নুরুল হক শিপু

২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১৩:৪২

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে নতুন সমীকরণ

লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর—বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী, কড়া নিরাপত্তা, নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার ভেতর দিয়েই চলে এর কার্যক্রম। কিন্তু বুধবারের (২৪ ডিসেম্বর) দৃশ্য ছিল ব্যতিক্রম।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে হিথ্রো যেন এক মুহূর্তে পরিণত হয় প্রবাসী রাজনীতির মিলনমেলায়। লাল-সবুজ ব্যানার, দলীয় স্লোগান, আবেগী কণ্ঠ আর ক্যামেরার ঝলকানিতে—যুক্তরাজ্যের মতো দেশের একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন মানুষের ঢল অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়কর। কেউ কেউ একে দেখছেন প্রবাসে বিএনপির শক্ত অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে, আবার কেউ প্রশ্ন তুলছেন—বিদেশের মাটিতে দলীয় শক্তি প্রদর্শন কতটা সমীচীন?

আবেগের প্রত্যাবর্তন : দীর্ঘ সময় প্রবাসে অবস্থানের পর তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরে বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে তীব্র আবেগ। তাদের চোখে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকারও, তিনি দেশে ফিরলে দল নতুন করে সংগঠিত হবে, ফিরবে রাজনীতিতে গতিও। সমর্থকদের ভাষায়, “এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন ব্যক্তির ফেরা নয়, এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীকও বটে।”

খালেদা জিয়া শারীরিক অবস্থা : এই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি সংবেদনশীল অধ্যায়—বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা। বেগম জিয়া গুরুতর অসুস্থ, মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে ছেলে তারেক রহমানের দেশে ফেরা অনেকের কাছে দেখা হচ্ছে ছেলে মায়ের কাছে ফেরা মানবিক দায়িত্ব হিসেবেও।

মামলা : ২০০৭ সালের ৭ মার্চ। রাজধানীর মইনুল রোডের ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয় বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানকে। চোখ বেঁধে টানা ১৮ ঘণ্টা অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়; নেওয়া হয় রিমান্ডে। এর পর ৫৫৪ দিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার নামে তাঁকে সপরিবারে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নির্বাসনে পাঠিয়েও থামেনি নির্যাতনের খড়গ, একের পর এক মামলা করা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১৩টি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৭২টি মামলা হয় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে। অন্তত ৫টি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় তাঁর। জনবিচ্ছিন্ন করতে আদালতের নির্দেশনায় গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য প্রচারে জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একের পর এক মামলা থেকে খালাস পান তারেক রহমান। তারেক রহমানের আইনজীবীরা বলছেন, এসব মামলা ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রাজনীতি থেকে তাকে ‘মাইনাস’ করার অপকৌশল।

হিথ্রোর দৃশ্য : হিথ্রো বিমানবন্দরে যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতাদের ব্যাপক উপস্থিতি একদিকে যেমন দলীয় সংহতির বার্তা দেয়, অন্যদিকে তেমনি প্রশ্ন তোলে—বিদেশের মাটিতে এমন দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী বার্তা দেয়? সমর্থকদের মতে, এটি প্রমাণ করে প্রবাসে বিএনপির শক্ত ভিত্তি।
সমালোচকদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিতর্কিতভাবে উপস্থাপন করে।

শেষ কথা : তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এটি যেমন বিএনপির জন্য আশার আলো, তেমনি সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ এবং সাধারণ মানুষের জন্য নতুন প্রশ্নের সূচনা। এই প্রত্যাবর্তন কি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে, নাকি আরও বিতর্কের জন্ম দেবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে হিথ্রোর আজকের দৃশ্য এটুকু স্পষ্ট করেছে, প্রবাসী রাজনীতির প্রভাব এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়।

নুরুল হক শিপু : বিশেষ প্রতিবেদক, রানার টিভি, যুক্তরাজ্য।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত