১২ জুন, ২০১৫ ১৮:২৩
সিলেটের উপ মহা পুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সমাজকল্যান মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন তিনি।
বুধবার মৌলভীবাজারের একটি অনুষ্ঠানে প্রশাসন ও পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাদর সাথে দুর্ব্যবহারের প্রেক্ষিতে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা থেকে মহসিন আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিলেট পুলিশ শীর্ষ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলেন।
দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে সৈয়দ মহসিন আলী বলেন, 'সিলেট রেঞ্জের ডিআইজিও এক দুর্নীতিবাজ। ওসিরা তাকে প্রতি মাসে দুই লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে থাকে। আমার এলাকায় এসব চলবে না। দুর্নীতি যারা করবে তাদের রক্ষা নেই। পুলিশ আমার বিরুদ্ধে কোনো নালিশ করেও কিছু করতে পারবে না। সত্যের জয় হবেই।' (সূত্র : কালের কণ্ঠ)
এরআগে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অশোভন আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন মৌলভীবাজার জেলা পুলিশপ্রধান তোফায়েল আহমেদ। ঊর্ধ্বতন তিন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে পাঠানো ফ্যাক্স বার্তায় তিনি জানান, বুধবারে মৌলভীবাজারে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় মন্ত্রী জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্পর্কে অশোভনীয় বক্তব্য প্রদান করলে উপস্থিত কর্মকর্তারা অস্বস্তি বোধ করেন।
বুধবার রাতেই স্পেশাল ব্রাঞ্চের অ্যাডিশনাল আইজি, সিলেট রেঞ্জের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজির (গোপনীয়) কাছে পাঠানো ওই বার্তায় অবশ্য এর বেশি আর কিছু লেখা ছিল না।
গত বুধবার অনুষ্ঠিত মৌলভীবাজার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাসন করেছেন বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী।
বুধবারের ওই সভায় উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্বোধন না করায় তিনি জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার ওপর ক্ষুব্ধ হন। এলাকায় তাঁর চেয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দলের হুইপ বেশি প্রাধান্য পান এমন অভিযোগ করে জেলার তিনটি থানার ওসিকে দাঁড় করিয়ে শাসিয়ে দেন মন্ত্রী।
শেরপুরে একটা গণ্ডগোলের ঘটনায় যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় সভায় উপস্থিত এক র্যাব কর্মকর্তার প্রতি উত্তেজিত হন মন্ত্রী। প্রটোকল না বুঝতে পারায় আনসার-ভিডিপির এক কর্মকর্তা মন্ত্রীর ধমক খান। সমাজকল্যাণমন্ত্রীর তির্যক মন্তব্য থেকে বাদ পড়েননি এসপি তোফায়েল আহমেদও। বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্ত্রীর রোষের মুখে পড়েন একজন উপজেলা চেয়ারম্যান।
আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাটি শুরু হয়েছিল বুধবার সকাল ১১টায়। জেলা প্রশাসক অনুপস্থিত থাকায় এডিসি (সার্বিক) জহিরুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। এ সময় মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমেদ, র্যাব কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট জেলার সব কটি থানার ওসি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ব্যবসায়ী নেতাসহ পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক ব্যবসায়ী নেতা নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, এডিসি স্বাগত বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্বোধন না করায় ক্ষুব্ধ মন্ত্রী এডিসির পিঠে থাপ্পড় মারেন। তাঁর এ আচরণে উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে পড়েন।
এরপর সভায় উপস্থিত কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা থানার ওসিদের দাঁড় করিয়ে তাঁদের মন্ত্রী জিজ্ঞেস করেন, 'তোমাদের কাছে মন্ত্রী বড়, না হুইপ বড়?' তখন ওসিরা বলেন, 'স্যার, মন্ত্রী বড়।' এ সময় মন্ত্রী বলেন, 'যদি মন্ত্রী বড়ই হয়, তাহলে তোরা হুইপের কথা শুনিস কেন?' এরপর তিনি প্রকাশের অযোগ্য ভাষায় গালি দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেন, 'আমার কথা না শুনলে পিটিয়ে তোদের চামড়া তুলে ফেলব।'
পরে তিন ওসিকে আধাঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখেন। ওই ব্যবসায়ী নেতা আরো বলেন, মিটিংয়ের একপর্যায়ে আনসার-ভিডিপির এক কর্মকর্তাকে মন্ত্রীর প্রটোকল ও স্টেটাস না বোঝার জন্য শাসান। র্যাবের এক কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে বলতে থাকেন, 'শেরপুরে একটা গণ্ডগোল হয়েছে সেখানেও যাওনি কেন? কী কাজ করিস তোরা?' তাঁকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে পিঠের চামড়া তোলার হুমকি দেন বলে ওই ব্যবসায়ী জানান। বক্তব্য দিতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন বড়লেখা উপজেলা চেয়ারম্যান সুন্দর আলীও। মন্ত্রী তাঁর বক্তব্য থামিয়ে বলে ওঠেন, 'আমার কারণে আজ তোরা চেয়ারম্যান হতে পেরেছিস।'
অশোভন আচরণের অভিযোগ সম্পর্কে সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী বলেন, 'মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার একজন দুর্নীতিবাজ। সম্প্রতি পুলিশে নিয়োগের সময় অন্তত ১০০ জনের কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে নিয়েছেন। জামায়াত-শিবির ও বিএনপির লোকজনকে পুলিশে ঢুকিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা সভায় পুলিশ সুপারকে শাসন করেছি।' তিন থানার ওসিকে দাঁড় করানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, 'কুলাউড়ার ওসিকে ১০ লাখ টাকা না দিলে কথা বলে না। তার বিরুদ্ধে ৩০০ জনের দরখাস্ত পেয়েছি। জুড়ী থানার ওসি দলীয় লোকদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিচ্ছে। আবার নিরপরাধ লোকদের ফাঁসিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। বড়লেখার ওসি হুইপের কথা শোনে।'
হুইপ তো আপনার দলেরই নেতা- এ প্রশ্ন করলে মহসিন আলী বলেন, মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব থাকতে হয়। ওনার মধ্যে আছে কি না তা সবাই জানে। এডিসির ব্যাপারে তিনি বলেন, 'এডিসি আমাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেনি। এ কারণে তাকে আদর করে থাপ্পড় মেরেছি। যারা ভালো কাজ করবে তাদের আদর করব। আর যারা খারাপ করবে তাদের শাসন করবই। সভায় যারা খারাপ ছিল তাদের শাসন করেছি।' তিনি বলেন, 'সিলেট রেঞ্জের ডিআইজিও এক দুর্নীতিবাজ।'
আপনার মন্তব্য