মনোয়ার পারভেজ

১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১৮:৫৯

মুক্তিযুদ্ধে সিলেট: চিকিৎসক টার্গেটে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ

বিজয় যখন সন্নিকটে তখন পাক হানাদাররা শেষ থাবার প্রস্তুতি নেয়। টার্গেট কেবল বুদ্ধিজীবী। যাদেরকে বলা হয় জাতির বিবেক। বিজয়ের দুই দিন আগে অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বুদ্ধিজীবীদেরকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা ছিল আরেক কালো অধ্যায়। পাক হানাদাররা যখন বিভিন্ন জেলা থেকে পালাতে বাধ্য, এক পর্যায়ে তারা তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে পিছু হটতে থাকে। ১৬ ডিসেম্বরের আগেই বিভিন্ন জেলাকে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করতে থাকে মুক্তি বাহিনী। তারপর ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে হয় পুরো বাংলাদেশের বিজয়। কিন্তু তার দুই দিন আগেই ঘটে বুদ্ধিজীবী হত্যার ন্যক্কারজনক ঘটনা। তারা পরাজয় নিশ্চিত জেনে জাতিকে মেধাশূন্য ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে রাষ্ট্রকে পঙ্গু করতেই এমন ঘটনা ঘটায় বলে ধারণা করা যায়। এবং মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখা নানা শ্রেণিপেশার মানুষদের টার্গেট করে তারা। কিন্তু তার গভীরে কি আরও কোনো কিন্তু ছিল? হয়তবা ছিল।

বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা শুধুমাত্র ১৪ ডিসেম্বর নয়, সূত্রপাত মার্চ মাস থেকেই। ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী পাকবাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। মূলত ২৫ মার্চ রাতেই অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনাও হয়েছিল সেদিন। পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন চলাকালে খুঁজে-খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। তবে পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে। ডিসেম্বরের ৪ তারিখ থেকে ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারি হয়। এবং ডিসেম্বরের ১০ তারিখ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি চলে। তারপর ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়ন হয়। সেই পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞটি বাংলাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। বন্দী অবস্থায় বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের ক্ষত-বিক্ষত ও বিকৃত লাশ রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে পাওয়া যায়। অনেকের লাশ শনাক্তও করা যায়নি, পাওয়াও যায়নি বহু বুদ্ধিজীবীর লাশ।

বুদ্ধিজীবী হত্যার স্মরণে ঢাকায় কেন্দ্রীয় বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়েছে। তেমনি এক স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে আমার শহর সিলেটে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পাশে শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। এখানে শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. শামসুদ্দীন আহমদ, ডা. লে. কর্নেল জিয়াউর রহমান, ডা. শ্যামল কান্তি লালা, হাসপাতালের সেবক (নার্স) মাহমুদুর রহমান, কোরবান আলীসহ আরও নাম না জানা অনেককে ধরে এনে হত্যা করা হয়। সুতরাং ইতিহাসের কালক্রমে সাক্ষী মুক্তিযুদ্ধকালে সিলেটের বুদ্ধিজীবীরাও আত্মাহুতি দিয়েছেন।

১. শহিদ ডা. শামসুদ্দীন আহমদ
১৯৭১ সালে ডা. শামসুদ্দিন আহমদ সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন (বর্তমানে শহিদ শামসুদ্দিন সদর হাসপাতাল)। অসহযোগ আন্দোলনের সময়ই তিনি রাজনৈতিক নেতাদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আহতদের চিকিৎসার জন্যে শহরতলিতে খোলা হবে পাঁচটি চিকিৎসা কেন্দ্র। তাঁর এই উদ্যোগ সফল না হলেও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করতে দেখা গেছে।

পাক সেনারা ৯ এপ্রিল সিলেট শহর পুনর্দখল করে নেয়। সেদিন প্রচণ্ড যুদ্ধ হয় মুক্তিবাহিনী ও পাক হানাদারদের মধ্যে। আহত হয় অসংখ্য সাধারণ মানুষও। ডা. শামসুদ্দিন তাদের চিকিৎসা করতে থাকেন। তখন সামরিক কর্তৃপক্ষ ডা. শামসুদ্দিনকে নির্দেশ দেয়, সেনা ছাউনিতে গিয়ে জখমপ্রাপ্ত সেনাদের চিকিৎসা করতে; কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই আহত লোকজনের সেবা করতে থাকেন। এতে তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এর আগে জার্মানভিত্তিক গণমাধ্যমে (রেডিও) ডা. শামসুদ্দিনের সাক্ষাৎকার প্রচার হয়। আহতদের চিকিৎসা সেবা বন্ধ করা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বিষয়টি তখন তাঁর মাধ্যমে উচ্চারিত হয়। তাই সেদিন তাঁকে ও তার সহযোগী ডা. শ্যামল কান্তি লালা, হাসপাতালের সেবক মাহমুদুর রহমান, অ্যাম্বুলেন্স-চালক কোরবান আলীসহ আরও কয়েকজনকে মেডিকেলের পাশে এনে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। এ জায়গাটিই বর্তমানে সিলেট শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. শামসুদ্দিন আহমদের সম্মানে সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাম শহিদ শামসুদ্দীন সদর হাসপাতাল করা হয়।

২. শ্যামল কান্তি লালা
সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (বর্তমানে শহিদ শামসুদ্দীন সদর হাসপাতাল) নবীন শল্যচিকিৎসক (ইন্টার্ন) ছিলেন ডা. শ্যামল কান্তি লালা। তখনকার সময়ে বর্তমান সময়ের মতো ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক না হলেও লালা দেশের ক্লান্তিলগ্নে মানবতার তাড়নায় মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকতে চেয়েছেন। চাইলে তিনি তখন হাসপাতাল ছেড়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু যাননি। তাঁর শিক্ষাগুরু ডা. শামসুদ্দিন আহমদের মতো তিনিও ধারণা করেছিলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর যাই করুক, মানবসেবার একমাত্র স্থান হাসপাতালে কিছু করবে না। এই বিশ্বাসে হাসপাতালে থেকে যান তাঁরা, এবং ডা. শামসুদ্দিনের সঙ্গে সহযোগী হিশেবে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এটাই ছিল যেন তাদের ভুল! তাই তাঁদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে তাদের উপর হিংস্র চোখ বসায় পাকিস্তানি দস্যুরা।

৯ এপ্রিল সকাল বেলা ডা. লালা যখন ড. শামসুদ্দিনের সঙ্গে ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসায় ব্যস্ত ছিলেন তখনই হাসপাতালের সামনে এসে হাজির হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি। সেনারা তখন ওয়ার্ডে প্রবেশ করে তাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে বাহিরে নিয়ে আসে। তাদের শেষ পরিণতি হয় দস্যুদের হাতে আত্মাহুতি দিয়ে। তাদের অপরাধ ছিল যুদ্ধাহতদের চিকিৎসা দেওয়া! শ্যামল কান্তি লালার জন্ম ২৮ জানুয়ারি ১৯৪৮। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল চট্টগ্রামের পটিয়ায়।

৩. লে. কর্নেল ডা. জিয়াউর রহমান
তাঁর পুরো নাম ছিল আবুল ফজল জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের সময় লে. কর্নেল ডা. জিয়াউর রহমান সিলেট মেডিকেল কলেজের (বর্তমান শহিদ শামসুদ্দিন সদর হাসপাতাল) অধ্যক্ষ ও সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সুপারিন্টেনডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৪ এপ্রিল গৃহবন্দি অবস্থায় তাঁকে মেডিকেল কলোনির একটি বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। এর পর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ মেলেনা। পরিবারের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় তাঁর খোঁজ চালাতে থাকে। তবুও কোনো খোঁজ মেলেনা। কিছুদিন পর তাঁর পরিবারকে পাক বাহিনীর রসদবাহী একটি বিমানে করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরিবারের লোকজন জানে না তাঁর সঙ্গে শেষ পরিণতি কী হয়েছিল! তাঁর পরিণতিও ডা. শামসুদ্দিন ও ডা. লালার মতোই। হানাদারদের হাতে আত্মাহুতি দেন।

স্বাধীনতার ৫১ বছর পরে তাঁর পরিবার তথ্য পায় কী হয়েছিল তার শেষ পরিণতি, খোঁজ পায় কোথায় হত্যা করা হয়েছিল তাঁকে। তখন ২০২২ সালে ১৫ ডিসেম্বর তাঁর পরিবারের লোকজন সিলেটে আসে লে. কর্নেল ডা. জিয়াউর রহমানের শেষ স্মৃতিচিহ্ন টুকু দেখতে। ৫১ বছর পর সিলেটে আসা শহিদ বুদ্ধিজীবী লে. কর্নেল ডা. জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এদিন বিকেলে নগর ভবনে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী লে. কর্নেল ডা. জিয়াউর রহমানকে সম্মাননা প্রদান করে সিলেট সিটি কর্পোরেশন। তাঁর মেয়ে শাহরিন রহমান লুবনার হাতে সম্মাননা তোলে দেন তৎকালীন সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ যেন ইতিহাসের দায় শোধ।

৪. সেবক (নার্স) মাহমুদুর রহমান
সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (বর্তমানে শহিদ শামসুদ্দীন সদর হাসপাতাল) সেবক (নার্সিং কর্মকর্তা) ছিলেন মাহমুদুর রহমান। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের হাত ধরে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে (১৮৫৪-১৮৫৬) আহতদের চিকিৎসা সেবায় ভূমিকা রেখে নার্সিং পেশার গৌরবময় পথচলার শুরু হয়েছিল, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও নার্সরা ছিলেন তাদের নিজস্ব স্থান থেকে সাহসী ভূমিকায়। তারাও ছিলেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় অগ্রণী ভূমিকায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দান করতে গিয়ে পাকবাহিনী ও স্থানীয় দস্যুদের ভয়ংকর থাবার শিকার হতে হয় চিকিৎসক ও নার্সদের। তাদেরই একজন তৎকালীন সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবক (নার্স) মাহমুদুর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিজের দায়িত্ব ও দেশমাতৃকার জন্য লড়ে যাওয়া যোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় শহিদ ডা. শামসুদ্দীন আহমদ, ডা. শ্যামল কান্তি লালাদের সাথে সহযোগী সিলেট চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি। চাইলে তখন তিনি চাকরি ছেড়ে প্রাণ বাঁচিয়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু সেবার ব্রত ও দেশমাতৃকার জন্য লড়ে যাওয়া যোদ্ধাদের সেবায় তিনি থেকে যান। যার ফলে তাঁকেও পাক হানাদার ও স্থানীয় দস্যুদের শিকার হতে হয়। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল সকলের সাথে তাঁকেও পাকিস্তানিরা হাসপাতালের সামনে হত্যা করে ফেলে যায়। তিনিও সিলেট শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত আছেন।

তথ্যসূত্র:
১. সিলেটের শহীদ বুদ্ধিজীবীরা (আর্টিকেল)- সাংবাদিক আল-আজাদ।
২. মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিৎসক জীবনকোষ, বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ, প্রকাশ ২০০৯।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত