সিলেটটুডে ডেস্ক

২৭ অক্টোবর, ২০১৬ ১৪:৪৬

কৃষিতে নারীর অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদানের দাবি

কৃষিতে নারীর অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদান, ভূমিতে নারীর সমঅধিকার এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে নারীদের নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন।

বৃহস্পতিবার (২৭অক্টোবর) ‘কৃষিতে নারীর অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদান, ভূমিতে নারীর সমঅধিকার এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ ও নারী মৈত্রী যৌথ উদ্যোগে এ সংবাদ সম্মেলন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন নারীমৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহিন আকতার।

নারীনেত্রী ও বিএনপিএস-এর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন বিআইডিএস-এর সম্মানিত ফেলো ড.এম আসাদুজ্জামান,বিআইডিএস-এর সাবেক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. প্রতিমা পাল-মজুমদার, অক্সফামের সিনিয়র পলিসি অফিসার মেহবুবা ইয়াসমিন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন- গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের নিমিত্তে প্রায় এক কোটি ত্রিশ লক্ষ বাড়তি শ্রমশক্তি যুক্ত হয়েছে, যার প্রায় পঞ্চাশ লক্ষই নারী শ্রমিক। ২০০৫-২০০৬ এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশের এক কোটি বিশ লক্ষ নারী শ্রমিকের প্রায় ৭৭ শতাংশই গ্রামীণ নারী, যারা মূলত কৃষিকাজ, পশুপালন, হাঁসমুরগি পালন, মাছ চাষ ইত্যাদি কৃষিসংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত।

"১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৯-২০১০ মেয়াদে কৃষি-বন-মৎস্য খাতে অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা ৩৭ লক্ষ থেকে বেড়ে প্রায় ৮০ লক্ষ হয়েছে (১১৬% বেড়েছে)। কিন্তু শ্রমশক্তিতে নারীদের এই বর্ধিত অংশগ্রহণের পরও দুঃখজনকভাবে পুরুষের তুলনায় নারীর কম বেতন পাওয়া অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে নারী কৃষি শ্রমিকের মজুরি পুরুষের তুলনায় ৪১ শতাংশ কম। ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নারীর এই অবদান স্বীকৃতি ও উচ্চারণের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। কৃষিতে নারীদের এই অবদানকে অবৈতনিক পারিবারিক শ্রম হিসেবে গণ্য করা হয়, যদিও নারীরা খামার ও পরিবারের উৎপাদনের জন্য দ্বিমুখী চাপ সহ্য করে। কৃষিতে নারীর এই অবদান, ব্যক্তিগত ও জনজীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদানের মতোই চূড়ান্তভাবে অবমূল্যায়িত হয়।"

বিআইডিএস-এর ফেলো ড.এম আসাদুজ্জামান বলেন- বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান ৫৩ শতাংশ, আর এর বিপরীতে পুরুষের অবদান ৪৭ শতাংশ। কিন্তু তবু, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন নেই। সরকারের নীতি কৌশলের সঙ্গে নারীর কৃষিশ্রমের যোগসূত্র এখনো স্থাপিত হয় নি। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে প্রদত্ত এক কোটি ৩৯ লাখ কৃষক কার্ড বিতরণ করা হলেও নারী কৃষকদের ভাগ্যে তা জোটে নি। তা ছাড়া, নারী কৃষি শ্রমিকের প্রতি মজুরি বৈষম্য এখনো অব্যাহত আছে, যেখানে নারী শ্রমশক্তির ৬৮ শতাংশই কৃষি উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িত। এদিকে ভূমিতেও নারীর সমঅধিকার নেই। বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও তাদের রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা।

বিএনপিএস-এর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর তাঁর বক্তব্যে বলেন- বিদ্যমান সমাজকাঠামো, প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কৃষিতে নারীর অবদানকে অবহেলা করার যে সাধারণ প্রবণতা, সে কারণেই কৃষিতে নারীর অবদান স্বীকৃত হচ্ছে না। অনেকেই বলে থাকেন, জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে আসছে। কিন্তু এর অর্থ কোনোভাবেই এই নয় যে তাতে নারীর অবদান কমছে। বরং পরিসংখ্যান বলছে, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। কৃষিতে নারীর অবদানকে অস্বীকার করার একটি কারণ হচ্ছে নারীর অবদানকে মূল্যহীন মনে করা এবং একে নারীর আর দশটা পারিবারিক কাজের মতো করেই বিবেচনা করা। কিন্তু একটি টেকসই জীবিকায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নারীর অবদানকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

অক্সফাম-এর সিনিয়র পলিসি অফিসার বলেন- নারী-পুরুষের সমান অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি সত্ত্বেও পুরুষরা ৯৬ শতাংশ জমির মালিক, যেখানে নারীর মালিকানা অবশিষ্ট মাত্র ৪ শতাংশ জমির। শুধু মালিকানা নয়, নারীরা সাধারণত জমির নিয়ন্ত্রণও পুরুষদের চেয়ে কম করে। কাজেই সময় এসেছে, কৃষিতে গ্রামীণ নারীর অবদানের স্বীকৃতি দেয়া ও উপযুক্ত সম্মান জানানোর। গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া ক্ষুধা ও দারিদ্র্য ঘোচানোর প্রচেষ্টা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা কৃষক হিসাবে নারী কৃষকদের স্বীকৃতিসহ নারী কৃষককে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং পারিবারিক কৃষি কার্ড প্রবর্তন করা,সর্বজনীন উত্তরাধিকার আইন প্রণয়ন করা, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করাসহ কৃষি সম্প্রসারণ সেবা নারীর কাছে অধিক হারে পৌঁছে দেয়া, বাজারে নারীর প্রবেশগম্যতা বাড়াতে বাজারের নির্দিষ্ট স্থান আলাদাভাবে নারী কৃষকদের জন্য সংরক্ষিত রাখা, জিডিপিতে নারীর পুনরুৎপাদনমূলক (un-paid care work) এবং উৎপাদনমূলক (অবৈতনিক) কাজের স্বীকৃতির দাবি জানান।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত