০৬ জুন, ২০১৬ ০০:৫৭
বৃহত্তর চট্টগ্রামের পর সিলেট অঞ্চলেই ছিলো সবচেয়ে বেশি পাহাড় টিলা। পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবেই একসময় পরিচিত ছিলো সিলেটের। এই পাহাড়-টিলা কেটে এখন সাবাড় করে দেয়া হয়েছে। পাহাড় টিলা কেটে তৈরী করা হয়েছে আবাসন প্রকল্প। ইতোমধ্যে কয়েকশ’ একর পাহাড়, টিলা কেটে সাফ করা হয়েছে। এখনো যেগুলো বাকি আছে সেগুলো কেটে ফেলারও চুড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেগুলোও কৌশলে কেটে ফেলার জন্য নানা কৌশল নিয়েছে পাহাড় ও টিলা সংহারকরা।
প্রাকৃতিক ছায়াঘেরা বৃহত্তর বালুচর এলাকার আগের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বালুচর এলাকায় এখন আর বাঘ শিয়ালের ডাক শোনা যায়না, ধরা যায়না বনমোরগ। এখন তাকালেই দেখা যায় ন্যাড়া মাথার মতো লাল মাটি। টিলা কেটে তৈরী হয়েছে অসংখ্য আবাসন প্রকল্প। সরেজমিন বালুচর এলাকা ঘুরলেই দেখা যায় আবাসন এলাকার জন্য তৈরী করা হয়েছে নতুন নতুন রাস্তা। টিলার মাটি দিয়ে তৈরী করা হয়েছে এসব রাস্তা। স্থানীয় টুলটিকর ও খাদিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে রাস্তা সংস্কারেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় শুধুমাত্র আবাসন প্রকল্পের জন্য এসব রাস্তা তৈরী করা হয়েছে।
জানা গেছে, বালুচর আরামবাগের পাশেই রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার পুরোটাই গড়ে তোলা হয়েছে লোদী টিলা কেটে। ওই টিলায় ছিল জঙ্গল আর গাছ গাছালি।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি সানাউর রহমান জানান, একসময় তারা ওই টিলার বনমোরগ শিকার করতেন। ১৯৮০ সালের দিকে ইস্টল্যান্ড ফার্ম নামের একটি কোম্পানি লোদী টিলা কেটে মিতালী আবাসিক এলাকা গড়ে তুলে। প্রায় ২০ একর জমির ওই টিলার গাছপালা কেটে উজাড় করার পর প্লট তৈরি করে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে মিতালী আবাসিক এলাকায় শত, শত ভবন তৈরী হয়েছে। তিনি জানান, ৯০ দশকের পর বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সিলেট জুড়ে টিলা ও পাগাড় কাটার মহোৎসব শুরু হয়। ওই সময়ে সিলেটে যে পাহাড় টিলা কাটা হয়েছে অতীতে আর কাটা হয়নি।
বালুচরের বাবু টিলা এখন আর নেই। শহরতলীর বালুচরে অবস্থিত এ টিলা কেটে প্ল¬ট করে বিক্রি কওে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন। এভাবে আমেনার টিলা, আরামবাগ আবাসিক এলাকার তিন নাম্বার মসজিদের পাশে মনির মিয়ার টিলা, মিনিস্টারের টিলা কেটে তৈরী করা হয়েছে আবাসন প্রকল্প। শুধু এসব টিলা নয় গোটা বালুচর, আরামবাগ, জোনাকী, আলইসলাহ, ফোকাস, রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকা, নয়াবাজার এলাকায় টিলা কেটে প্লট হিসাবে বিক্রি করা হয়েছে।
গত শুক্রবার নগরীর বালুচর আল-ইসলাহ এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এখন আর আগের মত টিলা নেই। টিলা কেটে তৈরী করা হয়েছে বাসা-বাড়ি। এখনো বেশ কিছু টিলা বেঁচে আছে ক্ষত নিয়ে। কিছু কিছু টিলার অবস্থা ভাল থাকলেও সেগুলোও গিলে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কৌশলে টিলার পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে খুপড়ি ঘর। সামান্য টাকায় এসব ঘরে ঝুকি নিয়ে থাকেন স্বল্প আয়ের মানুষজন। ওই এলাকার এজাজ মিয়ার টিলা ও মছব্বির মিয়ার টিলার অবস্থা খুবই করুণ।
সরেজমিন দেখা যায় টিলার উপরের অংশে ছোট, ছোট গর্ত করে রাখা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন জানান, টিলা ধবংস করার জন্য এসব গর্ত করা হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই ধীরে ধীরে টিলা ধবসে পড়বে। আর বৃষ্টি না হলে উপর থেকে পানি ঢালা হয়।
এমনভাবে পানি ঢালা হয় যাতে করে শুকনো মাটিতে পানি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টিলা ধবসে পড়ে। এরপর কৌশল হিসাবে সংষ্কারের নামে টিলা কাটা শুরু হয়। সংস্কারে যাতে কোন ব্যাঘাত না ঘটে মালিকরা যান পরিবেশ অধিদপ্তরে। তারা সেখানে গিয়ে টিলার মাটি ধবসে পড়ছে, সংস্কার করতে হবে এমন আবেদন জানান। এরপর কোন প্রকার তদন্ত ছাড়াই পরিবেশ অধিদপ্তর সংষ্কারের অনুমতি দেয়। আর সেই অনুমতি দিয়েই টিলা সংহারকরা ধীরে, ধীরে কেটে নেয় টিলা। এভাবে টিলা কেটে সাবাড় করা হলেও এই কৌশল এখনো অব্যাহত রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টুলটিকর ইউনিয়নের এক সদস্য জানান, এসব টিলা কাটার বিষয়টি এলাকাবাসী একাধিকবার প্রশাসনের নজরে দিয়েছেন। পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের যোগসাজসে প্রকাশ্যেই টিলা কাটা হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় টিলার পাদদেশেই বাস করছে একাধিক পরিবার
এদিকে নগরীর টিলাগড় (বাগমাড়া) এলাকার, নগরীর পশ্চিম অংশের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বেশ কয়েকটি টিলা কেটে গড়ে উঠেছে হাউজিং প্রকল্প। এছাড়া পার্শ্ববর্তী হালদারপাড়া, শাবি’র পেছনে কুমারগাঁও মৌজার ডলিয়া, নগরীর পূর্বাংশে শাহপরাণ মাজার সংলগ্ন এলাকার ভাঁওয়াল টিলা কাটা হয়েছে। এখনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নগরীর পাহাড়-টিলা শূন্য করতে কৌশলে কাজ করছে।
এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সালেহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সিলেটে যাতে টিলা বা পাহাড় কাটা না হয় সেজন্য তাদের সক্রিয় দৃষ্টি রয়েছে। যে বা যারাই পাহাড় টিলা কাটবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা জানান, সিলেটের টিলা কাটা বন্ধে তারা অনেকবার পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিদের চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। সিলেটে পাহাড় বা টিলা কাটা এখনো বন্ধ হয়নি। এসব বন্ধে সচেতনাতা গড়ে তুলতে হবে।
আপনার মন্তব্য