২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১০:১১
ছবি: জাতিসংঘ
সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের অর্থ, অস্ত্রশস্ত্রের জোগান বন্ধ করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সময় ভোরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে ভাষণে এই আহ্বান জানান বাংলাদেশের সরকার প্রধান, যা বাংলাদেশ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার হয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে এদের পরামর্শদাতা, মূল পরিকল্পনাকারী, মদদদাতা, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহকারী এবং প্রশিক্ষকদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিজে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে আছেন।
গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলা বাংলাদেশের জনগণের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে দেশের জনগণকে সচেতন করতে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এতে সাড়া দেওয়ার জন্য পুরো জাতির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। সমাজের প্রত্যেক স্তর থেকে অভূতপূর্ব সাড়া মিলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি আত্মবিশ্বাসী যে জনগণের দৃঢ়তা ও সহযোগিতায় বাংলাদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসীদের সমূলে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হবেন।
জাতিসংঘের ৭০তম সাধারণ অধিবেশনে ভাষণে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থার কথা বলেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
এবারের ভাষণে তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো এখন কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের সব স্থানেই ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো দেশই আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ নয়, কোনো ব্যক্তিই সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুর বাইরে নয়।
“আমেরিকা থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে এশিয়ায় অগুনতি নিরীহ মানুষ সন্ত্রাসবাদের শিকার হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের দেশে যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপের উদ্ভব হয়েছে, তাদের নিষ্ক্রিয় করা, তাদের নিয়মিত অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাংলাদেশের ভূখ- থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম নির্মূল করার ক্ষেত্রে আমাদের সরকার সফল হয়েছে।”
সংঘাত বন্ধ করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় সব দেশকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, “এখনও আমাদের এই বিশ্ব উত্তেজনা এবং ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্ত নয়। বেশ কিছু স্থানে সহিংস-সংঘাতের উন্মত্ততা অব্যাহত রয়েছে। অকারণে অগণিত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।”
এই প্রসঙ্গে আবেগঘন কণ্ঠে গত বছর সিরিয়ার শিশু আইলান কুর্দির সাগরে ডুবে মারা যাওয়া এবং সম্প্রতি আরেক শিশু ওমরানের আহত হওয়ার কথা বলেন শেখ হাসিনা।
“কী অপরাধ ছিল সাগরে ডুবে যাওয়া সিরিয়ার ৩-বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু আইলান কুর্দির? কী দোষ করেছিল ৫-বছরের শিশু ওমরান, যে আলেপ্পো শহরে নিজ বাড়িতে বসে বিমান হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে? একজন মা হিসেবে আমার পক্ষে এ সকল নিষ্ঠুরতা সহ্য করা কঠিন। বিশ্ব বিবেককে কি এসব ঘটনা নাড়া দেবে না?”
দুদিন আগে জাতিসংঘে অভিবাসী ও শরণার্থী বিষয়ক সম্মেলনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি আশা করি, এই সম্মেলনের ফলাফল বর্তমান সময়ে অভিবাসনের ধারণা এবং বাস্তবতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে সাহায্য করবে।”
তের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও মানবতার স্বার্থে জাতিসংঘকে আরও টেকসই এবং প্রাসঙ্গিক করে তুলতে নতুন করে শপথ নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, সম্ভবত বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা, বিরোধদলীয় নেতা, স্পিকার, সংসদ উপনেতা সবাই নারী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদি সঠিক পন্থা অবলম্বন করা হয়, তাহলে সম্ভাবনা ও সুযোগও রয়েছে অনেক।
বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এক মানবতার জন্য কাজ করার উদ্দেশ্যে আমরা সকলে এখানে সমবেত হয়েছি। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আসুন আমরা মানবতার স্বার্থে অভিন্ন অবস্থানে উপনীত হই। বিশ্ব থেকে সংঘাত দূর করে শান্তির পথে এগিয়ে যাই। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘই হতে পারে আমাদের জন্য একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম। আসুন, আমরা এই সংস্থাকে আরও টেকসই ও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে নতুন করে শপথ গ্রহণ করি।’
আপনার মন্তব্য