২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ২২:৪২
২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস। এই দিনটি ভারতের জাতীয় জীবনে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ছুটির দিন নয়; বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ও নীতিগত অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে দেখেন দেশটির নাগরিকরা। মূলত, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান কার্যকর হয় এবং দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব জনগণের হাতে—এমন একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র তিন বছরের মধ্যেই এ ধরনের রাষ্ট্রগঠন ছিল এক যুগান্তকারী অর্জন, যা বহুভাষী, বহুধর্মী এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করে।
ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কেন্দ্রীয় তাৎপর্য হল “সংবিধান”। তাদের সংবিধান পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ লিখিত সংবিধান হিসেবে পরিচিত। এতে রাষ্ট্রের কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য, ন্যায়বিচারের নীতি, মৌলিক অধিকার, এবং নাগরিক জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা—সবকিছুর রূপরেখা দেওয়া আছে। একটি রাষ্ট্রকে শুধু ভূখণ্ড ও প্রশাসনিক সীমানার সমষ্টি হিসেবে দেখলে চলবে না; রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে তার আইন, ন্যায়নীতি এবং নাগরিকের মর্যাদার ওপর। তাদের প্রজাতন্ত্র দিবস তাই মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে সমাজকে পরিচালিত করা।
ইতিহাস বলে, ভারতীয় সংবিধান প্রণয়নের পেছনে ছিল দীর্ঘ আলোচনা, তর্ক, এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয়। সংবিধানসভা বিভিন্ন অঞ্চল, ধর্ম, ভাষা ও শ্রেণির প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে একটি সামগ্রিক দলিল তৈরি করে। এই দলিলের মূল দর্শন হলো—সব নাগরিক সমান; রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ বা জন্মপরিচয়ের কারণে বৈষম্য করবে না; এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে, ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়। এ কারণেই প্রজাতন্ত্র দিবস কেবল অতীতের গৌরবগাথা নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একধরনের নৈতিক মাপকাঠি।
প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর দিল্লির কর্তব্যপথে (Kartavya Path) যে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়, তা এই দিবসের সবচেয়ে দৃশ্যমান আয়োজন। সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজ, প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রদর্শন, বিভিন্ন রাজ্যের ট্যাবলো, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উপস্থাপনা—সব মিলিয়ে এটি একদিকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রদর্শনী। কিন্তু এই আয়োজনের মর্মার্থ উৎসবের উচ্ছ্বাসের চেয়েও গভীরে—এটি নাগরিকদের কাছে একটি বার্তা: রাষ্ট্রের শক্তি তখনই অর্থবহ, যখন তা সংবিধান ও জনগণের কল্যাণকে সেবা করে।
ভারতীয়রা মনে করেন, এই দিনটি এক ধরনের আত্মসমালোচনার সুযোগও এনে দেয়। সংবিধানে ঘোষিত “সাম্য, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার”—এই আদর্শগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে বৈষম্য, বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দারিদ্র্য বা রাজনৈতিক মেরুকরণ—এসব চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে। কিন্তু প্রজাতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, তার হাতে থাকে সংশোধনের পথ: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, আদালতের ভূমিকা, নির্বাচন ব্যবস্থা, এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ। প্রজাতন্ত্র দিবস স্মরণ করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র কোনো “চূড়ান্ত অবস্থা” নয়, এটি প্রতিদিনের অনুশীলন। আইনকে সম্মান করা, ভিন্নমতকে সহ্য করা, এবং ন্যায়কে প্রাধান্য দেওয়া—এই চর্চাগুলোই একটি প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে।
অনেকে মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ অঞ্চলের বহু দেশই রাষ্ট্রগঠন, গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে নানা বাস্তবতার মুখোমুখি। ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়—বহুবৈচিত্র্যের সমাজে সংবিধান হতে পারে জাতীয় ঐক্যের প্রধান ভিত্তি। একই সঙ্গে এটাও সত্য, একটি শক্তিশালী সংবিধান থাকা মানেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না; সংবিধানের চেতনাকে জীবিত রাখতে লাগে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, এবং সচেতন জনগণ। তাই প্রজাতন্ত্র দিবস প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছেও একটি বার্তা বহন করে—রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে আগে নাগরিককে মর্যাদা দিতে হয়, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আর একজন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরাও তা বিশ্বাস করি।
প্রজাতন্ত্র দিবস তরুণ সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তরুণরা অনেক সময় স্বাধীনতাকে স্বাভাবিক ধরে নেয়; কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, ভোটাধিকার প্রয়োগ করা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, এবং সমাজে মানবিকতা বজায় রাখা। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে যেমন কাছাকাছি এনেছে, তেমনি ভুল তথ্য, বিভাজন ও উত্তেজনাও বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় সংবিধানভিত্তিক নাগরিক মূল্যবোধ—সহিষ্ণুতা, যুক্তিবোধ, এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা—আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রজাতন্ত্র দিবস তরুণদের সেই মূল্যবোধের দিকে ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ।
সবশেষে বলা যায়, ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস তাদের উৎসবের পাশাপাশি একটি শপথও। আইনের শাসন, গণতন্ত্র, এবং নাগরিক মর্যাদার শপথ। তাই এই দিবসে শুধু কুচকাওয়াজ বা আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মনে করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে সংবিধান এবং সংবিধানের প্রাণ হচ্ছে জনগণ। প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন নাগরিকরা অধিকার ও দায়িত্ব—দুই দিকই সচেতনভাবে পালন করে; প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থাকে; এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হয় জনকল্যাণ ও সাম্যের নীতিতে।
আকাশ চৌধুরী : সাংবাদিক। sangbad.akash@gmail.com
আপনার মন্তব্য