১৪ নভেম্বর, ২০১৬ ১৩:৫৮
মনিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রী শ্রী কৃষ্ণের মহারাসলীলা আজ সোমবার। প্রতিবছর লক্ষ্মীপূজার পরের পূর্ণিমা তিথিতে এই মহারাসলীলা অনুষ্ঠিত হয়।
মহারাসলীলা উপলক্ষে মনিপুরী সম্প্রদায়ের মাঝে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। শ্রী শ্রী কৃষ্ণের রাসলীলা উৎসব উপলক্ষে প্রস্তুত এখন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়ামন্ডপ (তিনমন্দির) এবং আদমপুরের সানা ঠাকুর মন্দির ও হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার উত্তর ছয়শ্রী (বেন্দারিয়া) গ্রাম।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়ামন্ডপ (তিনমন্দির) প্রাঙ্গণে মনিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের উদ্যোগে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরীরা ১৭৪ তম বার্ষিকী, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার উত্তর ছয়শ্রী (বেন্দারিয়া) গ্রামে শ্রী শ্রী মহাপ্রভু জিউর মন্দিরে ৭৯তম রাস উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া, মৈতৈ মনিপুরীরা কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের তেতইগাঁও সানাঠাকুর মন্দির প্রাঙ্গণে ৩১ তম রাস উৎসবের আয়োজন করেছে।
এ উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মনিপুরী সম্প্রদায়ের মাঝে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা। মনিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব মহারাসলীলা উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাসউৎসবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে লাখো মানুষের ঢল নামবে বলে আয়োজকরা জানান।
মনিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ জানান, কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়া মণ্ডপ প্রাঙ্গণে মনিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের উদ্যোগে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী (বিষ্ণুপ্রিয়া) মনিপুরী সম্প্রদায়ের ১৭৪ তম শ্রী শ্রী কৃষ্ণের মহারাসলীলানুসরন উৎসব উপলে কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে ১৪ নভেম্বর মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে গোধূলীলগ্ন পর্যন্ত রাখাল নৃত্য (গোষ্ঠলীলা), সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মতবিনিময় সভা। রাত সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত নট সংকীর্তন, রাত ১১ টা থেকে পরদিন মঙ্গলবার ঊষালগ্ন পর্যন্ত শ্রী শ্রী কৃষ্ণের মহারাসলীলানুসরণ অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান নুর এমপি। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদ এমপি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রাক্তন সচিব ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. মিহির কান্তি মজুমদার, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এর মহাপরিচালক পুন্যব্রত চৌধুরী, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মো. জামাল উদ্দিন আহমেদ, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. মিজানুর রহমান পিপিএম, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. আজিজুর রহমান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহ জালাল, সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ ডা. নন্দকিশোর সিংহ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রফিকুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হক, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এম, মোসাদ্দেক আহমেদ মানিক, মনিপুরী সমাজকল্যাণ সমিতির সভাপতি প্রতাপ চন্দ্র সিংহ।
মনিপুরী মহা রাসলীলা উৎসবের ইতিকথাঃ
রাস উৎসব মণিপুরিদের সব থেকে বড় উৎসব রাসপূর্ণিমা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মণিপুরের রাজা মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র প্রবর্তিত শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলানুকরন বা রাসপূর্ণিমা নামের মণিপুরিদের সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশে প্রায় দেড়শত বছর ধরে (আনুমানিক ১৮৪৩ খ্রী: থেকে) পালিত হয়ে আসছে। কার্ত্তিকের পূর্ণিমা তিথিতে দূরদূরান্তের লক্ষ লক্ষ ভক্ত-দর্শক মৌলভীবাজার জেলার সিলেটের কমলগঞ্জের মাধবপুর জোড়ামণ্ডপের এই বিশাল ও বর্ণাঢ্য উৎসবের আকর্ষণে ছুটে আসেন।
কথিত আছে, রাজর্ষি ভাগ্যচন্দ্র একদিন স্বপ্নে দেখতে পান রাধা ও কৃষ্ণের রাসলীলা। তারপর তিনি স্বপ্নের আলোকেই উপস্থাপন করেন রাসলীলার রাসনৃত্য। তিনি কয়েকজন কুমারী মেয়ে দিয়ে স্বপ্নের মতো রাসলীলা করান। তার নিজ মেয়ে কুমারী বিশ্বাবতীকে শ্রীরাধা এবং মন্দিরের শ্রীগোবিন্দকে শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ করে রাসলীলা করেন এবং তিনি নিজেই ওই রাসে মৃদঙ্গবাদক ছিলেন। তাতে তিনি নিজস্ব তাল ব্যবহার করেন। তার সে তালই এখন পর্যন্ত চলছে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে মণিপুরের মহারাজ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে যে নৃত্যগীতের প্রবর্তন করেন তা-ই রাসনৃত্য। মহারাজার মৃত্যুর একশ বছর পরে মহারাজ চন্দ্রকীর্তির শাসনামলে গোটা রাসনৃত্য আচৌকা, বৃন্দাবন, খুডুম্বা, গোস্ট, গোস্ট বৃন্দাবন, আচৌবা বৃন্দাবনসহ নানা ভঙ্গির পর্যায়ে পড়ে।
তার মৃত্যুর পর মহারাজ চন্দ্রকীর্তি এ উৎসবকে আরও বেশি জনপ্রিয় করতে উৎসবকে মণিপুরিদের মাঝে ছড়িয়ে দেন।
আমরা আগেই জেনেছি, মণিপুরিদের তিনটি গোত্র। এর একটি মৈতেই, আরেকটি বিষ্ণুপ্রিয়া সর্বশেষ মৈতেই পাঙান। বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতেই গোত্রের লোকরা সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী। এরা গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত। এছাড়া মৈতেই পাঙানরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। তবে সব মণিপুরিরই প্রধান বার্ষিক উৎসব রাসপূর্ণিমায় রাসলীলা।
কিছু তথ্য ও উপাত্ত মারফত জানা যায়, ১৮৪২ সালে মাধবপুরের জোড়া মণ্ডপেই মণিপুরি রাজ্যের বাইরে প্রথম রাসলীলার সূত্রপাত।
রস থেকেই রাস শব্দের উৎপত্তি। রাস হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের সর্বোত্তম মধুর রস। আর লীলা মানে খেলা। অর্থাৎ রাসলীলার মানে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাধা ও তাদের সখা-সাথীদের লীলাখেলা। মণিপুরি সমাজে রাসনত্যৃ আবার ছয়টি ভাগে ভাগ করা। এগুলো মহারাস, বসন্তরাস, নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, গোপীরাস ও উদখুলরাস। এর মধ্যে মহারাস হচ্ছে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।
রাসপূর্ণিমায় রাসলীলা উৎসবের শুরুটা হয় গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্য দিয়ে। এ নৃত্য হয় সকালে। যারা রাখাল নৃত্য করে, তারা প্রথমে মণ্ডপে গোল হয়ে গোপী ভোজন করে। গোপী ভোজন হল বিভিন্ন সবজি দিয়ে রান্না করা তরকারি ও ভাত। এ খাবার খেয়েই রাখাল নৃত্য শুরু করে শিল্পীরা। সকালে শুরু হয়ে রাখাল নৃত্য একটানা চলে বিকেল পর্যন্ত। মণিপুরি শিশু-কিশোররা এ নৃত্য পরিবেশন করে। যারা নৃত্য করে, তারা এক ধরনের বিশেষ পোশাক পরে। ঝলমলে এ বিশেষ পোশাকের নাম ‘পলয়’। এ পোশাকের পরিকল্পনা করেছিলেন রাজা ভাগ্যচন্দ্র। রাখাল নৃত্যের মূল বিষয়বস্তু হলো কৃষ্ণ ও তার সাথীদের নিয়ে। গোলাকার মণ্ডপে কখনও একক, কখনও দ্বৈত এবং কখনও দল বেঁধে এ নৃত্য পরিবেশিত হয়। রাখাল নৃত্যের পাশাপাশি দিনভর চলতে থাকে মণিপুরিদের নিজস্ব সংস্কৃতির কর্মকাণ্ড।
সন্ধ্যার পর শুরু হয় রাসপূর্ণিমার রাসলীলা বা রাসনৃত্য। রাসনৃত্য পরিবেশনা করে মণিপুরি কুমারী মেয়েরা। রাস নৃত্যের সময়ও পলয় পরা হয়। পলয় পোশাকের মাথার উপরিভাগের নাম ‘কোকুতম্বি’। এ পোশাকের মুখের ওপর পাতলা স্বচ্ছ আবরণ থাকে। তার নাম ‘মাইমুখ’। গায়ে থাকে সোনালি ও রূপালি চুমকির কারুকাজের ঘন সবুজ ভেলভেটের ব্লাউজ। পরনে থাকে ঘন সবুজ রঙের পেটিকোট, যা শক্ত বক্রমের দ্বারা গোলাকৃতি ও ভাঁজমুক্ত করা হয় এবং অজস্র চুমকি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়নার দ্বারা কারুকাজ করা থাকে, যা সামান্য আলোতেও ঝলমল করে ওঠে। পলয়ের এ অংশের নাম ‘কুমিন’। জরির কারুকাজ করা পেশোয়ান খাওন, খবাংনপ পলয়ের অংশ। এছাড়া পলয়ের সঙ্গে কলথা, খবাংচিক, খুঁজিসহ ইত্যাদি স্বর্ণালঙ্কারও নৃত্যশিল্পীরা পরেন।
রাসনৃত্যও গোলাকার মণ্ডপে কখনও একক, কখনও দ্বৈত এবং কখনও দলবেঁধে পরিবেশিত হয়। রাসনৃত্যের মূল বিষয়বস্তু হলো রাধা ও তার সখাদের নিয়ে। এ নৃত্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের শুরু, মান-অভিমান এবং শেষে মিলন দেখানো হয়।
রাসলীলা উপলক্ষে মণিপুরিরা বিভিন্ন সবজি, ডাল, গাছের লতাপাতা দিয়ে উতি, পাকাউরা, সৈবুম, ইরোলবা নামের বিশেষ খাবার তৈরি করে। ম-পে সবাই লাইন ধরে বসে কলাপাতায় এ খাবার খান। এছাড়া মণিপুরি মেয়েরা নিজেদের তাঁতে বোনা শাড়ি পরেন। এসব শাড়ির নকশা হয় কালো রঙের পাড় এবং সবুজ, খয়েরি, ছাইসহ বিভিন্ন রঙের লম্বা চেকের মাধ্যমে। এছাড়া পুরুষরা পরে সাদা ধুতি ও পাঞ্জাবি, আর গলায় থাকে ওড়না।
রাসলীলা উপলক্ষে গ্রামীণ পণ্যের মেলাও বসে। এছাড়া অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, গুণীজন সংবর্ধনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে মণিপুরিরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি তলোয়ার নৃত্য, মশাল নৃত্য, মার্শাল আর্ট, নাচ, ঢোলক নৃত্যসহ বিভিন্ন নাচ-গান উপস্থাপন করে। মণিপুরিদের উৎসব কেবল আর মণিপুরিদের মধ্যে নেই। এই উৎসবটি এখন ওই এলাকায় সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। সিলেট ছাড়াও রাস উৎসব হয় সুন্দর বনের আলোর কোল ঘেঁষে। এখানে ভিড় করে প্রচুর পুণ্যার্থী।
রাসলীলায় মনিপুরী নৃত্য শুধু কমলগঞ্জের নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের তথা সমগ্র বিশ্বের নৃত্য কলার মধ্যে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। ১৯২৬ সালের সিলেটের মাছিমপুরে মনিপুরী মেয়েদের পরিবেষ্টিত রাস নৃত্য উপভোগ করে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
পরে কবিগুরু কমলগঞ্জের নৃত্য শিক নীলেশ্বর মুখার্জীকে শান্তি নিকেতনে নিয়ে প্রবর্তন করেছিলেন মনিপুরী নৃত্য শি। কমলগঞ্জে প্রায় এক মাস আগ থেকেই চলছে রাসোৎসবের প্রস্তুতি। মনিপুরী সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি কুমারী কিশোরদের রাস লীলায় অংশগ্রহণ করার জন্যে নৃত্য ও সংগীতের তালিম নেয়ার ধুম পড়ে যায়।
এক্ষেত্রে তাবৎ বাড়িতে রাসধারী ও রাস লীলার উস্তাদ এনে শিক্ষা দেয়ার রেওয়াজ প্রচলিত। আনুমানিক ৪০/৫০ জন কিংবা ততোধিক সংখ্যার কিশোরী এ রাস লীলায় অংশগ্রহণ করে থাকে।
আপনার মন্তব্য