২৫ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৩৫
আলোচিত চার খুনের ঘটনার পর রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন এসবির ডিআইজি মু. মাহবুবুর রশীদ।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব তৌছিফ আহমেদের সই করা প্রজ্ঞাপনে এই রদবদল করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে- এসবির ডিআইজি মু. মাহবুবুর রশীদকে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) করা হয়েছে। ডিএমপির উপ-কমিশনার আসলাম উদ্দিনকে পুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
রংপুরে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের বাকি তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বর্ণনা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠেছে। মঙ্গলবার মামলাটি পুলিশ থেকে ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়। একই দিনে পুলিশ কমিশনারকেও বদলি করা হয়।
এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় গত রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল সে ব্যাপারে গণমাধ্যম কর্মীদের ব্রিফ করার সময় গলা জড়িয়ে আসে তার। এক পর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানান তিনি।
তিনি জানান, শুধু হত্যাই নয়; চারজনকে হত্যার পরও ঘটনাস্থলে নির্বিকার ছিল অভিযুক্তরা। হত্যার পর ওই বাড়িতেই গোসল, খেজুর ও শসা খাওয়া এবং ইয়াবা সেবনের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও উঠে এসেছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের নির্মমতার বর্ণনায় তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দুজন হলেন নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস। সিদ্ধার্থ নগরীর পিকে জুয়েলার্সে কাজ করেন। মুগ্ধ কাজ করেন সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘গণপতি স্যার ছিলেন একজন সম্মানিত লোক। ওনার পরিবারের সঙ্গে কারও কলহ বিবাদ ছিল না।’
এ কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পুলিশ কমিশনার। তাকে চোখ মুছতে দেখা যায়।
অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কেনেন। পরে সীমান্ত নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির বাসায় গিয়ে তারা ইয়াবা সেবন করেন। রাতের শেষ দিকে তারা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান।
সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে বেরিয়ে আসেন। এ সময় অভিযুক্তরা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন। শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে আসার সময় সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
এরপর হত্যার নির্মমতা বর্ণনা করতে গিয়ে ভেঙে পড়েন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, ‘উনার চিৎকার-চেঁচামেচিতে উনার মেয়ে প্রাপ্তি চক্রবর্তী, বয়স ২৫, সে যখন এগিয়ে আসে, প্রাপ্তি চক্রবর্তীকে তারা খুন করে গামছা পেঁচিয়ে। খুনিদের বক্তব্যে আমি যেটা শুনলাম, প্রাপ্তি চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। একটা প্যাঁচ গলার উপর দিয়ে যায়, একটা প্যাঁচ মুখের উপর দিয়ে যায়। তারা এত জোরে এই রশিটা টান দেয়, তার মুখের চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখটা ঠিকরে বের হয়ে যায়।’
চারজনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট প্রিয়ম চক্রবর্তীকে হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুরোপুরি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পুলিশ কমিশনার। রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ১২ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী ছিলেন গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে।
প্রিয়মের কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে বক্তব্য থামিয়ে দেন পুলিশ কমিশনার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছোট ছেলেটা যার কথা বললে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র প্রিয়ম। আমার ছেলের বয়সী।’
এরপর কিছুক্ষণ থেমে তিনি বলেন, ‘এই প্রিয়মকে তারা গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করে এবং একপর্যায়ে একটি বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। হত্যার পর সকাল হয়ে গেলে তারা প্রিয়মের বাথরুমে গোসল করে। প্রথমে সিদ্ধার্থ গোসল করে পরে মুগ্ধ গোসল করে।’
পুলিশ কমিশনার জানান, গোসল শেষে অভিযুক্তরা ওই বাড়ির ডাইনিং টেবিলে রাখা একটি বৈয়াম থেকে খেজুর ও শসা খান। এরপর সেখানে বসেই আরও একবার ইয়াবা সেবন করেন তারা। শুধু তাই নয়, হত্যার পর আলামত নষ্টের চেষ্টাও করে অভিযুক্তরা। নিহতদের ব্যবহৃত দুটি স্মার্টফোন থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে ফেলতে ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ফোন দুটি চুবিয়ে রাখা হয়।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যার রহস্য উদঘাটন করে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষে চার্জসিট দেওয়া হবে। আপনারা আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেন।’
একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুরো রংপুরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আপনার মন্তব্য