নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ নভেম্বর, ২০১৬ ১৯:৩৫

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়া উচিত বাংলাদেশের

বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ৭০০ কোটি পাওনার কথিত দাবি সম্পর্কিত পাকিস্তানের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বিশিষ্টজনরা বলছেন বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের পাওনা নয়, বরং পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশরই পাওনা রয়েছে। এজন্যে এখনই কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতেও যাওয়া উচিত বাংলাদেশের।

একাত্তরে বাংলাদেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা, দুলক্ষ মা-বোনকে অসম্মান ও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাকগলানো পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি ওঠেছে বিভিন্ন সময়ে। সর্বশেষ এ দাবির প্রেক্ষিতে ব্যাপক জনসমর্থন দেখা যায় ২০১৩ সালের গণজাগরণে। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন দণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে ওঠা বাংলাদেশের গণজাগরণ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ দাবির প্রতি সমর্থন প্রকাশ হয়। তারপর যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের সময়ে পাকিস্তান সরকার ও তাদের দেশিয় গণমাধ্যমের ভূমিকার পর এ দাবির যৌক্তিক ভিত্তি সংহত হয়।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ ও সম্পদের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ৩৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এমন অবস্থায় গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের এক খবরে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, পাকিস্তান অ্যাসেট ভ্যালুয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে ৭০০ কোটি টাকার পাওনা নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ভারতের কাছে ৬০০ কোটি রুপি পাওনা নির্ধারণ করেছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের কাছে পাকিস্তান পাওনা দাবির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যদিও বিষয়টি পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও এমন দাবি করে নি দেশটি।

পাকিস্তানি গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এ নিয়ে তাদের ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, ‘ওরা কিসের টাকা পাবে? আমরাই তো ওদের কাছে টাকা পাবো। তাদের এ দাবি টোটালি রাবিশ, ননসেন্স।’

এর আগে, বুধবার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, পাকিস্তানের এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাদের কাছে বাংলাদেশের যে পাওনা আছে তা না দেওয়ার জন্যই তারা উল্টো দাবি তুলছে।

পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা আদায় বিষয়ে সরকারের কী করণীয় এ প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাপারটি নিয়ে আমরা আঞ্চলিক ফোরাম তথা সার্ক অথবা আন্তর্জাতিক ফোরাম জাতিসংঘে যেতে পারি। আর কোন কিছু যদি সম্ভব না হয় তাহলে International Court of Justice-এ আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক দাবি জানাতে পারি।"

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাত দিয়ে পাকিস্তানি গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে তুরিন আফরোজ বলেন, "এই ধরনের দাবি সত্যিই দুঃখজনক ও অবাস্তব! ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে ফলশ্রুতিতে আমরাই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। পাকিস্তানকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে, আমদের অনেক পুরনো পাওনা পাকিস্তানের কাছে আছে এবং পাকিস্তান যা দাবি করছে আমাদের পাওনার পরিমাণ অবশ্যই তার থেকে অনেক গুণ বেশী।"

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পাওনা আদায়ের বিষয়ে এখনও কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না এমন অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা হলেও এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এ প্রসিকিউটর বলেন, "কথাটি সম্পূর্ণভাবে ঠিক নয়। সরকারের সব কাজ সব সময় দৃশ্যমান হয় না এবং হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আমি যতটুকু জানি সরকারের নির্দিষ্ট মহল এ নিয়ে কাজ করছে।"

জানা যায়, স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা নির্ধারণ করা হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা সুনির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে পাওনা নির্ধারণ করে। খাতগুলো হচ্ছে- সে সময়ে পাট বিক্রির টাকা, যা পাকিস্তান নিয়ে চলে যায়, তখনকার পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকের হিসেবে অনুযায়ী মোট সম্পদের ৫৬ শতাংশ (পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বিবেচনায়), বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৫৪ শতাংশ এবং ১৯৭০ সালে বরিশাল অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় আসা প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিদেশি সহায়তা। এই সহায়তার টাকাও তখনকার পাকিস্তান সরকার ইসলামাবাদে নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমান বাজারমূল্যে যার পরিমাণ প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

একটি সূত্র জানায়, এ যাবৎকালে পাকিস্তানের সঙ্গে যতবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে, ততবারই বাংলাদেশ এ সম্পদের হিসাব দিয়ে পাওনা অর্থ পরিশোধের দাবি জানিয়েছে। প্রতিবারই পাকিস্তান এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেই পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে কোনো পাওনা দাবি করেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশ দুইটির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের এপর্যায়ে হঠাতই তারা এমন পাওনা দাবি সম্পর্কিত আলোচনার প্রসঙ্গ তুলেছে, যা বাংলাদেশের অনেককেই বিস্মিত করেছে।

এদিকে, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির গণমাধ্যমকে বলেছেন, পাকিস্তানের কাছে সম্পদের হিস্যা বাবদ এই ৩৪ হাজার কোটি টাকা শুধু নয়, গণহত্যার জন্যও এক লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতিপূরণের দাবি রাখে বাংলাদেশ। এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গণহত্যার জন্য জার্মানি ও জাপান ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। এ কারণে ৩০ লাখ মানুষ হত্যা এবং দুই লাখ নারীর ওপর বর্বর নির্যাতন চালানোর জন্য পাকিস্তান অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য।

শহীদ আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ৭০০ কোটি টাকা পাওনা দাবি হাস্যকর। যারা বাংলাদেশের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে, যারা সম্পদ লুট করেছে তারা পাওনাদার এটা স্রেফ তামাশা।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে শাওন মাহমুদ বলেন, "পাকিস্তানকে সবরকমের সম্পর্ক থেকে বর্জন না করায় বাংলাদেশের প্রতি এই অযাচিত আচরণ করবার প্রশ্রয় পেয়েছে। একাত্তরে গণহত্যা, লুট এবং ধর্ষণের মত জঘন্য কাজের জন্য ক্ষমা চায়নি ওরা। ওদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনোভাব দমানো শুধুমাত্র ওদেরকে বর্জনের মধ্য দিয়েই সম্ভব, একই সঙ্গে আমাদের ন্যায্য পাওনার দাবি জানানো উচিত।"

আপনার মন্তব্য

আলোচিত