে ছাত্রলীগ ক্যাডার-পুলিশ-সেনার হস্তক্ষেপে তা সহিংস রূপ ধারণ করে। আজ এতদিন পর সেই বিপ্লবী চেতনা পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোতে ছাত্রদের ঢুকে যাওয়ার কারণে ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছে। ফলে একটি বিপ্লবী শক্তি হিসাবে ভবিষ্যৎ স্বৈরতন্ত্র ঠেকানোর জন্য, দেশ, সরকার ও রাজনৈতিক দলসমূহের ওপর তাদের যে “ওয়াচডগ” ভূমিকা পালন করার কথা ছিল, তা না করে তারা নিজেদের প্রাধান্য বিসর্জন দিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাতারে নেমে এসেছে।

এখন যেহেতু তারা দল করেছে তাদের সম্ভাবনা ও সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিচার করা যাক। নুরুল হক নূর (কোটা আন্দোলন) ও জোনায়েদ সাকি (যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন)-এর মতো নেতা পরে ‘গণঅধিকার পরিষদ’ ও ‘মাস সলিডারিটি মুভমেন্ট’ গড়েন। কিন্তু বর্তমানে এ দলগুলো রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এতটাই অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে এগুলোর অস্তিত্ব ও কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র জোট গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিরও কি একই পরিণতি হবে? বলা মুশকিল—তবে তাদেরকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের চেয়েও আকর্ষণীয় কিছু প্রস্তাবনা সমাজকে দিতে হবে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা যথাক্রমে জিয়াউর রহমান ও শেখ মুজিবের ভাবমূর্তির ওপর নির্ভরশীল। ‘ধানের শীষ’ এবং ‘নৌকা’ প্রতীকের মাধ্যমে তারা ভোটারদেরকে টানে। কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যতের বহু চ্যালেঞ্জে তাদের কল্পনাশক্তি সীমিত। ‘জাতির পিতা’ ও ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বিতর্কে এ দল দুটোর সময় কেটে যায়। আওয়ামী লীগ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশকে মধ্যম-আয়ের দেশে উত্তরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির দিকনির্দেশনা অস্পষ্ট ৩১ দফায় সীমাবদ্ধ। ছাত্ররা কি দেশের সামনে আরও আকর্ষণীয় পথনকশা দিতে পারবে?

প্রস্তাবনা দেওয়ার আগে দল করার কারণ স্পষ্ট করতে হবে। সেটি কি বিএনপির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য? আওয়ামী লীগের ছেড়ে যাওয়া শূন্যতাকে পূরণ করার জন্য ? নাকি চাওয়া সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য, যা বিদ্যমান কাঠামোয় না ঢুকলে সম্ভব নয়? অথবা, এর কারণ কি ছাত্রগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ঐক্য সাধনের জন্য? বিএনপির প্রাধান্যের পাল্টা ভারসাম্য তৈরির জন্য? নাকি, আওয়ামী প্রত্যাবর্তনে নিপীড়ন এড়ানোর জন্য?

দলের মতাদর্শ ও অবস্থান জানানো জরুরি। এটি কি মধ্যপন্থী দল? নীতি-প্রভাবিত দল? ডান দল? না বাম দল? জাতীয়তা, জাতির পিতা, স্বাধীনতার ঘোষণা, বংশতন্ত্র—এসব মূল প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী?

সবশেষে—ইশতেহার, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো স্পষ্ট না হলে দলের উদ্দেশ্য ও সক্ষমতা নিয়ে জনগণের সংশয় কাটবে না। জাতীয় ভিশন তৈরি কঠিন। ভিশনে দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য, কৌশল ও বাস্তবায়নের ভিত্তি স্পষ্ট করে বলতে হবে। শেখ মুজিবের ছয় দফা, জিয়ার উনিশ দফা/সবুজ বিপ্লব অথবা জামায়াতে ইসলামের ইসলামিক শাসনের মতো তা জাতির হৃদয়ে পৌঁছাতে হবে। তা না হলে প্রথমেই ধাক্কা খেতে হবে। ভিশনে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা ফুটতে হবে। আওয়ামী লীগের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, বিএনপির ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ অথবা জামায়াতে ইসলামের প্রতিশ্রুত ইসলামিক শাসনব্যবস্থার সাথে প্রতিযোগী হয়ে উঠতে হবে। গণতন্ত্র, সামাজিক সমতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, ধর্মীয় স্বাধীনতা—এসবের বাস্তবায়ন-রূপরেখা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নয়। ভিশন হতে হবে সহজবোধ্য। গ্রহণযোগ্য করতে সব শ্রেণির মানুষের সাথে মিশতে হবে।

সাংগঠনিকভাবে শুধু ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সমাজকে যুক্ত করতে হবে। ‘শিশুদের দল’ তকমা এড়াতে প্রবীণদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতা দলকে পোক্ত করবে। আমাদের সমাজে প্রবীণরা নেতৃত্ব দেয় এবং তরুণরা তাদের অনুসারী হয়।তাই বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে চিন্তা-চেতনার সেতু বন্ধন প্রয়োজন।

কেউ কেউ ভাবতে পারে—বিপ্লবে আমরা নেতৃত্ব দিয়েছি, তাই নেতৃত্ব আমাদের প্রাপ্য। এটি বিপর্যয় ডেকে আনবে। প্রথম মেয়াদে ছাত্ররা ব্যাকস্টেজে থেকে প্রবীণদেরকে পথ দেখাবার সুযোগ করে দিতে হবে। পরের মেয়াদে তাদের প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হতে হবে। আগামী নির্বাচনে ছাত্রপ্রার্থী ১০%-এর বেশি না হওয়াই ভালো।

দলের প্রথম বছরগুলোতে—শিক্ষিত, সম্মানিত, সৎ, সুস্বাস্থ্যসম্পন্ন, গতিশীল প্রবীণ রাজনীতিজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা ছাত্রদের ‘অ্যাপ্রেন্টিস’ হিসেবে প্রশিক্ষণ দেবেন। এতে দল শক্ত ভিত পাবে, উদাহরণও সৃষ্টি হবে।

আগামী নির্বাচনে নামা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির জন্য অত্যন্ত কঠিন। উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যন্ত তারা হয়তো কমিটি দিয়ে পৌঁছতে পারবে, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। তাই এখন সময় দিতে হবে—ভিশন জানানোর জন্য, মানুষের সাথে কথা বলার জন্য এবং তাদের হৃদয়ে পৌঁছানোর জন্য। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা মাঠে নামলে ফলাফল ততটা হতাশাব্যঞ্জক নাও হতে পারে।

নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাদের করণীয় ছাত্রদেরকে আগেই ঠিক করে রাখতে হবে। কী হবে যদি তারা একটিও সিট না পায়, কয়েকটি পায় অথবা প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে? জামায়াতে ইসলামী অথবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে তাদের সম্পর্কই বা কী হবে? যদি নতুন শাসক দল কার্যকরভাবে শাসন করতে ব্যর্থ হয় অথবা ভারতের সাথে জাতীয় স্বার্থ-পরিপন্থী চুক্তি বাস্তবায়ন করে তবে তারা কী করবে? আওয়ামী লীগ প্রত্যাবর্তন করলে তাদের ভূমিকা কী হবে? তারা কি তখনও একতাবদ্ধ থাকবে? প্রশ্নগুলো জটিল; কিন্তু উত্তর খোঁজা জরুরি।


পাঁচ বছরের পূর্বাভাস—তিন দৃশ্যপট
(১) বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আরও ১–২ বছর থাকবে। তারপর নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতা আরোহণের সম্ভাবনা। বিএনপি পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারবে কি না—তা নির্ভর করবে কিছুটা ভারতের কৌশলগত অবস্থানের ওপর এবং কিছুটা আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ও শক্তি সঞ্চয়ের ওপর। যদি বিএনপি তার বিরুদ্ধে পরিচালিত পরিকল্পিত সহিংসতা-বিরোধী আন্দোলন দমনে ব্যর্থ হয় তবে ১/১১-র পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

(২) অদক্ষতা/আইন-শৃঙ্খলা অবনতির কারণে অথবা ছাত্রচাপের মুখে সংস্কার-মিশনে হাত দিলে, নির্বাচন না হয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকবে। তখন দুর্বল মন্ত্রীরা বদলাবে এবং ড. ইউনুসকে প্রেসিডেন্ট করে ঐকমত্যের জাতীয় সরকার গঠিত হবে।

(৩) সংবিধান বদলের ক্ষীণ গুঞ্জন উচ্চকিত হলে—আগামী পাঁচ বছর যাবে গণপরিষদের নির্বাচন, সংবিধান প্রণয়ন ও গণভোটে।
যাই ঘটুক, এই পাঁচটি বছর দেশকে বাস করতে হবে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা, প্রতিবাদ, আন্দোলন, হরতাল-অবরোধ, সহিংসতার ভেতর দিয়ে। পঙ্গু অর্থনীতি দরিদ্রদের আরও বিপদ ফেলবে এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ ক্রমাগত পেছাতে থাকবে।
সমাপ্ত

এই বিশ্লেষণ সম্পূর্ণভাবে আমার নিজস্ব চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে রচিত। এর মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে ৫ আগস্টের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এবং তার বহুমাত্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে। ‘জুলাই সনদ’, সাংবিধানিক সংস্কার এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন—সবকিছুই আজ ৫ আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে নতুন দিকনির্দেশনা পেয়েছে।

আমার এই বিশ্লেষণ রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান কিংবা বিভিন্ন মতাদর্শের সঙ্গে নাও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে—এটিই গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক বিষয়। তবুও আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি বিষয়টি পেশাদার নিরপেক্ষতা ও বাস্তব মূল্যায়নের আলোকে উপস্থাপন করতে। এখানে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, দলীয় আনুগত্য বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের কোনো প্রভাব নেই; শুধুমাত্র ঘটনার যৌক্তিক বিশ্লেষণই এই লেখার মূলভিত্তি।

  • জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ২০১২ সালের ২৫ জুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১৫ সালের ২৫ জুন অবসর গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কারের আন্দোলন এক দফায় পরিণত হলে ৩১ জুলাই তিনি ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ফেসবুক প্রোফাইল লাল করেন। আগস্টের ৪ তারিখে তিনি আরও ৪৮ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনে হতাহতের প্রতিবাদ করেন, এবং সশস্ত্র বাহিনীকে ছাউনিতে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বানও জানান। “আগামী পাঁচ বছরে আমরা কোথায় যাচ্ছি?” শিরোনামের সাতপর্বের লেখাটি তিনি ফেসবুকে ১৪ অক্টোবর থেকে ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করেন। যার সপ্তম পর্ব সোমবার ২০ অক্টোবর ২০২৫ প্রকাশিত হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত